default-image

করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে দেশের মানুষ দীর্ঘতম ছুটির দেখা পেল। ছুটি শুরু হয়েছিল মার্চের শেষ সপ্তাহে। মাঝে এপ্রিল গেছে। এখন মে মাসের প্রায় শেষ। এত লম্বা ছুটি স্বাধীন বাংলাদেশে এর আগে হয়নি। লম্বা হলেও ছুটিতে ছুটির আনন্দ ছিল না। ছিল ভয়, বেশ কিছুটা উদ্বেগ। এই ছুটিতে প্রিয়জনের সান্নিধ্যে যাওয়া ছিল বারণ, বেড়ানোর ক্ষেত্রে ছিল রাষ্ট্রীয় বিধিনিষেধ। তবে ছুটির আনন্দ রোজার শেষে এসে এখন দেখা যাচ্ছে। এখন যে ঈদের ছুটি। একফালি চাঁদের মতো ঈদের খুশি মানুষের চোখে–মুখে। এই খুশি কেড়ে নিতে পারেনি করোনা।

করোনা মহামারি অনেক সংকটের জন্ম দিয়েছে। জটিল হয়ে পড়েছে চিকিৎসাসেবা। চিকিৎসা বিষয়টি অনেকটাই আতঙ্কের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। করোনা বা অ–করোনা দুই ধরনের রোগীর ক্ষেত্রে এই আতঙ্ক কাজ করছে। করোনার জন্য নির্ধারিত হাসপাতালগুলোর অন্দরমহলের গল্প এখন মানুষের মুখে মুখে। অনেক কষ্টে পরীক্ষা করাতে পারলেও শনাক্ত হওয়ার পর অনেকে হাসপাতালে যেতে চাচ্ছে না। অ–করোনা রোগীদের অনেকে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে, বেসরকারি থেকে সরকারি—এভাবে ঘুরছে। সমস্যা ব্যাপক ও গভীর।

সমস্যা বুঝে সমাধানের বড় কোনো আন্তরিক উদ্যোগ মানুষ দেখতে পাচ্ছে না। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা খাতের এই সংকট চীনের উহানে নতুন করোনাভাইরাস সংক্রমণের পরে সৃষ্টি হয়নি। সমস্যা ছিল, গভীরভাবেই ছিল। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং সরকার একে তেমন আমলে নেয়নি। করোনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলে দিল, স্বাস্থ্য খাত দুর্বল এবং নেতৃত্বহীন।

করোনার জন্য বিশ্ব তৈরি ছিল না, বাংলাদেশও না। তবে যেকোনো সময় নতুন রোগের আবির্ভাবের আশঙ্কা ছিল, আছে। সেই আশঙ্কা থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধি ২০০৫ (ইন্টারন্যাশনাল হেলথ রেগুলেশন) অনুমোদন করেছিল। ওই দলিলে সই করা দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নামও আছে। সংক্রমণ প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক বন্দরগুলোতে সদস্যদেশগুলো কী পদক্ষেপ নেবে, তা ওই দলিলে বলা আছে। ওসব কাজ করার জন্য দেশে একটি কর্মপরিকল্পনা ও অর্থ বরাদ্দ ছিল। কেউ খতিয়ে দেখেননি কী কাজ করার কথা ছিল, কাজ কতটুকু হয়েছে ইত্যাদি।

চার মাস আগেই অর্থাৎ জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, স্বাস্থ্যসচিব (সেবা বিভাগ) মো. আসাদুল ইসলাম, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ এবং রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা বলেছিলেন, করোনা মোকাবিলার সব ধরনের প্রস্তুতি আছে। জানুয়ারিতেই শনাক্তকরণ পরীক্ষা শুরু করেছিল আইইডিসিআর। অনেক বিলম্বে তারা পরীক্ষাকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়িয়েছে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে পরীক্ষার সুযোগ দিয়েছে। এখন ৪৭টি কেন্দ্রে রোগ শনাক্তকরণ পরীক্ষা হচ্ছে। পরীক্ষা নিয়ে মানুষের নতুন অভিজ্ঞতা হয়েছে, যার অনেকটাই দুঃখজনক।

এটা সত্য যে ভাইরাসের মারণক্ষমতা, সংক্রমণ হার এবং এর দুর্বলতা সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি অণুজীববিজ্ঞানী, জনস্বাস্থ্যবিদ, গবেষক, চিকিৎসক ও ওষুধবিজ্ঞানীরা। বিশ্বজুড়ে গবেষণা চলছে। নাগরিকের জীবন রক্ষায় প্রতিটি দেশ নিজের সম্পদ ও সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছে। অনেক দেশ ভুল পদক্ষেপ নিয়েছে, চড়া দাম দিয়েছে। ভুল সংশোধন করে নতুনভাবে কাজ শুরু করেছে। সম্পদের পাহাড় আর চাকচিক্যময় হাসপাতাল যে মানুষের জীবন রক্ষায় যথেষ্ট নয় এই মহামারি তা বলে দিয়েছে। তবে প্রতিটি দেশকে নিয়মিতভাবে পরামর্শ দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ধনী–দরিদ্র, শীতপ্রধান বা গ্রীষ্মপ্রধান সব দেশের জন্য সাধারণ কিছু করণীয় ঠিক করেছে সংস্থাটি। এর মধ্যে ছিল: ব্যক্তি চিহ্নিত করা, শনাক্তকরণ পরীক্ষা, আইসোলেশন (বিচ্ছিন্নকরণ), রোগীর সেবা, কনট্যাক্ট ট্রেসিং (রোগীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ), কোয়ারেন্টিন (সঙ্গনিরোধ)। চার মাস পরে এসে দেখা যাচ্ছে, মৌলিক এই কাজগুলোতে অনেক সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। তবে রাজধানীতে সরকারি–বেসরকারি ১৫টি হাসপাতাল এবং আট বিভাগে ৬৪টি হাসপাতাল করোনা রোগীর জন্য প্রস্তুত রেখেছে। অতিসম্প্রতি চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ দেওয়াতে জনবলসংকট দূর হবে বলে শোনা যাচ্ছে। ব্যক্তিগত নিরাপত্তাসামগ্রী নিয়ে যে অভিযোগ শুরুর দিকে শোনা গিয়েছিল, এখন তা কমে এসেছে।

১ জানুয়ারির আগে চীনে কী হয়েছিল তার সর্বজনগ্রাহ্য তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। তবে বছরের শুরুতেই ভাইরাসের চরিত্র নিয়ে, এর সংক্রমণক্ষমতা নিয়ে, আক্রান্তদের মধ্যে রোগের উপসর্গ নিয়ে গবেষণা শুরু হয়ে যায়। জানুয়ারির শেষ হওয়ার আগেই অনেকগুলো বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশ করে খ্যাতনামা স্বাস্থ্য সাময়িকীগুলো। এরপর থেকে নিয়মিতভাবে বৈজ্ঞানিত তথ্য প্রকাশ অব্যাহত আছে। এ পর্যন্ত আইইডিসিআর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দেশের করোনা পরিস্থিতি বিষয়ে কোনো বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রকাশ করতে পারেনি।

দেশের জন্য, বিশ্বের জন্য গবেষণালব্ধ তথ্য জরুরি। সংক্রমণ পরিস্থিতি জানার জন্য তথ্য জরুরি। রোগ ব্যবস্থাপনার জন্য তথ্য জরুরি। প্রতিরোধ কর্মসূচির জন্য তথ্য জরুরি। সামাজিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের জন্যও তথ্য জরুরি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জন্যও তথ্যের প্রয়োজন হবে। প্রতিদিনের আক্রান্ত আর মৃত্যুর সংখ্যা ছাড়া দেশের মানুষের কাছে আর কোনো তথ্য নেই। তাই ঈদের পরে দেশের পরিস্থিতি কী হবে, তা নিয়ে গভীর অনিশ্চিয়তা মানুষের মনে। সেই অনিশ্চয়তা থেকে নানা শঙ্কা ও ভয় কাজ করছে। এই অনিশ্চয়তা শুধু দরিদ্র বা খেটে খাওয়া মানুষের মধ্যে নয়। এই অনিশ্চয়তা ধনী ও দরিদ্রের, শহরের ও গ্রামের, সাধারণ জনগণ সবার মধ্যে। এর প্রধান কারণ গ্রহণযোগ্য কোনো তথ্য মানুষের কাছে নেই। এত দিন যা হয়েছে, এখন মানুষ জানতে চায় ঈদের পরে কী হতে যাচ্ছে। হোক কাছের বা দূরের, মানুষ আশার আলো দেখতে চায়। পরিস্থিতির বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা বা নির্ভরযোগ্য রূপরেখা দেশবাসীর সামনে হাজির করতে পারেনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এই দুর্বলতা অন্য মন্ত্রণালয়ের সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

একাধিক বেসরকারি গবেষণা বলছে, করোনার অর্থনৈতিক প্রভাব গভীরতর হচ্ছে। একটি গবেষণা বলছে, দেশে এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে ৪৩ শতাংশ মানুষ। এর বড় অংশটি করোনার কারণে ‘নতুন দরিদ্র’। এদের জন্য মাসে আর্থিক সহায়তা দরকার প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা। এটি দেশের অর্থনৈতিক সমস্যার অতি ক্ষুদ্র একটি চিত্র। সরকার অবশ্য সমস্যা মোকাবিলায় ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। এই সমস্যার কার্যকর সমাধানে নীতি পরামর্শের জন্য স্বাস্থ্যবিষয়ক অনেক তথ্য–উপাত্ত দরকার। অর্থনীতির গবেষকেরা তা পাচ্ছেন না বলে জানা গেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্ববাসীকে কিছুটা হতাশ করলেও সত্যটি উচ্চারণ করেছে। বলেছে, করোনা যাচ্ছে না। করোনা থাকছে। করোনা নিয়েই বাঁচতে হবে। অন্য বিকল্পের মধ্যে একটি হচ্ছে, টিকা আবিষ্কার। কার্যকর টিকা তৈরি। কিন্তু তা অচিরেই উৎপাদন ও দেশের মানুষের জন্য সহজলভ্য হওয়া সম্ভব না। নতুন কার্যকর কোনো ওষুধের জন্য কত দিন অপেক্ষা করতে হবে তা কেউ জানে না। অন্য আর একটি বিকল্প হচ্ছে, দেশের ১৩–১৪ কোটি মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ঘটতে দেওয়া যেন ফল হিসেবে মানুষের শরীরে করোনা প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে ওঠে। কোন বিকল্পের পথে আমরা হাঁটছি, আদৌ কোনো বিকল্পের পথে হাঁটছি কি না, নাকি ভাগ্যের ওপর সবকিছু ছেড়ে দেওয়া—সাধারণ মানুষ তা জানে না।

এরই মধ্যে ঈদ। পবিত্র ও প্রিয় খুশির ঈদ। এবার আর বাঁধভাঙা আনন্দে ভেসে যাওয়া যাবে না। থাকতে হবে সতর্ক হয়ে, চলতে হবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে। সবাই মানলে করোনামুক্ত হবে সবাই। প্রিয়জনকে নিরাপদে রাখতে পারলে এবার ঈদের খুশি অন্যমাত্রা পাবে। এবার যাকে বুকে জড়িয়ে ধরা গেল না, তাকে বলতে হবে, ‘আমাদের দেখা হোক মহামারি শেষে...আমাদের দেখা হোক সুস্থ শহরে।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন