গাইবান্ধায় বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষার আবেদন

বিজ্ঞাপন
default-image

গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার ৪ নম্বর বরিশাল ইউনিয়নের ‘ভগবানপুর’ বঙ্গবন্ধু এবং এক মুক্তিযুদ্ধ সংগঠক ও বালুরঘাট লিবারেশন ক্যাম্পের সাধারণ সম্পাদক মরহুম আজিজার রহমান সরকারের স্মৃতিবিজড়িত একটি গ্রাম। আজিজার রহমান সরকার ছিলেন বঙ্গবন্ধুর একজন সহযোদ্ধা এবং রংপুর-২২ আসনের ১৯৬২, ১৯৬৭ ও ১৯৭০ সালে নির্বাচিত এমপিএ। বঙ্গবন্ধুর এই সহযোদ্ধা তাঁর এলাকায় করেছেন অনেক জনকল্যাণকর কাজ এবং বাড়ি–সংলগ্ন একটি পতিত জায়গায় গড়ে তুলেছিলেন ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, দাতব্য চিকিৎসালয়, কমিউনিটি সেন্টার ও কৃষি ব্লক সুপারভাইজারের বাসভবন এবং নিজ হাতে রোপণ করেছিলেন নানা প্রকার গাছপালা।

ছায়া-সুনিবিড় এ জায়গা এবং সেখানে প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সেবা পেয়েছেন এলাকার হাজারো মানুষ। শুধু তা–ই না, ১৯৭০ সালের নির্বাচনী সফরে বঙ্গবন্ধু যখন রংপুরে এসেছিলেন, তখন তিনি তাঁর অন্যতম প্রিয় সহযোদ্ধা আজিজার রহমান সরকারের বাড়িতে বিশ্রাম নিয়ে দুপুরের খাওয়াদাওয়া করেছিলেন। আজিজার রহমান সরকারের বাড়ি প্রাঙ্গণসহ এই জায়গায় উপস্থিত কয়েক হাজার মানুষের উদ্দেশে ভাষণও দিয়েছিলেন। প্রত্যন্ত একটি গ্রামে বঙ্গবন্ধু কেন্দ্রীয় নেতাসহ এসেছিলেন। কারণ, তিনি আজিজার রহমান সরকারকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন এবং ভালোবাসতেন। বঙ্গবন্ধুর সেই আগমন স্মৃতি এবং এক মুক্তিযুদ্ধ সংগঠকের জন্মের কারণে ভগবানপুর গ্রাম পলাশবাড়ীর প্রায় সবার কাছেই পরিচিত।

অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে নবীন প্রজন্মের জন্য এ ঐতিহাসিক জায়গাটি সংরক্ষণের জন্য কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বরং নিদারুণ অবহেলায় এই জায়গা এবং প্রতিষ্ঠানগুলো আজ ধ্বংসপ্রাপ্ত। কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শুধু আজিজার রহমান সরকারের রোপণ করা বটগাছ, পাকুড় এবং আমসহ পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সের অনেকগুলো গাছ। অতিসম্প্রতি জায়গাটিকে পরিত্যক্ত দেখিয়ে এর জনগুরুত্ব বিবেচনা না করে গোপনে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে কয়েকজন ব্যক্তির নামে (ভূমিহীন কথা বলে)।

default-image

এলাকাবাসী এ ঘটনায় অত্যন্ত ব্যথিত এবং ক্রদ্ধ। তাঁরা বুঝতেই পারছেন না কী করে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি–সংবলিত একটি ঐতিহাসিক জনগুরুত্বপূর্ণ জায়গা কৃষিকাজের জন্য কয়েকজনকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কারা এবং কী উদ্দেশ্যে এ রকম একটি জায়গা বঙ্গবন্ধুর কন্যার আমলে ধ্বংসের ব্যবস্থা করেছে? শুধু তা–ই না, এ জায়গাটি ২০০৩ সালে ইউনিয়ন পরিষদের নামে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চাওয়া হলেছিল। তৎকালীন জেলা প্রশাসক এই বলে বন্দোবস্ত দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন যে ‘সিএস রেকর্ডে বর্ণিত জমি দেবস্থান উল্লেখ থাকায় এবং বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় তা বন্দোবস্ত প্রদানের অবকাশ নেই।’

আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, সেই সিএস রেকর্ড একই আছে, কিন্তু বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ব্যক্তিস্বার্থে মাত্র ৯ জনকে। এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ও হতবাক। হিন্দু সম্প্রদায় মনে করে এই জায়গা এত দিন জনস্বার্থে ব্যবহৃত হয়েছে এবং ভবিষতেও জনস্বার্থে ব্যবহৃত হওয়া উচিত। এ রকম একটি জায়গা সম্পূর্ণ ব্যক্তিস্বার্থে কয়েকজনকে বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক নয়।

এই বরাদ্দ বাতিলের জন্য এলাকাবাসী নানাভাবে চেষ্টা করছেন। তাঁরা জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন দিয়েছেন যে আবেদনে সুপারিশ করেছেন সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও স্থানীয় নেতারা। হিন্দু-মুসলিম শত শত এলাকাবাসী সম্মিলিতভাবে স্বাক্ষর করেছেন এই আবেদনে। শুধু তা–ই না, এলাকাবাসী প্রয়োজনে অন্যত্র কৃষিজমি দিতেও প্রস্তুত। এত কিছু করার পরও কিছুই হচ্ছে না। শুধু ‘হচ্ছে বা করছি বা হবে’। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছেন। কিন্তু এক অদৃশ্য কারণে এখন পর্যন্ত ফলাফল শূন্য।

default-image

এলাকাবাসীর দাবী হচ্ছে, এই বরাদ্দ বাতিল করে এই জায়গায় বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতির উদ্দেশে জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান করা হোক। সুন্দর এই জায়গায় সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে অম্লান থাকবে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি, রক্ষা পাবে মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠকের গড়ে তোলা স্থান, উপকৃত হবে হাজারো এলাকাবাসী এবং সেই সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে উপকার করা যেতে পারে ভূমিহীনদের। কিন্তু এভাবে ঐতিহাসিক এই জনসম্পদকে কয়েকজনের নামে বরাদ্দ দিলে চিরতরে নষ্ট হয়ে যাবে জায়গাটি।

default-image

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি করোনা এবং বন্যা নিয়ে দিবারাত্রি ব্যস্ত। আপনার অমূল্য সময় নষ্ট করা আমাদের অভিপ্রায় নয়। তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এ রকম একটি স্মৃতিবিজড়িত স্থান সংরক্ষণ এবং উন্নয়ন জনস্বার্থে অতীব প্রয়োজন। আপনার নিকট এলাকাবাসীর সবিনয় নিবেদন, অনুগ্রহপূর্বক এই জায়গাটি ধ্বংসের হাত থেকে করুন। বঙ্গবন্ধুর এবং মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিবিজড়িত ভগবানপুর গ্রামের গর্বের এই জায়গাটি সংরক্ষণ করুন।

*লেখক: অধ্যাপক মো. লতিফুর রহমান সরকার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন