গাজীপুরে গত বুধবার রাতে বলাকা বাসে দুর্বৃত্তদের ছোড়া পেট্রলবোমায় দগ্ধ ১২/১৩ বছরের কিশোর রাকিবের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আজ শনিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে হরতাল-অবরোধে দগ্ধ লোকজনের শারীরিক অবস্থা জানানোর জন্য আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ইউনিটের চিকিৎসকেরা এ কথা জানিয়েছেন। আজকের দেওয়া হিসাবমতে রাকিবসহ পাঁচজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

গত বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের অবজারভেশন ওয়ার্ডের মেঝেতে বসে রাকিবের মা রাশিদা বেগম বুক চাপড়ে বলছিলেন, ‘তোরা দেশটারে শান্তিমতো চালা, গরিবরে মারস ক্যা? আমার পুলা কয়, আম্মা আমারে বাঁচাও, গাড়িতে আগুন লাগাইছে। দ্যাশে গন্ডগোল ক্যান, তা জানি না। আমার বুকটা খালি হইয়া যাইতাছে। আমি আর কিছু চাই না, আমি আমার পুলারে বুকে চাই।’

পেট্রলবোমায় রাকিবের পুরো মুখ পুড়ে ফুলে গেছে। দুই পা, মাথা, পিঠ, নাক, কান, চোখ, ডান হাতসহ শরীরের প্রায় সবই পুড়েছে। এখন সে বার্ন ইউনিটের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে রয়েছে।

রাকিব ও তার মা রাশেদা বাজারের আড়তে সবজি কুড়াতেন। পাইকারেরাও মাঝে মাঝে কিছু বাতিল বা পচে যাওয়া আলু, পিঁয়াজ, পটল তাদের দেন। তা ছোট ছোট ভাগা করে বিক্রি করে যা পাওয়া যেত, তা দিয়েই চলত মা, ছেলে ও এক মেয়ের সংসার। রাশেদা বেগম জানালেন, তাঁদের বাড়ি ময়মনসিংহের গফরগাঁও। এখন বাসা ভাড়া নিয়ে গাজীপুরের জয়দেবপুরে থাকেন। হরতাল-অবরোধের কারণে আগের মতো আর সবজি পাওয়া যায় না। সবজির ট্রাক তো আসা-যাওয়াই করতে পারে না। ঘরে ছোট দুই কৌটা চাল ছাড়া আর কিছু ছিল না। মা ও ছেলের এক সঙ্গেই বাজারে যাওয়ার কথা ছিল। ছেলে মাকে পরে যেতে বলে বাড়ি থেকে বের হয়। বাড়ি থেকে দুই কিলোমিটার যাওয়ার পথেই ঘটে ওই মর্মান্তিক ঘটনা।

রাশেদা বেগমের চার ছেলে এক মেয়ে। তিন ছেলে রিকশা চালান। তাঁরা আলাদা থাকেন। মেয়েকে টাকার অভাবে বিয়ে দিতে পারেননি।

সে দিন আগুন লাগার পরে কী কী ঘটেছে রাকিবের ভাই জুলহাস তা জানালেন প্রথম আলোকে। জুলহাস বলেন, রাকিবের ভাষ্য অনুযায়ী, শরীরে আগুন লাগার পর এক লোক বলতে থাকেন ‘তুমি মাটিতে গইড় দাও’। রাকিব তা-ই করে। তবে তাতে করেও আগুন নেভে না। তারপর শরীরের কাপড় খুলে ফেলে। ততক্ষণে বলতে গেলে সারা শরীরই দগ্ধ হয়ে গেছে। যে জায়গায় ঘটনাটি ঘটেছে সেখান থেকে রাকিবের বাড়ির দূরত্ব দুই কিলোমিটারের মতো। একজন রাকিবকে একটি লেগুনায় তুলে দেয়। লেগুনা থেকে নেমে একজনের কাছ থেকে ৩০ টাকা নিয়ে রাকিব বাড়ি আসে। তখন জুলহাস বাড়িতেই ছিলেন। রাকিব চিৎকার করে আগুনের কথা বলতে থাকে।

জুলহাসের ভাষ্য, রাকিবকে প্রথমে গাজীপুর সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। তারপর সেখান থেকে চার হাজার টাকা দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে তাঁরা ঢাকায় আসেন। তবে অ্যাম্বুলেন্স চালক তাঁদেরকে নিয়ে যায় উত্তরার একটি বেসরকারি ক্লিনিকে। সেখানে সাত থেকে আট হাজার টাকা খরচ হওয়ার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রাত তিনটার দিকে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব নয় বলে বের করে দেয়। তারপর এক হাজার টাকা দিয়ে মাইক্রো ভাড়া করে ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে ভর্তি হন। জুলহাস বলেন, ‘আমরা অ্যাম্বুলেন্সওয়ালারে বলছিলাম যেখানে ভালো চিকিৎসা হয় সেইখানে নিয়া যাইতে। আমরা এর আগে আর কোনো রোগী নিয়া ঢাকায় আসি নাই। পরে ওই হাসপাতাল বাইর কইরা দিলে লোকজনের কাছ থেকে ঠিকানা নিয়া এই হাসপাতালে আসি।’

বার্ন ইউনিটের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আজকে পর্যন্ত হরতাল-অবরোধের শিকার হয়ে বার্ন ইউনিটে ভর্তি হয়েছে ১২৩ জন। আজ ভর্তি আছে ৬২ জন। চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছে ৫২ জন। আর এ পর্যন্ত মারা গেছেন নয়জন।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন