আলোচনায় বক্তারা বাংলাদেশে গুম বন্ধে জবাবদিহি নিশ্চিতের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকার ওপর জোর দেন। বিশেষ করে গুমের ঘটনাগুলোর সঙ্গে র‍্যাবের নাম আসায় বাহিনীর জ্যেষ্ঠ সদস্যদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথাও আলোচনায় উঠে আসে।

এই আলোচনার আগের দিন ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম শহীদুল ইসলাম সভার আয়োজক মার্কিন কংগ্রেসের সদস্য জেমস পি ম্যাকগভার্ন ও ক্রিস্টোফার স্মিথকে চিঠি লেখেন। সেখানে তিনি গুমের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন। রাষ্ট্রদূত লেখেন, নিখোঁজের সব ঘটনাকে গুম হিসেবে বর্ণনা করার মাধ্যমে সরকারের ভাবমূর্তি ও অর্জনকে ক্ষুণ্ন করাটা উদ্বেগের। কারণ ‘ঘটনার শিকারে’ পরিণত হওয়া লোকজনের ফিরে আসার মাধ্যমে প্রমাণিত ‘তথাকথিত গুমের’ অভিযোগ মিথ্যা। কিছু দুষ্কৃতকারী র‍্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাম ভাঙিয়ে অপহরণে যুক্ত আছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাগত দক্ষতা আর বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে এ ধরনের অপরাধমূলক তৎপরতা চালানো হচ্ছে।

মার্কিন কংগ্রেসের টম ল্যান্টোস মানবাধিকার কমিশনের ভার্চ্যুয়াল সভায় বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিদের বক্তব্য শোনেন কংগ্রেস সদস্যরা। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, গুম নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থানটা কী, তা এই আলোচনা শুরুর আগে রাষ্ট্রদূতের চিঠি থেকে স্পষ্ট। অনেকের আশঙ্কা, সরকারের এ নিয়ে জবাবদিহির কোনো ইচ্ছাই নেই। এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে যে ৮৬ জনের কথা বলা হয়েছে, তাঁরা আইনের আওতায় আসেননি। এইচআরডব্লিউর এই কর্মকর্তা বলেন, র‍্যাবের বিরুদ্ধে যখন এত অভিযোগ, তখন তাদের বিচারহীনতায় রাখার মধ্য দিয়ে গুমকে উৎসাহিত করা হয়। এতে র‍্যাব নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় কি না, সেটাই এক প্রশ্ন।

মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ‘কোভিড-১৯ মোকাবিলা নিয়ে সারা বিশ্বে তুমুল সমালোচনা হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশে এ নিয়ে নিজেদের মত প্রকাশ করতে গিয়ে লেখক মুশতাক আহমেদ ও কার্টুনিস্ট আহমেদ কিশোরের যে পরিণতি হয়েছে, সেটি আমাদের উদ্বিগ্ন করে তোলে।’

আলোচনায় ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে আলোকচিত্রী শহিদুল আলম বলেন, ‘বাংলাদেশে গুমের একটি মামলারও বিচার হয়নি কেন, তা একটি বড় প্রশ্ন। তার চেয়ে বিস্ময়ের ঘটনা হচ্ছে, যাঁদের নিরাপত্তা বাহিনী উঠিয়ে নিয়ে যায়, বের হয়ে আসার পর তাঁরা নিশ্চুপ হয়ে যান। ফলে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের কোনো সুযোগ নেই। কথা বলতে হলে অনেক ঝুঁকি নিতে হয়। এ রকম এক নিপীড়নকারী সরকারের শাসনে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঝুঁকিতে রয়েছেন। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন যখন থাকে না, সংসদে যখন কোনো জবাবদিহির সুযোগ নেই, তখন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ দুরূহ। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন পরিস্থিতি উত্তরণের একমাত্র পথ।’

এশিয়ান মানবাধিকার কমিশনের লিয়াজোঁ কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, র‍্যাবকে বিচারহীনতার আওতায় রেখে কর্মকাণ্ড চালাতে দিয়ে ভিন্নমতের কণ্ঠ রোধ করা হচ্ছে। কারণ, গ্রেপ্তার এবং গুমের জন্য যখন কাউকে বীর হিসেবে পুরস্কৃত করা হয়, তখন পরিস্থিতি বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়।

বিএনপির নেতা সাজুদুল ইসলাম সুমনের বোন সানজিদা ইসলাম তাঁর ভাইসহ গুমের শিকার সবার খোঁজ জানতে চান। গুমের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনাটা জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

টেক্সাস থেকে ১১ বার নির্বাচিত ডেমোক্রেট কংগ্রেস সদস্য শীলা জেকসন লি প্রশ্ন করেন, এই পরিস্থিতির উত্তরণে নাগরিক সমাজকে কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা করতে পারে? শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের নিয়োগের বিষয়ে কী করা যেতে পারে?

জবাবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন রবার্ট এস কেনেডি হিউম্যান রাইটসের ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যাঞ্জেলিটা বায়েনেস বলেন, এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র অভিযুক্তদের নিয়োগের (শান্তিরক্ষা) সময় তার ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে। এমনকি মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন