দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ অনেক রোগনির্ণয় যন্ত্র বিকল হওয়ায় সাধারণ রোগীদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। বাধ্য হয়ে রোগীদের বাইরের ডায়াগনাস্টিক সেন্টারে ছুটতে হচ্ছে। গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। ১৮ ও ১৯ মে দুদিন এই হাসপাতাল ঘুরে এমন ভোগান্তির দৃশ্য চোখে পড়ে।
হাসপাতাল প্রশাসনের একটি সূত্র জানায়, হাসপাতালের দুটি সিটি স্ক্যান মেশিনই অকেজো। এর মধ্যে একটি আর মেরামতেও সচলযোগ্য নয়। অপরটি ২০২০ সালের জুন থেকে অকেজো পড়ে আছে। ফলে প্রায় দুই বছর ধরে হাসপাতালে সিটি স্ক্যান বন্ধ রয়েছে।
হাসপাতালে একটিমাত্র এমআরআই মেশিন থাকলেও সেটি অকেজো হয়ে আছে পাঁচ বছর ধরে। এই মেশিনটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। ফলে এটিকেও আর মেরামতে সচল করার উপায় নেই। নতুন মেশিন পেতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বারবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে লিখিত অনুরোধ করেও সাড়া পায়নি।
এক হাজার শয্যার এই হাসপাতালে পাঁচটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন আছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এর তিনটিই বিকল। দুটি কোনো রকম চালু থাকলেও তা দিয়ে আন্তর্বিভাগ ও বহির্বিভাগের রোগীদের চাহিদা অনুযায়ী পরীক্ষা চালানো যাচ্ছে না। হাসপাতাল সূত্র বলছে, প্রতিদিন অন্তত দেড় শ রোগী আলট্রাসনোগ্রামের জন্য আসেন। অতিরিক্ত চাপ পড়ায় এই দুটি মেশিনও ঝুঁকিতে আছে।
সবচেয়ে খারাপ অবস্থা হাসপাতালের এক্স–রে বিভাগের। এখানে ১৩টি এক্স–রে মেশিনের মধ্যে ৮টিই বিকল। বাকি পাঁচটি যন্ত্রের মধ্যে একটি শিশু ওয়ার্ডে এবং একটি করোনা ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়েছে। ফলে মাত্র তিনটি যন্ত্র দিয়ে প্রতিদিন অন্তত সাড়ে ৩০০ রোগীর এক্স–রে করতে হচ্ছে। এতে রোগীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও প্রায়ই সিরিয়াল পান না রোগীরা। একই সঙ্গে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের অপেক্ষা করতে গিয়ে দুর্ভোগের শেষ থাকে না।
একইভাবে হৃদ্রোগীদের ইকোকার্ডিওগ্রাম মেশিন ও ক্যাথল্যাবটি ২০২১ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে বন্ধ। এ কারণে এই হাসপাতালে থমকে আছে ইকোকার্ডিওগ্রাম সেবা। ক্যাথল্যাব বন্ধ থাকায় এনজিওগ্রাম করা যাচ্ছে না তিন বছর ধরে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, প্রায় তিন বছর ধরে অচল রয়েছে এখানে ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কোবাল্ট-৬০ মেশিনটি। তবে হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগটি মোটামুটি সচল আছে।
সরকারি হাসপাতালে রোগনির্ণয় যন্ত্রগুলো বছরের পর বছর অকেজো হওয়ার সুযোগ নিচ্ছে হাসপাতালের সামনের সিকি কিলোমিটারের মধ্যে গড়ে উঠা অন্তত ৩৯টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার। প্রতিদিন সকাল নয়টার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এসব ডায়াগনস্টিক সেন্টার খোলা থাকে। হাসপতালে ভর্তি থাকা কিংবা বহির্বিভাগের চিকিৎসা নিতে আসা কয়েক শ রোগী হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ না পেয়ে বাধ্য হয়ে এসব ডায়াগনাস্টিক সেন্টারে যান।
রোগনির্ণয়ের এসব যন্ত্রপাতি অকেজো থাকার বিষয়ে হাসপাতালের চিকিৎসা সরঞ্জাম তদারক কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বিভিন্ন সময়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব রোগনির্ণয়ের যন্ত্র কেনা হয়েছিল। যেগুলোর মেয়াদ রয়েছে, সেগুলো মেরামতের জন্য সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে কোবাল্ট-৬০ মেশিনটি মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় এটি আর সচল হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
দুদিন হাসপাতালের এসব বিভাগ ঘুরে সেবাপ্রার্থীদের ভোগান্তি চোখে পড়ে। গত বুধবার দুপুরে রেডিওলোজি বিভাগের সামনে কথা হয় আসমা আক্তার নামে বরিশাল সদরের চরকাউয়া এলাকার এক গৃহবধূর সঙ্গে। তাঁর আট বছর বয়সী ছেলে হাতে ব্যথা পেয়েছে। তাকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন, চিকিৎসক এক্স–রে দিয়েছেন। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো আসাম আক্তার বললেন, ‘দেড় ঘণ্টার বেশি অইছে লাইনে খাড়াইন্না। কতকুনে যে সিরিয়াল পামু কইতে পারি না। গরমে আর টেহন যায় না। টাহা থাকলে বাইরে গোনে এক্স–রে করাইতাম।’ এখানে এমন ১০০-এর বেশি মানুষকে লাইনে অপেক্ষমাণ দেখা গেল। তাঁরা সবাই দূরদূরান্ত কিংবা অন্য জেলা থেকে এসেছেন।
এমন ভোগান্তি দেখা যায় আলট্রাসনোগ্রাম কক্ষের সামনেও। নলছিটি উপজেলার সাব্বির হোসেন নামে এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বললেন, ‘এত ভিড় যে কোন সময় ডাক পামু কইতে পারি না।’ সেখানে আর ৫০–৬০ জন রোগীকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে গেল। তাঁদের কেউ কেউ অধৈর্য হয়ে হাসপাতালের সামনের ডায়াগনস্টিক সেন্টারেও চলে যাচ্ছেন।
সংকটের বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক এইচ এম সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘নতুন একটি সিটি স্ক্যান মেশিন শিগগিরই আমরা পাব। এমআরআই মেশিনের জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রগুলো নতুন পেতে অথবা সচল করার জন্য মন্ত্রণালয়ে বারবার তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। আশা করি, অল্প সময়ের মধ্যে অকেজো মেশিনগুলো সচল করা সম্ভব হবে এবং রোগীদের ভোগান্তি লাঘব হবে।’