default-image

নিরপরাধ মানুষের হত্যাকাণ্ড ঘিরে তৈরি হয় ব্যক্তিক ও পারিবারিক ট্র্যাজেডি। কিন্তু ইতিহাসের ট্র্যাজেডি ভিন্ন চরিত্রের হয়ে থাকে, যখন মূল হত্যাকারীকে তার কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় কখনো কখনো মাশুল গুনতে হয়; বিশেষ করে সে মাশুল গোনা যখন সম্পন্ন হয় কোনো দেশ, জাতি বা রাষ্ট্রকে ঘিরে। একুশের ভাষা আন্দোলন যে ট্র্যাজেডির সূচনা ঘটায়, তা দীর্ঘ দুই দশকের নানা বাঁক ফেরার মধ্য দিয়ে পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশের জন্য মুক্তির সনদ বয়ে আনে। মাশুল গোনার আঘাতটা বহন করতে হয় পাকিস্তান নামের একটি স্বৈরতন্ত্রী, অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে।

তাই বলতে হয়, একুশে ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে রফিক, বরকত, জব্বার ও নাম-পরিচয়হীন আরও কয়েকজনের আত্মদান বৃথা যায়নি। ২১ তারিখে ব্যারাক প্রাঙ্গণে গুলিবিদ্ধ সালাম অবশ্য মারা যান পরে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। পরবর্তী দিনগুলোয় এ আন্দোলনে যাঁরা শহীদ হয়েছেন, তাঁরাও একই কাতারে রয়েছেন। তাঁদের জীবনদানের ফলেই রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি জনচেতনা স্পর্শ করে, সারা দেশ বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে, সরকারের মৃত্যুঘণ্টা বেজে চলে। মাত্র দুই বছরের মধ্যেই শুধু মুসলিম লীগ সরকারেরই নয়, পূর্ববঙ্গে মুসলিম লীগ দলেরও রাজনৈতিক মৃত্যু ঘটে। একে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চলে আধাসামরিক শাসন (৯২-ক ধারা) জারি করে। কিন্তু তাতে শেষ রক্ষা হয়নি।

বিজ্ঞাপন

একুশের একগুচ্ছ মৃত্যুর প্রতিক্রিয়া জনচেতনা স্পর্শ করেছিল বলেই পুরান ঢাকার আমজনতা, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি সম্পর্কে তাদের ভিন্নমত বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দিয়ে আন্দোলনে শামিল হয়, একাত্ম হয় ছাত্রদের প্রতিবাদী চেতনার সঙ্গে। এর প্রকাশ দেখা যায় একুশে ফেব্রুয়ারি বিকেল থেকে। কন্ট্রোল রুমের মাইকে রক্তঝরা প্রচার সেদিন গুলিবর্ষণের বার্তা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। দলে দলে মানুষ ছুটে আসতে থাকে হোস্টেল প্রাঙ্গণে, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

সেদিন বিকেলের ঘটনা যেমন ছিল অভাবিত, তেমনি মর্মস্পর্শী। কান্না আর বেদনার প্রকাশ সেদিন নুরুল আমিন সরকারের প্রতি ধিক্কার ছুড়ে দিয়েছিল। ব্যারাক প্রাঙ্গণে ঢাকাই আমজনতার ঢল চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন হতো। পুরান ঢাকার নানা বয়সী মানুষ ঘুরে ঘুরে পুলিশি হত্যাকাণ্ডের আলামত দেখে ক্ষোভে উত্তাল হয়েছে। প্রাঙ্গণে রক্তের ছাপ আর হোস্টেলের শেডগুলোয় গুলির চিহ্ন তাদের মধ্যে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, তা একটিমাত্র বাক্যে প্রকাশ পায়: ‘গুলি কইরা ছাত্র মাইরা হালাইছে।’ হাসপাতালে তাদের ভিড়ে অন্য রোগীদের জন্য শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার সৃষ্টি হয়। কিন্তু এই ঢাকাইয়া মানুষই আটচল্লিশে ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতা করেছে, কেউ কেউ ছাত্রদের ওপর হামলা করেছে। আর একুশের প্রস্তুতিপর্বে তারা একধরনের নিরপেক্ষ ভূমিকা নিয়েছে। পুলিশের গুলি এবং মৃত্যুর ঘটনাই তাদের সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়েছিল। তারা ছাত্রদের সঙ্গে এক কাতারে আন্দোলনে শামিল হয়—মূলত তাদের তরুণ সমাজ। অথচ কজনই–বা ছিলেন সেদিন একুশের শহীদ? মানিকগঞ্জ দেবেন্দ্র কলেজের ছাত্র রফিকউদ্দিন মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে তাৎক্ষণিক মৃত্যুবরণ করেন। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবুল বরকতের ঊরুতে গুলি লাগে। অস্ত্রোপচার করেও তাঁর প্রাণ বাঁচানো যায়নি। গফরগাঁওয়ের কৃষকযুবা আবদুল জব্বার ঢাকায় আসেন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর দেখাশোনা করতে। উঠেছিলেন ২০ নম্বর শেডের ৮ নম্বর কক্ষে। তিনিও পুলিশের গুলির শিকার—ইমারজেন্সিতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তাঁর মৃত্যু।

default-image

কিন্তু এখানেই শেষ নয়; ফুলার রোডে পুলিশের গুলিতে অজ্ঞাতনামা কিশোরের মৃত্যু এবং তাকে পুলিশের তুলে নেওয়ার ঘটনা দৈনিক আজাদে প্রকাশিত হয়। আর খেলার মাঠের পশ্চিমে রাস্তায় সমবেত জনতার ওপর পুলিশের গুলিতে অন্তত একজন যে শহীদ হয়েছিলেন, তা তৎকালীন মাদ্রাসাছাত্র লোকমান আহমদ আমীমীর ভাষ্যে জানা যায়। সাদা শার্ট ও পায়জামা পরা ওই যুবকেরও পরিচয় মেলেনি, যদিও তাঁকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় বলে লোকমান আহমদ জানান। ওই দিন গুলিতে আহত আবদুস সালাম অবশ্য ৭ এপ্রিল হাসপাতালে মারা যান।

সব মিলিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারির গুলিবর্ষণে ছাত্র-অছাত্র শহীদের সংখ্যা অন্তত ছয়। ‘অন্তত’ শব্দটির ব্যবহার এ জন্য যে উল্লিখিত একজন ছাড়াও গুলিবিদ্ধ আর কাউকে পুলিশ তুলে নিয়েছিল কি না, তা আমাদের জানা নেই। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সাক্ষ্যপ্রমাণে দেখা যায়, ২২ ফেব্রুয়ারিও অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে। সেদিন ছাত্র-জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল ইপিআর বাহিনী। কিন্তু ছাত্র-জনতাকে স্তব্ধ করতে পারেনি। একুশে ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে আহত হন অনেকে। শুধু হাসপাতালে ভর্তি ব্যক্তিদের সংখ্যাই পত্রিকায় উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানেও ভিন্নমত।

বিজ্ঞাপন

শুধু পুরান ঢাকায়ই নয়, গুলি ও মৃত্যুর খবরে সেদিন পরিষদ ভবনেও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশসহ একাধিক পরিষদ সদস্য প্রতিবাদে সোচ্চার হন এবং মুখ্যমন্ত্রীকে ঘটনাস্থলে যেতে দাবি জানান। মুখ্যমন্ত্রীর অস্বীকৃতিতে তাঁরা অধিবেশন বর্জন করে হোস্টেল প্রাঙ্গণে চলে আসেন এবং রক্তের ছাপ, দেয়ালে বুলেটের আঘাত-চিহ্ন ঘুরে ঘুরে দেখেন। মাওলানা তর্কবাগীশ কন্ট্রোল রুমের মাইকে ‘জালিম সরকারের পদত্যাগ’ দাবি করে বক্তৃতাও দেন। অথচ তিনি ছিলেন মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির সদস্য। আরও যাঁরা পরিষদ কক্ষ থেকে বেরিয়ে হোস্টেলে আসেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, মনোরঞ্জন ধর, খয়রাত হোসেন, আনোয়ারা খাতুন প্রমুখ। একুশে ফেব্রুয়ারি গুলিবর্ষণের প্রতিক্রিয়া বাস্তবিকই ছিল ব্যাপক এবং রাজনৈতিক দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ।

সূত্র: ভাষা আন্দোলন, আহমদ রফিক, প্রথমা প্রকাশন, ২০০৯

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন