default-image

একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহর। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানালেন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। এরপর বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। ২০ মিনিটের মাথায় তাঁদের গাড়িবহর চলে গেল। এরপর গৌরবের মিনার উন্মুক্ত হলো সর্বসাধারণের জন্য। নামল মানুষের ঢল। 
সেই যে শুরু হলো, তার যেন আর শেষ নেই। রাত পেরিয়ে ভোর হলো, সকালের আলো ফুটল, দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও মানুষের আসা থামেনি শহীদ মিনারে। শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশেই এভাবে উদ্যাপিত হলো অমর একুশে ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।
দিনভর খালি পায়ে সারিবদ্ধভাবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এসে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন লাখো মানুষ। রাতে যাঁরা এসেছিলেন, তাঁরা বেশির ভাগই আসেন বিভিন্ন সংগঠনের হয়ে। তাঁদের হাতে ছিল ফুলের বড় বড় তোড়া। এরপর ভোরে দেখা গেল বিভিন্ন স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের। বেলা যত গড়িয়েছে, সাধারণ মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। তাঁদের কারও হাতে ছিল একটিমাত্র ফুল, কারও হাতে একগুচ্ছ। তবে সবার মুখে ছিল একই সুর—আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/ আমি কি ভুলিতে পারি। শহীদ মিনার থেকে মাইকে সেই সুর ছড়িয়ে পড়ছিল দিকে দিকে। রাজনৈতিক হানাহানি-অবরোধ সবকিছু উপেক্ষা করে মানুষের এই শ্রদ্ধা বলে দিচ্ছিল, মাতৃভাষা আর দেশের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের টান অকৃত্রিম।
১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, যুক্তরাজ্যের হাউস অব লর্ডসের স্পিকার রাইট বারোনেস ডি সুজা, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা, ১৪ দলের নেতা-কর্মী, বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, তিন বাহিনীর প্রধান, ইন্টার পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান সাবের হোসেন চৌধুরী, বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনাররা, অ্যাটর্নি জেনারেল, সেক্টরস কমান্ডার ফোরাম ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা একে একে শ্রদ্ধা জানান।
সকাল আটটার দিকে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা ইনাম আহমেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে দলের নেতা-কর্মীরা শহীদবেদিতে ফুল দেন।
রাতেই শ্রদ্ধা জানাতে আসেন অন্যান্য সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। আসেন সর্বস্তরের নানা মত-পথ-বয়সের নাগরিকেরা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষক-শিক্ষার্থী। ঢাকায় একটি প্রতিষ্ঠানে স্প্যানিশ ভাষা শেখান লুইস মার্তো। তাঁকে দেখা গেল শহীদ মিনারে। বললেন, ‘ঢাকায় আমার ছাত্ররা আমাকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের কথা বলেছে। তাই দেখতে এসেছি। অন্য রকম লাগছে।’
ভোররাতের দিকে এই মিছিলে খানিক ভাটা পড়লেও গতকাল শনিবার দুপুর পর্যন্ত মানুষের স্রোত চলতেই থাকে। সমগ্র জাতি অপার শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় স্মরণ করে মৃত্যুঞ্জয়ী সেই সব ভাষাশহীদকে।
সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে অমর একুশে ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের আয়োজন। সরকারি ছুটির এই দিনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। প্রতিষ্ঠানগুলোতে উত্তোলন করা হয় কালো পতাকা।
শহীদ মিনারে কথা হলো মাসুদ হাওলাদারের সঙ্গে। শারীরিক প্রতিবন্ধী এই যুবক ক্রাচে ভর করে এগিয়ে যান মিনারের দিকে। মুখে শহীদ মিনারের প্রতিকৃতি আঁকা। তিনি একটি চকলেট কারখানায় কাজ করেন। জানালেন, প্রতিবছরই এখানে আসার চেষ্টা করেন।
অনেকে আসেন ছোট ছোট শিশুকে কাঁধে নিয়ে। লাল-সবুজ কিংবা সাদা-কালোর মিশেলে গড়া পাঞ্জাবি পরিয়ে বাবা-মায়েরা বাচ্চাদের শোনান অতীতের গৌরবময় ইতিহাসের কথা। শিশুর গালে, কপালে আঁকা ছিল শহীদ মিনার। জাতীয় পতাকার ছবিও আঁকিয়ে নিয়েছিল অনেকেই।
বড়দের পোশাকেও একুশের শোকসন্তাপের আবহ ছিল। বেশির ভাগ নারী-পুরুষের শাড়ি-পাঞ্জাবিতে সাদা আর কালো রঙের ব্যবহার দেখা গেছে। বর্ণমালা, কবিতার চরণ কিংবা গানের কলিখচিত। গালে, বাহুতে আঁকা শহীদ মিনার। সকাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের সামনে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে, বইমেলার রাস্তায় এবং জাতীয় জাদুঘরের সামনে হাতে তুলি আর রং নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন আঁকিয়েরা।
দিনভর আবালবৃদ্ধবনিতার দেওয়া ফুলে ফুলে ভরে যায় শহীদ মিনার। স্বেচ্ছাসেবীরা সেসব ফুল দিয়ে আঁকেন আল্পনা। ছড়িয়ে দেন পুরো মিনার প্রাঙ্গণে। ঢাকা পড়ে বাঙালির গৌরবের এই মিনার। এসব যেন ৬৩ বছর আগের গৌরবোজ্জ্বল সেই দিনটিকে ফিরে দেখা।
রাজধানীর অনেক প্রতিষ্ঠানেও যথাযোগ্য মর্যাদায় শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হয়। সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ নিজেদের ক্যাম্পাসে দিনটি পালনের জন্য বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন