default-image

দেশে প্রতি ঘণ্টায় পাঁচ বছরের কম বয়সী তিনটি শিশুর মৃত্যু হচ্ছে নিউমোনিয়ায়। আর বছরে এই রোগে গড়ে মারা যায় ২৪ হাজার ৩০০ শিশু। আক্রান্ত শিশুদের বড় অংশ মারা যাচ্ছে বাড়িতে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেয়ে। শিশুদের নিউমোনিয়ার সংক্রমণ কেন ঘটছে, সেটির ৫০ শতাংশ কারণ এখনো অজানা। এসব কারণ জানতে দেশে পর্যাপ্ত গবেষণাও হচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, একসময় শিশুমৃত্যু হ্রাস নিয়ে বাংলাদেশ গর্ব করত। কিন্তু কয়েক বছর ধরে গর্বের জায়গাটি হারিয়ে যাচ্ছে। নিউমোনিয়া প্রতিরোধে সব কার্যক্রম দ্বিগুণ বাড়ানো উচিত ছিল, কিন্তু সেটি হয়নি। বর্তমানে নিউমোনিয়ায় শিশুমৃত্যু কমাতে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তা–ও পর্যাপ্ত নয়। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আজ (১২ নভেম্বর) নিউমোনিয়া দিবস পালন করা হবে।

বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি এক হাজার জীবিত-জন্ম নেওয়া শিশুর মধ্যে ১২টি শিশু মারা যেত নিউমোনিয়ায়। বর্তমানে সেটি প্রতি হাজারে আটজন। বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মধ্যে প্রতি এক হাজার জীবিত-জন্ম নেওয়া শিশুর মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা তিনে নামিয়ে আনতে হবে।

বিজ্ঞাপন

শিশুর শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে, শ্বাস নেওয়ার সময় শিশুর বুক দেবে যাওয়া, জ্বর–কাশি এবং ঘন ঘন শ্বাস নেওয়া নিউমোনিয়ার লক্ষণ বলে জানান চিকিৎসকেরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে প্রতি বছর আট লাখ শিশু নিউমোনিয়ায় মারা যায়। এর ৯০ শতাংশই আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে।

দেশের নিউমোনিয়া বর্তমান পরিস্থিতি ও করণীয় নিয়ে গতকাল বুধবার রাজধানীর আইসিডিডিআরবি কার্যালয়ে এক মতবিনিময় সভা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএইডের সহায়তায় এই সভার আয়োজন করে আইসিডিডিআরবির রিসার্চ ফর ডিসিশন মেকার্স (আরডিএম) প্রকল্প এবং ডেটা ফর ইম্প্যাক্ট (ডিফরআই)। সভায় দেশে নিউমোনিয়ায় মৃত্যুর তথ্য নিয়ে আলোচনা হয়।

শিশুদের নিউমোনিয়ার সংক্রমণ কেন ঘটছে, সেটির ৫০ শতাংশ কারণ এখনো অজানা।

সভায় আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী বিজ্ঞানী আহমেদ এহসানুর রহমান বলেন, দেশে যেসব শিশু নিউমোনিয়ায় মারা যাচ্ছে, এর ৫২ শতাংশই মারা যাচ্ছে বাড়িতে এবং কোনো ধরনের সেবা না নিয়ে। আবার বাড়িতে চিকিৎসা নিয়ে মারা যাচ্ছে ৩ শতাংশ। আর হাসপাতালে বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসার পরও নিউমোনিয়ায় মারা যাচ্ছে ৪৫ শতাংশ শিশু।

৯৫ শতাংশ হাসপাতালেই সুবিধা নেই

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা অনুসারে, শিশু চিকিৎসার ক্ষেত্রে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ১০টি সুবিধা থাকা প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে শৈশবকালীন অসুস্থতার সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষিত কর্মী, শিশুদের ওজন মাপার স্কেল, থার্মোমিটার, গ্রোথ চার্ট (বয়স অনুপাতে ওজন ও উচ্চতার তালিকা), ওষুধ, খাওয়ার স্যালাইন, জিংক ট্যাবলেট/সিরাপ ও এমোক্সিসিলিন সিরাপ।

২০১৭ সালে করা বাংলাদেশ স্বাস্থ্যসুবিধা জরিপে দেখা গেছে, স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্রগুলোর শিশু বিভাগের সার্বিক অবস্থা বেশ খারাপ। দেশের মাত্র ৫ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এই ১০টি সুবিধা রয়েছে। বাকি বাকি ৯৫ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সব কটি প্রয়োজনীয় সুবিধা নেই।

আইসিডিডিআরবির মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী বিজ্ঞানী আহমেদ এহসানুর রহমান বলেন, একসময় শিশুমৃত্যু হ্রাস নিয়ে বাংলাদেশ গর্ব করতে পারত। দুঃখের বিষয়, কয়েক বছর ধরে এই গর্বের জায়গাটি হারিয়ে যাচ্ছে। নিউমোনিয়া প্রতিরোধে সব কার্যক্রম দ্বিগুণ বাড়ানো উচিত ছিল, কিন্তু কার্যক্রম একই জায়গায় থমকে আছে।

বিজ্ঞাপন

লড়াই অজানা শত্রুর বিরুদ্ধে

দেশে নিউমোনিয়ার সংক্রমণ কোন জীবাণুর মাধ্যমে হচ্ছে, সেটির ৫০ শতাংশ কারণ এখনো অজানা। নিউমোনিয়া প্রতিরোধ করতে হলে এর সংক্রমণের কারণ জানা জরুরি বলে মনে করেন চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সমীর কুমার সাহা। তিনি বলেন, সংক্রমণ ভাইরাসের মাধ্যমে হচ্ছে, নাকি ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে হচ্ছে, তা জানা নেই। এটি জানার উপায় আছে, কিন্তু ইচ্ছে নেই। উন্নত বিশ্বে নিউমোনিয়ায় মৃত্যু কম, তাই সংক্রমণের কারণ জানার উদ্যোগ নিজেদেরই নিতে হবে।

অপুষ্টি নিউমোনিয়াতে শিশুমৃত্যুর একটি বড় কারণ। গবেষণায় দেখা গেছে, অপুষ্টিতে থাকা শিশুদের নিউমোনিয়ায় মারা যাওয়ার ঝুঁকি ১৫ গুণ বেশি থাকে। আইসিডিডিআরবির পুষ্টি ও ক্লিনিক্যাল সার্ভিস বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী মোহাম্মদ জোবায়ের চিশতি বলেন, দেশের পুষ্টি পরিস্থিতিও এক জায়গায় আটকে আছে। নিউমোনিয়ায় শিশুমৃত্যু কমাতে হলে নিউমোনিয়া প্রতিরোধের বিষয়ে আগে নজর দিতে হবে। কোনো একক উদ্যোগে নিউমোনিয়া প্রতিরোধ সম্ভব নয়। এর জন্য বহুমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। ফুসফুসের প্রদাহ থেকে নিউমোনিয়া হয়। যেসব শিশুর অক্সিজেনের স্বল্পতা থাকে, তাদের নিউমোনিয়ায় মৃত্যুহার বেশি। তাই প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পালস অক্সিমিটার (রক্তে অক্সিজেনের হার মাপার যন্ত্র) থাকা জরুরি।

নিউমোনিয়া প্রতিরোধ সম্ভব

সুরক্ষা, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা সমন্বয়ের মাধ্যমে নিউমোনিয়া নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। শিশু নিউমোনিয়া বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা শিশু হাসপাতালের অধ্যাপক রুহুল আমিন বলেন, নিউমোনিয়া প্রতিরোধের বড় উপায় শিশুর জন্মের পর ছয় মাস পর্যন্ত শুধু মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো। ছয় মাস পর পর্যাপ্ত পরিপূরক খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। নিউমোনিয়ার অন্যতম কারণ পরিবেশদূষণ। এটি নিয়ন্ত্রণে আনা খুব জরুরি। নিউমোনিয়ার উপসর্গ থাকলে শিশুকে যেন বাড়িতে না রেখে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে আসে, সে জন্য সচেতনতা বাড়াতে হবে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে শিশুমৃত্যুর সবচেয়ে বড় কারণ এখন নিউমোনিয়া। বছরে যত শিশু (৫ বছরের কম বয়সী) মারা যাচ্ছে, এর ১৮ শতাংশ এই রোগে।

নিউমোনিয়া প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা তৈরিতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও প্রচার–প্রচারণা বাড়াতে হবে বলে মনে করেন ইউএসএইড বাংলাদেশের মনিটরিং, ইভালুয়েশন অ্যান্ড রিসার্চের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কান্তা জামিল। অন্যদিকে সবার প্রচেষ্টা ও উদ্যোগ ছাড়া নিউমোনিয়ায় মৃত্যু কমানো সম্ভব নয় বলে উল্লেখ করেন আরডিএমের চিফ অব পার্টি শামস্ এল আরেফিন।

দেশের ৯৭ শতাংশ শিশু নিউমোনিয়ার টিকা পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু টিকা দিয়ে আর নিউমোনিয়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব না। এর জন্য টিকা কার্যক্রমের পাশাপাশি ব্যবস্থাপনায় জোর দিতে হবে। অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। নিউমোনিয়ার উপসর্গগুলো দৃশ্যমান না হওয়ায় অভিভাবকেরা অনেক সময় সতর্ক থাকেন না, ফলে একদম শেষ সময়ে শিশুকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে আসেন। শ্বাসকষ্টসহ নিউমোনিয়ার কোনো লক্ষণ দেখা দিলেই শিশুকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়া জরুরি।

আইসিডিডিআরবির মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের গবেষণাপ্রধান কামরুন নাহার বলেন, গত দুই দশকে দেশে শিশুমৃত্যু কমানোর ক্ষেত্রে অগ্রগতি রয়েছে। কিন্তু এখনো নিউমোনিয়ার কারণে প্রতিবছর ৫ বছরের কম বয়সী ২৪ হাজার শিশু মারা যাচ্ছে। কোভিড-১৯ ও নিউমোনিয়ার উপসর্গ একই রকম হওয়ায়, এটি আরও উদ্বেগজনক হতে পারে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0