ঈদুল আজহা উপলক্ষে চট্টগ্রাম ছাড়ছে লাখো মানুষ। নগরের প্রায় সব কটি বাসস্ট্যান্ডে গতকাল বিকেল থেকেই ঘরমুখী যাত্রীদের ঢল নামে। আজ কদমতলী ও অলংকার বাসস্ট্যান্ড ঘুরে দেখা গেছে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেকে টিকিট পাচ্ছেন না।

এমনই একজন মো. ইব্রাহিম উল্লাহ। বাড়ি কুমিল্লার দাউদকান্দিতে। চট্টগ্রাম নগরের একটি শিল্পকারখানায় কাজ করেন তিনি। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে বায়েজিদ এলাকায় থাকেন। আজ সকাল সাড়ে আটটায় পরিবারের সবাইকে নিয়ে এসেছেন অলংকার বাসস্ট্যান্ডে। কিন্তু পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও বেলা আড়াইটা পর্যন্ত কোনো টিকিট পাননি। তাঁর সঙ্গে কথা হয় দাউদকান্দি এক্সপ্রেসের কাউন্টারের সামনে লাইনে দাঁড়ানো অবস্থায়।

ইব্রাহিম প্রথম আলোকে বলেন, সকাল থেকে কোনো বাসই পাওয়া যাচ্ছে না। পরে দাউদকান্দি এক্সপ্রেস থেকে জানানো হয়েছে, তাদের বাস আসছে। টিকিট পেতে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। তবে ভাড়া চাওয়া হচ্ছে ৪৫০ টাকা। কিন্তু অন্য সময় ৩০০ টাকায় টিকিট পাওয়া যায়।

শুধু ইব্রাহিম কিংবা সাগর নন, চট্টগ্রাম থেকে দেশের বিভিন্ন জেলা–উপজেলায় যাঁরা যাচ্ছেন, প্রায় সবাইকেই বাড়তি ভাড়ায় টিকিট কিনতে হচ্ছে। আর যাঁরা বাস পাচ্ছেন না, তাঁরা ট্রাক ও পিকআপে করে বাড়ির পথে যাত্রা করেন।

প্রায় সব কটি বাস কাউন্টারই ‘জিম্মি’ করে বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ যাত্রীদের। মোহাম্মদ আবুল হোসেন সপরিবার লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ যাবেন। বেলা ১১টার দিকে তিনি অলংকার মোড়ে আসেন। কিন্তু টিকিট পান বেলা ৩টার দিকে। ১ হাজার ২০০ টাকায় নীলাচল পরিবহনের দুটি টিকিট কেনেন তিনি। অথচ চট্টগ্রাম থেকে রামগঞ্জের স্বাভাবিক ভাড়া জনপ্রতি সাড়ে ৩০০ টাকা। বাড়তি টাকা দিয়ে টিকিট কেনায় ক্ষুব্ধ আবুল হোসেন ও তাঁর স্ত্রী হালিমা খাতুন। তাঁরা বলেন, ‘ঈদের সময় মানুষকে জিম্মি করে দ্বিগুণ ভাড়া হাতিয়ে নেন বাসমালিকেরা, কিন্তু কেউ যেন দেখার নেই।’

বাড়তি ভাড়া নিয়ে বিভিন্ন বাস কাউন্টারের কর্মচারীদের অন্য রকম দাবি। তাঁরা বলছেন, ঈদের সময় গাড়িগুলো জেলা–উপজেলায় যাত্রী নিয়ে যায়। কিন্তু ফিরতে হয় একেবারে খালি। এ কারণে কিছু টাকা বাড়তি রাখতে হচ্ছে।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর বাসমালিকদের চাপে গত এপ্রিলে ভাড়া বাড়ানো হয়েছিল। সরকার নির্ধারিত তালিকা অনুযায়ী, চট্টগ্রাম থেকে লক্ষ্মীপুরের ৪০ আসনের বাসভাড়া ৩৭৩ টাকা। ফেনীর ২১৩ টাকা, সোনাগাজীর ২৫৯ ও সোনাপুরের ৩২৩ টাকা। এই রুটে স্বাধীন বাংলা, জোনাকি, বাঁধন, শাহীসহ আরও বেশ কিছু পরিবহনের বাস চলাচল করে। শুক্রবার সরেজমিনে দেখা যায়, এসব বাসে ৬০০ টাকা করে রাখা হচ্ছে যাত্রীদের কাছ থেকে।

অলংকার মোড়ে শাহী পরিবহনের টিকিট বিক্রি করছিলেন এক ব্যক্তি। এই প্রতিবেদকের কাছে লক্ষ্মীপুরের ভাড়া ৬০০ টাকা দাবি করেন তিনি। নিজেকে মঞ্জুরুল ইসলাম নামে পরিচয় দেন। বাড়তি ভাড়া নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভাইজান, কিছু টাকা নিয়ে যান। এখন ঝামেলা কইরেন না।’

আন্তজেলা বাস মালিক সমিতির হিসাবে, প্রতিদিন চট্টগ্রাম থেকে অন্তত ১ হাজার ৬০০ বাস বিভিন্ন রুটে ছেড়ে যায়। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন দুই থেকে তিন লাখ মানুষ এসব বাসে যাওয়া–আসা করে। কিন্তু ঈদের সময় যাত্রীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২০ থেকে ২২ লাখ। অনেকে আবার বাসের টিকিট পান না। বাধ্য হয়ে অনেকেই মাইক্রোবাসে করে বাড়িতে ফেরেন। ঈদের সময় বিভিন্ন রুটে দুই থেকে আড়াই হাজার মাইক্রোবাস যোগ হয়।

চট্টগ্রাম আন্তজেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম রসুলের দাবি, সব কটি বাস কাউন্টারে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বাড়তি ভাড়া নেওয়ার সুযোগ নেই। যারা নিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হয়েছে।

ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক ফয়েজ উল্যাহ প্রথম আলোকে বলেন, বাড়তি ভাড়ার বিষয়ে কোনো ভোক্তা এখনো অভিযোগ দেননি। তবে তাঁরা তদারক করছেন।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন