default-image

দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার চার মাস পূর্ণ হচ্ছে আজ। প্রথম দিকে সংক্রমণ বিস্তারের গতি ধীর থাকলেও যত দিন যাচ্ছে, তা তত তীব্র হচ্ছে। প্রথম তিন মাসের তুলনায় চতুর্থ মাসে সংক্রমণ ও মৃত্যু দুটোই অনেক বেড়েছে। মোট রোগীর ৫৯ শতাংশের বেশি শনাক্ত হয়েছে চতুর্থ মাসে। আর মোট মৃত্যুর প্রায় ৫৭ শতাংশ ছিল এই এক মাসে।

মহামারির জরুরি পরিস্থিতির বিবেচনায় চার মাস অনেক দীর্ঘ সময়। এই চার মাসে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের কাজগুলো আরও জোরদার হওয়া দরকার ছিল। জোরদার না হয়ে কিছু ক্ষেত্রে দুর্বল হয়েছে। রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এপ্রিল পর্যন্ত কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং (রোগীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ) মোটামুটি ভালোই করেছিল। কিন্তু মে থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি প্রায় বন্ধ আছে।

নমুনা পরীক্ষার কাজে একটি-দুটি করে ল্যাবরেটরি বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি নমুনা সংগ্রহও বাড়ছিল। কিন্তু চার মাসের শেষে এসে দেখা যাচ্ছে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা দুই কমেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক দিন ধরে নমুনা পরীক্ষা কমার পাশাপাশি দেশে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা কমতির দিকে। এই পরিস্থিতিতে শিগগির দেশে সংক্রমণ কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। আক্রান্তের শীর্ষে থাকা দেশগুলোর অভিজ্ঞতা, দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট ও সংক্রমণচিত্র থেকে তাঁরা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আগামী দিনগুলোতে সংক্রমণ আরও বাড়বে। বিশেষ করে পবিত্র কোরবানির ঈদের পর সংক্রমণে বড় লাফ দেখা যেতে পারে।

গত বছরের শেষ দিকে চীনের উহানে প্রথম করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ে। ক্রমে সেটা মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। চীন দুই মাসের মধ্যে তাদের দেশে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। ইউরোপের অনেক দেশেও তিন থেকে চার মাসের মধ্যে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এনেছে। সে তুলনায় এশিয়া ও আমেরিকা মহাদেশের বেশির ভাগ দেশে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি বেশি দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।

দেশে সংক্রমণ কি কমছে?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঠিক করা কিছু নির্দেশক থেকে বোঝা যায় একটি দেশে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এসেছে কি না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এসব নির্দেশকের বিপরীতে যতটুকু তথ্য আছে, তাতে এখনো সংক্রমণ কমার দিকে যাওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

সংক্রমণ কমছে কি না, তা বোঝার সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে আরটির মান কত? একজন করোনা রোগীর মাধ্যমে কতজন সংক্রমিত হন, সেটাই সংক্রমণ হার বা ইফেকটিভ রিপ্রোডাকশন রেট (আরটি)। আরটি ১-এর বেশি থাকার অর্থ সংক্রমণ পরিস্থিতি বিপজ্জনক পর্যায়ে। এটি অন্তত দুই সপ্তাহ একের নিচে থাকলে বলা যায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আছে এবং তা কমতির দিকে।

বাংলাদেশে সরকারিভাবে এ-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে বাংলাদেশ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে যে পরিস্থিতিতে প্রতিবেদন দেয়, তাতে গ্রোথ ফ্যাক্টর (প্রতিদিন আগের দিনের তুলনায় সংক্রমণ বৃদ্ধি) দিয়ে থাকে। গ্রোথ ফ্যাক্টর টানা বেশ কিছু দিন একের নিচে থাকলে বোঝা যাবে সংক্রমণ কমতির দিকে। কিন্তু গত এক সপ্তাহে চার দিনই বাংলাদেশে গ্রোথ ফ্যাক্টর একের ওপরে ছিল।

এ ছাড়া রোগী শনাক্তের হার ও মৃত্যু এবং উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু কমে এলে বোঝা যায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসছে। দেশে পাঁচ দিন ধরে পরীক্ষা কমে গেছে। ফলে রোগীর সংখ্যা কমে গেছে। কিন্তু রোগী শনাক্তের হার কমেনি। গতকালও পরীক্ষার তুলনায় শনাক্তের হার ছিল ২৩ শতাংশ, যা গড় হারের চেয়ে প্রায় ৪ শতাংশ বেশি। মৃত্যুও কমেনি। সরকারিভাবে সম্প্রতি যে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে সেপ্টেম্বর নাগাদ সংক্রমণ কমে আসতে পারে।

আইইডিসিআরের পরামর্শক মুশতাক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, কয়েক দিন ধরে পরীক্ষা কম হচ্ছে বলে রোগীর সংখ্যা কম হচ্ছে। কিন্তু শনাক্তের হার কমেনি। অর্থাৎ সংক্রমণ কমেনি। শিগগির সংক্রমণ কমবে—তথ্য-উপাত্ত এমনটা বলছে না। বরং বাস্তবতার নিরিখে বলা যায়, এটি আরও বাড়ার আশঙ্কা আছে। এলাকাভিত্তিক লকডাউন (অবরুদ্ধ) কার্যকর করার ক্ষেত্রে গতি নেই। সামনে পবিত্র কোরবানির ঈদ। এ সময় হাট বসবে, হাটে এবং শহর থেকে গ্রামে মানুষের যাতায়াত বাড়বে। এসব ঠেকানো না গেলে সংক্রমণ অনেক বেড়ে যাবে।

চতুর্থ মাসের পরিস্থিতি

৮ মার্চ দেশে প্রথম কোভিড-১৯ শনাক্তের কথা জানানো হয়। গতকাল মোট আক্রান্তের সংখ্যায় ফ্রান্সকে পেছনে ফেলে বিশ্বে ১৭তম অবস্থানে আসে বাংলাদেশ।

সংক্রমণ ঠেকাতে ২৬ মার্চ থেকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়। সারা দেশে কার্যত লকডাউন (অবরুদ্ধ) পরিস্থিতি তৈরি করা হয়। তবে সেটা ছিল ঢিলেঢালা। ২৬ এপ্রিল থেকে পোশাক কারখানা এবং ইফতারি বিক্রির দোকান খুলে দেওয়ার দুই সপ্তাহ পর থেকে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হতে শুরু করে। এরপর ঈদকে কেন্দ্র করে মে মাসের মাঝামাঝি থেকে দোকানপাট খুলতে শুরু করে। আর ৩১ মে থেকে সরকারি ছুটি ও লকডাউন পরিস্থিতি পুরোপুরি তুলে দেওয়া হয়। যার ফল দেখা যায় সংক্রমণ রেখায়। ৯ জুন থেকে নতুন রোগী শনাক্ত ৩ হাজারের ওপরে চলে যায়।

গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত দেশে মোট আক্রান্ত হয়েছেন ১ লাখ ৬৮ হাজার ৬৪৫ জন। এর মধ্যে মারা গেছেন ২ হাজার ১৫১ জন। আর সুস্থ হয়েছেন ৭৮ হাজার ১০২ জন। এর ঠিক এক মাস আগে ৮ জুন পর্যন্ত সংক্রমণের প্রথম তিন মাসে দেশে মোট আক্রান্ত ছিলেন ৬৮ হাজার ৫০৪ জন। মৃত্যু হয়েছিল ৯৩০ জনের। অর্থাৎ ৯ জুন থেকে ৭ জুলাই—এই এক মাসেই শনাক্ত হয়েছেন ১ লাখের বেশি মানুষ। আর মারা গেছেন ১ হাজার ২২১ জন। এই মাসে সুস্থ হওয়ার সংখ্যাও অনেক বেড়েছে। এই এক মাসে সুস্থ হয়েছেন ৬৩ হাজার ৫৪২ জন।

গতকাল নিয়মিত বুলেটিনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক নাসিমা সুলতানা জানান, গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় দেশে করোনায় ৫৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছেন ৩ হাজার ২৭ জন।

অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা

গতকাল পর্যন্ত বিশ্বে সংক্রমণের শীর্ষ দশে আছে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, ভারত, রাশিয়া, পেরু, স্পেন, চিলি, যুক্তরাজ্য, মেক্সিকো ও ইরান। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, রাশিয়া, স্পেন ও যুক্তরাজ্যে চলছে সংক্রমণের ষষ্ঠ মাস। ভারত, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে ষষ্ঠ মাসেও সংক্রমণ বাড়ছে। যুক্তরাজ্যে চতুর্থ মাসের শেষের দিকে আর স্পেনে তৃতীয় মাসের শেষ দিক থেকে সংক্রমণ কমে আসে।

শীর্ষ দশে থাকা ব্রাজিল, পেরু, ইরান, মেক্সিকো ও চিলিতে চলছে সংক্রমণের পঞ্চম মাস। এই দেশগুলোতে সংক্রমণ এখনো বাড়ছে।

আক্রান্ত বেশি ইউরোপের এমন দেশগুলো যেমন স্পেন, ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্যে তিন থেকে চার মাসের মধ্যে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। ইউরোপে করোনার প্রকোপ চলে যাওয়ার পর তা তীব্র আকার ধারণ করছে দক্ষিণ এশিয়ায়। এই অঞ্চলে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে চতুর্থ মাসে আক্রান্ত হয় ১ লাখ ৪৯ হাজার। পঞ্চম মাসে আক্রান্ত হয় ৩ লাখ ৯৩ হাজার। আর ষষ্ঠ মাসের প্রথম ছয় দিনে আক্রান্ত হয়েছেন ১ লাখ ৩০ হাজার হাজার মানুষ। বাংলাদেশের সংক্রমণও অনেকটা সেদিকেই যাচ্ছে।

সন্দেহভাজন রোগী চিহ্নিত করা, নমুনা পরীক্ষা, কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং, আইসোলেশন, কোয়ারেন্টাইন—সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের এসব মৌলিক কাজ চার মাসে গতি পায়নি। বরং তথ্য-উপাত্ত না থাকায় একধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। সামনের দিনগুলোর ছবি মানুষের কাছে পরিষ্কার নয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, মে মাসের শেষ দিক থেকে এখন পর্যন্ত দেশে একই মাত্রায় সংক্রমণ শনাক্ত হচ্ছে। এখনো কমার লক্ষণ নেই। সংক্রমণ এমনি এমনি কমবে না। তাঁর মতে, দেশের প্রেক্ষাপটে লকডাউন কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে প্রমাণিত হয়নি। এখন লকডাউন না করে এলাকাভিত্তিক পরীক্ষা, আইসোলেশন (বিচ্ছিন্নকরণ) ও কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং জোরদার করা দরকার। একটি এলাকায় একই সময়ে এটা করতে হবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন