বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বাস্তব জীবনেও নারীকে এমন অপবাদ শুনতে হয়। কিংবা নারী নিজের মনের অজান্তেই নিজেকে অপরাধী ভাবতে শুরু করেন। ঠিক যেমনটা ঘটেছে তাসনিম কবিরের ক্ষেত্রে।

স্থপতি তাসনিম সৃষ্টি আর্কিটেকচার অ্যান্ড কনসালট্যান্সি ফার্মের প্রতিষ্ঠাতা ও স্বত্বাধিকারী। তাঁর স্বামী হোটেল ট্রপিক্যাল ডেইজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি তাসনিমের ব্যবসায়িক অংশীদারও। এই দম্পতির ২২ মাস বয়সী এক ছেলেসন্তান আছে। তার নাম তাজওয়ার আরিজ আহমেদ।

তাসনিম ৮ নভেম্বর ফেসবুকে তাঁর সন্তানকে নিয়ে নিজের আবেগ-অনুভূতি প্রকাশ করে একটি পোস্ট দেন। পোস্টটি ভাইরাল হয়। পোস্টটির পক্ষে-বিপক্ষে ফেসবুকে আলোচনা চলছে। ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত পোস্টটিতে ২৯ হাজার মানুষ বিভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। সাড়ে ৩ হাজারের বেশিবার পোস্টটি শেয়ার হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমেও পোস্টটি প্রকাশ করা হয়েছে। এই পোস্টের সুবাদে তাসনিম ফেসবুকে এখন আলোচিত এক মায়ের নাম।

পোস্টের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে তাসনিম জানান, ঘটনার দিন তাঁর ও তাঁর স্বামীর গুরুত্বপূর্ণ মিটিং ছিল। তাই তাঁরা দুজনই সকাল সকাল বাসা থেকে বের হয়ে যান। মাকে দেখতে না পেয়ে তাজওয়ার কান্না শুরু করে। তার কান্না থামানোর চেষ্টা করছিলেন তাসনিমের মা। তিনি তাঁর নাতিকে বলেছিলেন, তার মা ওয়াশ রুমে আছেন। তখন ছোট্ট তাজওয়ার ওয়াশ রুমের সামনে গিয়ে মায়ের একটি ওড়না জড়িয়ে অপেক্ষা করতে করতে সেখানেই পাপোশের ওপর ঘুমিয়ে পড়ে। এই দৃশ্য ভিডিও কলে মেয়েকে দেখান তাঁর মা। তারপর তাসনিম নিজেকে ‘অপরাধী মা’ ভাবতে থাকেন। ঘুমিয়ে থাকা ছেলের ছবি দিয়ে তিনি ‘একজন অপরাধী মা বলছি’ শিরোনামে একটি লেখা ফেসবুকে পোস্ট করেন। তাঁর এই লেখা নিয়েই ফেসবুকে শুরু হয় তর্ক-বিতর্ক।

তাসনিম বলেন, ‘আমি বাচ্চাকে বাসায় রেখে অফিসে গিয়েছি বলে একজন আমাকে ফেসবুকে ডাইনি মা বলে মন্তব্য করেছেন। অনেকেই বলেছেন, টাকাটাই জীবনের সবকিছু না। টাকার জন্য চাকরি করতে গিয়ে বাচ্চাকে এভাবে কষ্ট দেওয়া ঠিক না। তবে অনেকে আবার সংসার, বাচ্চা, নিজের ক্যারিয়ার—সব সামলে চলার জন্য বিভিন্ন ইতিবাচক পরামর্শও দিয়েছেন।’

তাসনিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘কাজ করা নিয়ে আমার মনে কোনো দ্বিধা নেই। সন্তান গর্ভে থাকাকালে কাজ করে গেছি। সন্তান জন্মের পর থেকে শুরু করে তার বয়স আট মাস হওয়া পর্যন্ত তাকে সার্বক্ষণিক নিজেই লালনপালন করেছি। এখন আবার কাজ শুরু করেছি। ঘটনার দিন ভিডিও কলে ছেলের ওই অবস্থায় দেখার পরও কাজের চাপের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে তার কাছে ছুটে যেতে পারিনি। সে সময় আমার মনের ভেতরের অবস্থাটাকে প্রকাশ করতে গিয়ে আমি নিজেকে অপরাধী মা বলেছি।’

তাসনিম বলেন, ‘ভিডিও কলে আম্মু আমাকে বকা দিচ্ছিলেন যে আমি কেন ছেলেকে এভাবে কষ্ট দিচ্ছি। এ সময় আমি নিশ্চুপ ছিলাম। আমাকে এমন নিশ্চুপ থাকতে হয়। মাঝেমধ্যে চিন্তা করি, সব কাজ বাদ দিয়ে ছেলেকে নিয়েই থাকি। কিন্তু এই জীবনে আমারও ছোট ছোট কিছু স্বপ্ন আছে। সেগুলো বাস্তবায়নের ইচ্ছে আছে। তাই আমি আমার ফেসবুক পোস্টে মাতৃত্ব ও কর্মজীবনের মধ্যকার ভারসাম্যের কথাও বলেছি।’

তাসনিম একা নন, তাঁর মতো অনেক কর্মজীবী মাকেই নিজেদের শিশুসন্তান ও চাকরি দুটো একসঙ্গে ঠিক রাখতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়। তাসনিম তাঁর কাজ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে মা ও স্বামীর সহায়তা পাচ্ছেন। নিজের প্রতিষ্ঠান বলে ছেলেকে অফিসে নিয়েও যেতে পারেন। তবে সব কর্মজীবীর ক্ষেত্রে এমনটা ঘটে না।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু প্রথম আলোকে বলেন, দেশে নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অবদান বাড়ছে। কিন্তু মনমানসিকতার জায়গায় এখনো তেমন বদল আসেনি। কর্মজীবী নারীদের অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, সন্তান জন্মের পর তাঁদের চাকরিটাই ছেড়ে দিতে হচ্ছে। কিন্তু একজন পুরুষের ক্ষেত্রে এমনটা ঘটে বলে শোনা যায় না। আবার অনেক নারীর ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, সন্তান ঘরে রেখে চাকরি করতে গিয়ে তাঁরা নিজ থেকেই নিজেদের অপরাধী ভাবছেন। সন্তান দেখভালের জন্য তাঁদের চাকরি ছেড়ে দিতে বলেন কেউ কেউ। পুরুষদের ক্ষেত্রে তো এমনটা না।

মালেকা বানু বলেন, রাষ্ট্র ও পরিবার দায়িত্ব পালন করছে না বলেই কর্মজীবী নারীর সংখ্যা কমছে। মা যাতে বাইরে কাজ করতে পারেন, তার দায়িত্ব পরিবারের পাশাপাশি রাষ্ট্রকেও নিতে হবে।

৮ নভেম্বর প্রথম আলোয় ‘নারীর হার বাড়ছে না সরকারি চাকরিতে’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি চাকরিতে নারীর হার পাঁচ বছর ধরে বাড়ছে না। থেমে আছে প্রায় একই জায়গায়।

প্রতিবেদনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সরকারি চাকরিজীবীদের তথ্যসংক্রান্ত ‘স্ট্যাটিসটিকস অব সিভিল অফিসার্স অ্যান্ড স্টাফস ২০২০’ শীর্ষক সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়, ২০১৬ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দেশে সরকারি নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীর হার ২৭ থেকে ২৮ শতাংশের মধ্যে আটকে আছে। সরকারের ৭৭ জন সচিবের মধ্যে নারী মাত্র ১১ জন। দেশে মোট সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন ১৫ লাখের কিছু বেশি। এর মধ্যে নারী ৪ লাখ ১৪ হাজারের বেশি।

সরকারি কর্মজীবী নারীরা বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি পান ছয় মাস। সচিবালয়সহ বিভিন্ন সরকারি অফিসে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের সুবিধা আছে। এসব সুবিধা বেসরকারি খাতে কম। ফলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নারীদের চাকরিতে টিকে থাকাটা তুলনামূলক কঠিন হয়ে যায়।

জাতিসংঘের নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডও) বাস্তবায়নে রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা আছে। ১৯৭৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ সিডও সনদ গ্রহণ করে। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সরকার সনদটি অনুমোদন করে। সনদে নারীর রাষ্ট্রীয় ও পারিবারিক জীবনের সব ধরনের বৈষম্য দূর করার কথা বলা হয়েছে।

সনদের চার অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, মাতৃত্ব রক্ষায় সনদে উল্লেখ করা ব্যবস্থাসহ কোনো বিশেষ ব্যবস্থা নিলে তা বৈষম্যমূলক বলে বিবেচিত হবে না। পাঁচ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, পুরুষ ও নারীর চিরাচরিত ভূমিকার ভিত্তিতে যেসব কুসংস্কার, প্রথা ও অভ্যাস গড়ে উঠেছে, তা পরিবর্তন করতে হবে। সনদে মাতৃত্বকে একটি সামাজিক কাজ হিসেবে যথাযথভাবে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। সব ক্ষেত্রে শিশুদের স্বার্থকে মূল বিবেচ্য বিষয় ধরে সন্তান লালনপালন ও উন্নয়নে পুরুষ-নারীর অভিন্ন দায়িত্ববোধের স্বীকৃতির বিষয়টি পারিবারিক শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। ১১ অনুচ্ছেদে সন্তান জন্মদান প্রক্রিয়া নিরাপদ রাখা ও কাজের পরিবেশে নিরাপত্তার অধিকার বিষয়ে বলা হয়েছে। বিয়ে বা মাতৃত্বের কারণে নারীর প্রতি বৈষম্য রোধে গর্ভধারণ বা মাতৃত্বকালীন ছুটির কারণে চাকরি থেকে নারীকে বরখাস্ত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সনদে শিশু পরিচর্যা সুবিধা নেটওয়ার্ক তৈরি ও উন্নয়নে মা–বাবার পারিবারিক দায়িত্বের পাশাপাশি নাগরিক জীবনে অংশগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়ক সামাজিক সেবার বিষয়টি উৎসাহিত করা হয়েছে।

সনদের কাগজে-কলমে সন্তান লালনপালনের অনেক বিষয় বলা থাকলেও তা সেভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না বলে বলছেন সংশ্লিষ্ট নারী ও মানবাধিকারকর্মীরা। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ৫২টি সূচক দিয়ে নারী-পুরুষের তুলনামূলক অবস্থান তুলে ধরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পুরুষদের তুলনায় সাড়ে তিন গুণ বেশি মজুরিবিহীন কাজ করেন দেশের নারীরা। একজন নারী এক সপ্তাহে গড়ে ২৪ ঘণ্টা গৃহস্থালির কাজ করেন। কিন্তু কোনো মজুরি পান না। সেই হিসাবে দিনে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা মজুরিবিহীন কাজ করেন নারী। এসব কাজের মধ্যে আছে রান্নাবান্না, কাপড় ধোয়া, বাজার-সদাই করা, বাচ্চাদের আদর-যত্ন, স্কুলে আনা-নেওয়া ইত্যাদি। অন্যদিকে একজন পুরুষ সপ্তাহে এমন কাজ করেন মাত্র সাত ঘণ্টা। দিনে করেন গড়ে এক ঘণ্টা।

গৃহস্থালির কাজ ও সন্তান লালনপালনে বেশি সময় দেওয়ার কারণে অনেক নারী চাকরি করতে পারেন না বলে জানা যায়। তবে এসব ক্ষেত্রে পুরুষের তেমন কোনো সমস্যা হয় না বলে জানান নারী অধিকারকর্মীরা।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘নারীর ক্ষমতায়নে তাঁদের কাজের কোনো বিকল্প নেই। সন্তানকে ঘরে রেখে বাইরে চাকরি করার জন্য কোনো পুরুষ কিন্তু কখনো নিজেকে অপরাধী ভাবেন না। বিভিন্ন গবেষণায় এসেছে, কর্মজীবী মায়ের সন্তানেরা লেখাপড়ায় ভালো হয়। তারা আত্মবিশ্বাসী হয়। কারণ, তারা ছোটবেলা থেকেই জানে, তাদের নিজেদের মতো করে বড় হতে হবে।

গভ. কলেজ অব হিউম্যান অ্যাপ্লাইড সায়েন্সের অধ্যাপক ইসমাত রুমিনা প্রথম আলোকে বলেন, সন্তান লালনপালনের জন্য চাকরি ছেড়ে দিলে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন হবে না। তাই নারীর ক্ষমতায়নের জন্য পরিবার–পরিজন, রাষ্ট্র, চাকরি দাতাসহ সবার সহযোগিতা দরকার।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন