কুমিল্লা ও নোয়াখালী অঞ্চলের চার জেলায় মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিকে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। চার জেলার ছয় উপজেলার আটটি ইউনিয়নের ১৪টি গ্রামে আর্সেনিকোসিস রোগীর সংখ্যা ৫৬৩। এ ছাড়া গত আট বছরে ওই রোগে তিনজন মারা গেছেন। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথের বার্ষিক প্রতিবেদনে ওই তথ্য পাওয়া গেছে।
সংস্থাটির কুমিল্লা অঞ্চলের ব্যবস্থাপক শিশির কুমার রায় জানান, কুমিল্লার লাকসাম ও মনোহরগঞ্জ, চাঁদপুরের শাহরাস্তি ও হাজীগঞ্জ, নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী ও লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলায় মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিকে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি। ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত প্রথম ধাপে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে ও মিজরিওরের সহযোগিতায় ওইসব উপজেলায় আর্সেনিকোসিস রোগীদের নিয়ে কাজ শুরু হয়। যেসব এলাকায় আর্সেনিকোসিস রোগী খুব বেশি, দ্বিতীয় পর্যায়ে সেসব এলাকায় ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় কাজ হয়। গত বছর থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিকিৎসা শিবির করে রোগীদের ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। মনোহরগঞ্জের বাংলাইশ ও বাদুয়ারা গ্রামে এবং লাকসামের কান্দিরপাড় ও চরবাড়িয়া গ্রামে চিকিৎসা শিবিরের মাধ্যমে ওষুধ দিতে গিয়ে দেখা গেছে, ওই এলাকায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে রোগী বেড়েছে। বর্তমানে ৫৬৩ জন রোগীর মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশের অবস্থা গুরুতর।
গত আট বছরে আর্সেনিকের প্রভাবে মনোহরগঞ্জের বাংলাইশ গ্রামের মো. আবুল কাসেম, চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার বালিয়া গ্রামের আবদুল মান্নান ও লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার দেবীনগর গ্রামের শিশির কান্তি দাস মারা যান। মনোহরগঞ্জ উপজেলার বাংলাইশ গ্রামের কবির হোসেন বলেন, ‘আর্সেনিকের কারণে পুরো শরীরে সাদা-কালো দাগ পড়ে গেছে। পা ও হাতের তালুতে গুটি গুটি দাগ পড়েছে। তিন বছর ধরে ওষুধ খাচ্ছি, কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। একই গ্রামের হোসনে আরা বেগম বলেন, ‘পিঠের মধ্যে দাগ আছে। শরীর জ্বালাপোড়া করে। এনজিও থেকে দেওয়া ওষুধ ও মলম ব্যবহার করছি।’
লাকসাম উপজেলার ইউরাইন গ্রামের পল্লিচিকিৎসক আবুল হোসেন বলেন, ‘আমাদের এলাকা আর্সেনিককবলিত। অগভীর নলকূপের পানি খাওয়ায় এ রোগে আমিও আক্রান্ত হয়েছি। গত ১১ জানুয়ারি আমরা কিছু ওষুধ পেয়েছি।’ একই গ্রামের সুফিয়া বেগম বলেন, ‘চুলকানি ও জ্বালাপোড়ার কারণে রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারছি না।’
ওই সংস্থা সূত্রে জানা যায়, কুমিল্লা ও নোয়াখালী অঞ্চলের চার জেলার ছয় উপজেলার আটটি ইউনিয়নের ১৪টি গ্রামে শনাক্ত করা আর্সেনিকোসিস রোগীর সংখ্যা ৫৬৩। এর মধ্যে লাকসামের কান্দিরপাড় ইউনিয়নের ইরুয়াইন গ্রামে ৫৯ জন, ফতেপুর গ্রামে ৩১, আজগরা ইউনিয়নের চরবাড়িয়া গ্রামে ৪৫, রাজাপুর গ্রামে ৩০, মনোহরগঞ্জের ঝলম উত্তর ইউনিয়নের বাংলাইশ গ্রামে ৬৯, হাসনাবাদ ইউনিয়নের বাদুয়ারা গ্রামে ১১৫, সোনাইমুড়ীর দেওটি ইউনিয়নের আমিরাবাদ গ্রামে ২৬, শাহরাস্তির টামটা ইউনিয়নের আজাগড়া গ্রামে ৩৩, কুলশী গ্রামে ২৪, হাজীগঞ্জের পূর্ব হাটিলা ইউনিয়নের বলিয়া গ্রামে ২৯, বেলঘর গ্রামে ৩১, লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার উত্তর জয়পুর ইউনিয়নের দেবীনগর গ্রামে ২৬, প্রাণভগবতীপুর গ্রামে ২৩ ও টেকরাজ বাহাদুর গ্রামে ২২ জন রোগী রয়েছেন। ২০১২ সালের আগে এসব এলাকায় আর্সেনিকে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৪১৪ জন।
কুমিল্লার সিভিল সার্জন মুজিবুর রহমান বলেন, ‘কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ ও লাকসাম উপজেলায় আর্সেনিকে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অন্যান্য উপজেলার চেয়ে বেশি। আমরা ওইসব এলাকায় সচেতনতা বৃদ্ধি করেছি। মানুষ এখন আর্সেনিকের ব্যাপারে সচেতন।’
এনজিও ফোরাম ফর হেলথ কুমিল্লার কর্মসূচি সমন্বয়ক আবদুল কাইয়ুম বলেন, ‘কুমিল্লা ও নোয়াখালী অঞ্চলের আর্সেনিকে আক্রান্ত রোগীদের জন্য আমরা বিভিন্ন ধরনের ওষুধ ও মলম দেওয়া অব্যাহত রেখেছি। এর মধ্যে মনোহরগঞ্জ বাংলাইশ গ্রামে ২০০৮ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত সাতটি গভীর নলকূপ বসানো হয়েছে। এ ছাড়া আর্সেনিক রোগীদের জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে।’

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন