চালের মজুত কমছে আমদানিই ভরসা

বিজ্ঞাপন
default-image

সরকারি চালের মজুত আরও কমেছে। চাল-সংকটের কারণে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিও থমকে গেছে। কিন্তু চালের সংগ্রহ বাড়ছে না।

মজুত বাড়াতে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ধান-চাল সংগ্রহেও কোনো আশার আলো দেখতে পাচ্ছে না খাদ্য মন্ত্রণালয়। ৮ লাখ টন সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে শুরু করে গত ২১ দিনে মাত্র ২৭০ টন চাল সংগ্রহ করতে পেরেছে খাদ্য অধিদপ্তর। এই পরিস্থিতিতে সরকারের ভরসা এখন চাল আমদানি।

মজুত নিয়ে সরকার সংকটে থাকলেও চালের দাম নিয়ে কষ্টে আছে সাধারণ মানুষ। একদিকে সরকারি গুদামে চালের মজুত

কমছে, অন্যদিকে বাজারে চালের দামও হু হু করে বাড়ছে। মূলত চালের দাম বাড়ার কারণেই ব্যবসায়ীরা কম দামে সরকারকে চাল দিতে আগ্রহী হচ্ছেন না।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে, গতকাল বুধবার এক কেজি মোটা চালের দাম ছিল ৪৫ থেকে ৪৮ টাকা। প্রতি সপ্তাহে চালের 

দাম এখন অন্তত ১ টাকা করে বাড়ছে। মাসের শুরুতে মোটা চালের দর ছিল ৪০ থেকে ৪২ টাকা। অপর সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবেও চালের দরের একই চিত্র পাওয়া গেছে।

দেশের ভেতরে কম মজুত ও বেশি দামের প্রেক্ষাপটে খাদ্য মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে চাল কিনতে চেষ্টা করছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে ১ লাখ টন চাল আমদানির জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে। পর্যায়ক্রমে আরও ৭ লাখ টন চাল আমদানি করা হবে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড থেকে চাল আমদানির চেষ্টাও শুরু করেছে তারা। খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামের নেতৃত্বে এ জন্য চার সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল বর্তমানে ভিয়েতনামে অবস্থান করছে।

ভিয়েতনামে যাওয়ার আগে ২২ মে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামের সঙ্গে প্রথম আলোর কথা হয়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভিয়েতনাম থেকে আমরা চাল আমদানির ব্যাপারে আলোচনা করতে যাচ্ছি। দেশে ফিরে আমরা সবাইকে জানাব।’ আজ বৃহস্পতিবার তাঁর দেশে ফেরার কথা রয়েছে।

গত মঙ্গলবার ভিয়েতনামের খাদ্যমন্ত্রী ট্রান টুয়ান আনের সঙ্গে বছরে ১০ লাখ টন চাল আমদানির ব্যাপারে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে। ২০২২ সাল পর্যন্ত এই সমঝোতা বহাল থাকবে। ভিয়েতনামের দৈনিক ভিয়েতনাম প্লাস গতকাল এ নিয়ে এক প্রতিবেদনে বলছে, বাংলাদেশ জরুরি ভিত্তিতে আড়াই থেকে ৩ লাখ টন চাল আমদানি করতে চেয়েছে। আর এ বছরের মধ্যে মোট ৫ লাখ টন চাল আমদানি করতে চায় বাংলাদেশ।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. কায়কোবাদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, প্রাথমিক আলোচনা ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর তারা চালের নমুনা পাঠালে ও পছন্দ হলে চাল আমদানি শুরু হবে।

এদিকে খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে গতকাল দৈনিক খাদ্যশস্য পরিস্থিতিবিষয়ক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি গুদামে চালের মজুত ২ লাখ ৩৫ হাজার টনে নেমে এসেছে। মাসের শুরুতে যা ৩ লাখ টনের বেশি ছিল। আর গত বছর একই সময়ে চালের মজুত ছিল প্রায় ৬ লাখ টন।

চলতি বছর প্রতি কেজি চাল ৩৪ টাকা করে সংগ্রহ করার ঘোষণা ছিল সরকারের। কিন্তু চালকলের মালিকেরা তাতে সাড়া দিচ্ছেন না। ইতিমধ্যে চালকলের মালিকদের জাতীয় সংগঠন বাংলাদেশ অটো, মেজর, হাসকিং ও মিল মালিক সমিতি খাদ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে বলেছে, তাঁরা প্রতি কেজি চালে আরও ৪ টাকা বেশি চান।

খাদ্যমন্ত্রী ভিয়েতনাম যাওয়ার আগে দেশের উত্তরাঞ্চলের চারটি জেলায় গিয়ে মিলমালিকদের সঙ্গে আলোচনা করেন। মন্ত্রীর উপস্থিতিতে কিছু মিলমালিক চাল দেওয়ার চুক্তিও করেন। কিন্তু তা সরকারের মোট সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ১৫ শতাংশ। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রা ৮ লাখ টনের মধ্যে এ পর্যন্ত দেড় লাখ টন চাল দেওয়ার জন্য মিলমালিকেরা চুক্তি করেছেন।

বাংলাদেশ অটো, মেজর, হাসকিং ও মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলী এ নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাজারে এক কেজি ধান কিনে তা মিলে ভাঙিয়ে চালে পরিণত করতে ৩৭ থেকে ৩৮ টাকা খরচ পড়ে। তাহলে আমরা কীভাবে সরকারি গুদামে ৩৪ টাকা কেজিতে চাল দেব। আমাদের উৎপাদন খরচও যদি সরকার দেয়, তাহলেও আমরা গুদামে চাল দিতে রাজি আছি।’

চালকলের মালিকেরা বলছেন, মূলত হাওরে ফসলহানি ও সারা দেশে বোরো ধানের ব্লাস্ট রোগের কারণে এ বছর বোরোতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪০ থেকে ৫০ লাখ টন চাল কম উৎপাদিত হবে। যদিও সরকারি হিসাবে এ বছর ১২ লাখ টন চালের ক্ষতির হিসাব দেওয়া হচ্ছে। উৎপাদন কম হওয়ায় বাজারে ধানের জোগান কমছে। এর কারণেই ধান ও চালের দাম বেশি বলে মনে করছেন চালকলের মালিকেরা।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন