default-image

চা রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। বর্তমান জনপ্রিয়তার পশ্চাদভূমিতে দীর্ঘ বিবর্তনের ইতিহাস লুকিয়ে আছে। চীনের অনুকরণেই ভারতবর্ষে চা চাষ শুরু করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। তাই পরীক্ষামূলকভাবে চা-বীজ, চারা ও যন্ত্রপাতির পাশাপাশি চীন থেকে দক্ষ শ্রমিক আনে তারা। বিদেশি শ্রমিকদের সঙ্গে বনাবনি না হওয়ায় অবশেষে শ্রমিক আমদানি বন্ধ করে দেশীয় শ্রমিক দিয়েই চা-বাগানের কার্যক্রম পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয় কোম্পানি।

আপার আসামে পরীক্ষামূলক বাগানে নিয়োগকৃত কর্মচারীবৃন্দ ও তাদের মজুরী কাঠামো (১৮৪০)

পদ

সংখ্যা

মজুরী কাঠামো

সুপারিনটেন্ডেন্ট

৫০০-০-০

ফার্স্ট এসিসট্যান্ট

১০০-০-০

সেকেন্ড এসিসট্যান্ট

৭০-০-০

চাইনিজ ব্ল্যাক টি মেকার

৫৫-১১-৬

সহকারী চাইনিজ ব্ল্যাক টি মেকার

১১-১-৬

চাইনিজ টি বক্স মেকার

৪৫-০-০

চাইনিজ ইন্টারপ্রেটার

৪৫-০-০

চাইনিজ গ্রিন টি মেকার

১৫-৮-৬

চাইনিজ টি বক্স মেকার

৩৩-৪-৬

চাইনিজ লিড ক্যানিসটার মেকার

২২-৩-০

নেটিভ ব্ল্যাক টি মেকার

২৪

৫-০-০

নেটিভ গ্রিন টি মেকার

১২

৫-০-০

নেটিভ কার্পেন্টার

৪-০-০

কুলি সর্দার

১০-০-০

মাহুত

৬-০-০

মাহুত মেইটস

৪-০-০

সইয়ারস

৪-০-০

ডাক রানার্স

৩-৮-০

দফাদার্স

৩-০-০

উৎসঃ নিতিন ভার্মা, ‘কুলিজ অব ক্যাপিটালিজমঃ আসাম টি এন্ড দ্যা মেকিং অব কুলি লেবার’, পৃঃ ২৪-২৫

সুরমা ও বরাক উপত্যকাজুড়ে (বর্তমান সিলেট ও আসাম অঞ্চল) ছিল ভারতবর্ষের চা-বাগানের একটা বড় অংশ। ড. সুকুমার বিশ্বাস রচিত ‘আসামে ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি—প্রসঙ্গ ১৯৪৭-১৯৬১’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে আসামে শ্বেতাঙ্গ চা-করেরা যখন চা-বাগান প্রতিষ্ঠা শুরু করেন, তখন স্থানীয়ভাবে চা-শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছিল না। আসাম সরকারের সহায়তায় তাঁরা ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থান থেকে হাজারো চা-শ্রমিক আনার ব্যবস্থা করেন। বিহার, উড়িষ্যা (ওডিশা), মাদ্রাজ (চেন্নাই), নাগপুর, সাঁওতাল পরগনা, মধ্যপ্রদেশ ও উত্তর প্রদেশ থেকে এসব চা-শ্রমিককে নিয়ে আসা হয়। এ জন্য একটি স্বতন্ত্র বিভাগও চালু হয়। এ সময় আসাম সরকার ‘ইমিগ্রেশন অব লেবার অ্যাক্ট’ কার্যকর করে। চা-বাগানের শ্রমিকদের ডাকা হতো ‘কুলি’ নামে।

default-image

চা-শ্রমিকের ব্যবস্থা হলেও চা-বাগানের বিভিন্ন স্তরে তখনো পরিচালনব্যবস্থায় যোগ্য জনশক্তির অভাব ছিল। ফলে কয়েক হাজার বাঙালি এসব পদে নিয়োগ পান। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বেঙ্গল-আসাম রেলপথ স্থাপিত হলে পূর্ববঙ্গের ঢাকা, ময়মনসিংহ, নোয়াখালী, ত্রিপুরা, রংপুর প্রভৃতি জেলা থেকে লাখ লাখ বাঙালি কৃষিজীবী, যাঁদের অধিকাংশই ছিলেন মুসলমান সম্প্রদায়ভুক্ত, তাঁদের কলোনাইজেশন স্কিমের আওতায় এনে তৎকালীন আসামের বিভিন্ন স্থানে অনাবাদি জঙ্গলাকীর্ণ জমি চাষাবাদের ব্যবস্থা করা হয়।

শুরু থেকেই এই শ্রমজীবী মানুষগুলো চরম অবহেলিত। ১৯০১ সালে প্রকাশিত ‘দ্য ইকোনমিক হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া আন্ডার আরলি ব্রিটিশ রুল’-এ রমেশ দত্ত এই শ্রমজীবী মানুষদের প্রতি ব্যবস্থাপকদের অবহেলার চিত্র উল্লেখ করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘আ স্পেশাল ল, হুইচ ইজ কল্ড দ্য স্লেভ ল বাই দ্য পিপল অব ইন্ডিয়া, স্টিল এক্সিস্টস ফর প্রোভাইডিং লেবারারস ফর দ্য কাল্টিভেশন অব টি ইন আসাম; ইগনোরেনট ম্যান অ্যান্ড উইম্যান আর বাউন্ড ডাউন বাই পেনাল ক্লসেস, আপন দেয়ার সাইনিং আ কন্ট্রাক্ট, টু ওয়ার্ক ইন টি গার্ডেন্স ফর আ নাম্বার অব ইয়ার্স; অ্যান্ড দ্য আটমোস্ট এন্ডিভার্স অব দ্য চিফ কমিশনার অব আসাম ডিউরিং দ্য প্রেজেন্ট ইয়ার (১৯০১) হ্যাভ ফেইল্ড টু সিকিউর ফর দিজ পুওর লেবারার্স এন এডিকিউট পে ডিউরিং দেয়ার এনফোর্সড স্টে ইন দ্য গার্ডেন্স।’

কাজের ধরন অনুযায়ী শ্রমিকদের কাজের হিসাব সংরক্ষণ করা হতো যেখানে, সেটা ‘গার্ডেন বুক: ডেইলি কামজারি বুক’ নামে পরিচিত ছিল। এই বই থেকে তাদের কাজের বিপরীতে মজুরির প্রাপ্যতা হিসাব করা হতো। সরদার এবং মুহুরি মূলত এই হিসাব তদারকির দায়িত্ব পালন করতেন। শ্রমিকেরা সময় সময় তাঁদের বৈষম্যমূলক আচরণ ও প্রতারণার শিকার হতেন।

১৯১৭-১৯২১ সালের মাঝে আসামের চা বাগানগুলোতে সর্বমোট মৃত্যুর রেকর্ড

সাল

সর্বমোট মৃতের পরিমাণ

১৯১৭-১৮

২১,৯৬১

১৯১৮-১৯

৬২,১৭৬

১৯১৯-২০

৪৪,৮৬৬

১৯২০-২১

২৮,৯২৭

উৎস : আসাম লেবার ইনকোয়েরি কমিটি রিপোর্ট, ১৯২১-২২

default-image

চা-বাগানের আশপাশে জঙ্গলাকীর্ণ ভূমিগুলো ছিল প্রকট ম্যালেরিয়া ও কালাজ্বরের উর্বর ক্ষেত্র। শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ কতটা প্রতিকূল ছিল, উপরিউক্ত আসাম লেবার ইনকোয়েরি কমিটির রিপোর্টটি তার অন্যতম দৃষ্টান্ত।

ভারতবর্ষে মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের প্রভাব চা-শ্রমিকদেরও স্পর্শ করেছিল। ২০ মে ১৯২১। ‘মুল্লুকে ফিরে চল’ স্লোগানে সিলেট অঞ্চলের প্রায় ৩০ হাজার চা-শ্রমিক বিক্ষোভ শুরু করেন। উদ্যোগ নেন নিজ নিজ অঞ্চলে ফিরে যাওয়ার। কিন্তু ফিরে যাওয়া অত সহজ ছিল না। চা-শিল্পের মালিকদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে রেল দপ্তর শ্রমিকদের টিকিট দেওয়া বন্ধ করে দেয়, যাতে শ্রমিকেরা ফিরে যেতে না পারেন। বাধ্য হয়ে তাঁরা চাঁদপুরের মেঘনা ঘাটমুখী হাঁটা শুরু করেন। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের ওপর চলে গুলিবর্ষণ। মারা যান শত শত আর আহত হন হাজার হাজার। কিছু পালিয়ে যান। বাকিদের ধরে নিয়ে পুনরায় চা-বাগানের কাজে বাধ্য করা হয়। গঠিত হয় গাদা গাদা কমিশন। কিন্তু তাঁদের জীবনমানে কোনো কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন ঘটেনি। চা-শ্রমিকদের দুঃখগাথা নিয়ে রচিত হয় সাড়া জাগানো উপন্যাস ‘টু লিভস অ্যান্ড আ বাড’ (১৯৩৭)। ইংরেজ সাহেবদের অত্যাচারের পটভূমিকায় লেখা মুলকরাজ আনন্দের এই উপন্যাসে চা-কে অলংকৃত করে বলা হয়েছে ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’। অতঃপর দেশভাগের পালা। কিন্তু নতুন ভারতেও রয়ে গেল সেই চিত্র। ১৯৬১ সালের নিম্নোক্ত চিত্র চা-শ্রমিক খাতে প্রকট মজুরিবৈষম্যের প্রমাণই বহন করে:

default-image

১৯৭০ সালের নির্বাচনে চা-বাগানগুলোতে শতভাগ ভোট পায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও নৌকা প্রতীক। কিন্তু অদ্যাবধি চা জনগোষ্ঠীর ভাগ্যের শিকে ছিঁড়েনি। সাবেক ভারতবর্ষের সর্বত্র আজও ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষের গড়িমসি! চা-শ্রমিকদের নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে গবেষণায় সম্পৃক্ত পরিমল সিং বাড়াইকের জীবনকাব্যে সেটাই নির্মোহভাবে ফুটে উঠেছে—

‘চা-কর দালালদের মিঠা কথা শুনে,
রঙিন স্বপ্নে বিভোর হয়ে, দাদুরা এল আসামের বনে।
ইংরেজরা সব জাতকে এক জাত বানাল
দিনে রাতে কাজ করাল।
বেঁধে চোখে ঠুলি, কৃষক থেকে প্রমোশন দিয়ে নাম রাখল কুলি।

চা-বাগানের লেবার, ফায়দা লোটার স্বার্থে সবাই
করতে লাগল ফেবার।
একাত্তরে স্বার্থ নিয়ে, বাধল জব্বর লড়াই,
সেদিন লেবার থেকে বাঙালি হয়ে
সবাই মিলে পাঞ্জাবিদের খেদায়।

স্বাধীন দেশে চা-শ্রমিক উপাধি
বড়ই চমৎকার
ভোটের সময় কদর বাড়ে, ভোট গেলে কে ভাই কার।
ব্রিটিশ আমলের গোলামির নিশান
সবার ওপরে ঝুলছে
হাল আমলে চা জনগোষ্ঠী নামে
প্রমোশন দিতে দরদিরাত বলছে।’

default-image


ষষ্ঠ পর্ব:
হারিয়ে যাওয়া সেই টি-টোকেন। পড়ুন ২২ নভেম্বর নাগরিক সংবাদে

*হোসাইন মোহাম্মদ জাকি: গবেষক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন