বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো: আপনার কি মনে হয় না যে চিকিৎসকদের দলাদলি না থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা আপনার জন্য অধিকতর সহজ হতো?

মো. শারফুদ্দিন আহমেদ: চিকিৎসকদের মধ্যে দলাদলি না থাকলে অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা আরও বেশি সহজ হতো। দলাদলির কারণে প্রভাবশালীদের চাপে বিভিন্ন সময় নানা ধরনের ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়েছে, বৈষম্য হয়েছে। এতে অনেকের মনে বঞ্চনা বোধ কাজ করে। চিকিৎসায়, শিক্ষাদানে বা গবেষণায় অনেকে নিজের সক্ষমতার পরিচয় রাখার সুযোগ পাননি। নিজে দায়িত্ব নিয়ে বুঝতে পারি, ঠিক জায়গায় ঠিক মানুষটি নেই।

default-image

প্রথম আলো: বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএনপিপন্থী চিকিৎসক বা ড্যাবের সমর্থক চিকিৎসকেরা কোণঠাসা হয়ে আছেন? স্বাচিপের সমর্থক অথচ আপনার পক্ষের নন এমন চিকিৎসক ও শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ে আছেন। এঁদের আপনি কীভাবে সামলাচ্ছেন?

মো. শারফুদ্দিন আহমেদ: একটা কথা বলা ভালো যে আমার মতো এতটা রাজনীতি করা ব্যক্তি এর আগে বিএসএমএমইউর উপাচার্যের পদে বসেননি। যেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ভালো, আমি সেটাকেই গুরুত্ব দিই। আমি মনে করি উপাচার্যের পদ দলাদলির ঊর্ধ্বে।

উপাচার্যের পদে বসে আমি এক চোখা আচরণ করতে পারি না, করা উচিত না। তাই আমি বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের ডাকি, সবাইকেই ডাকি। সবার কথা শুনি, সবার পরামর্শ নিই। আমার আগে যাঁরা উপাচার্য ছিলেন, তাঁরা আমি যে কাজটি করছি, সেটি করার সুযোগ পাননি।

প্রথম আলো: অতিসম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু নিয়োগ হয়েছে। এতে বরিশাল মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করা চিকিৎসকেরা বেশি সুবিধা পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

মো. শারফুদ্দিন আহমেদ: একদম ভুল অভিযোগ। আপনি দেখুন, প্রক্টর ময়মনসিংহ মেডিকেলের ছাত্র। এ রকম আরও উদাহরণ আছে। কিছু ক্ষেত্রে বরিশাল মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করা চিকিৎসকেরা পদ পেয়েছেন। যোগ্য ছিলেন বলেই পদ পেয়েছেন। আমার কারণে নয়।

প্রথম আলো: আচ্ছা বলুন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে পার্থক্য কী? চিকিৎসা, শিক্ষা ও গবেষণা দুটি প্রতিষ্ঠানই করছে। তা হলে কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্থক্য কোথায়?

মো. শারফুদ্দিন আহমেদ: বিএসএমএমইউর সঙ্গে ঢাকা মেডিকেল কলেজের কিছু মৌলিক পার্থক্য আছে। বিএসএমএমইউ একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, নিজে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। এই স্বাধীনতা ঢাকা মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষের নেই। ঢাকা মেডিকেল পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন কোর্স পরিচালনা করতে পারে না, বিএসএমএমইউ পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষকসহ অন্যদের চাকরি বদলিযোগ্য নয়। যে কারণে তাঁরা নিশ্চিন্তে এখানে কাজ করতে পারেন, প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁদের আত্মার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কলেজে এটা কম দেখা যায়।

প্রথম আলো: হঠাৎ বা সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য অনেক উদ্যোগ নেয় বিশ্ববিদ্যালয়। অতিসম্প্রতি বিএসএমএমইউ জরুরি বিভাগ চালু করেছে। কিন্তু পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেই। তা হলে কেন এটা খোলা হলো।

মো. শারফুদ্দিন আহমেদ: কোনো জরুরি বিভাগই পূর্ণাঙ্গ হয় না। আমাদের হয়তো ১০০ শতাংশ পূর্বপ্রস্তুতি ছিল না। কিন্তু জরুরি বিভাগ চালু করার জন্য আমাদের ৮০ শতাংশ প্রস্তুতি ছিল। আমাদের যে ঘাটতি আছে, তা আমরা আস্তে আস্তে পূরণ করব।

১ নভেম্বর আমরা জরুরি বিভাগ চালু করেছি। আমরা আরও প্রস্তুতি নিয়ে আরও পরে জরুরি বিভাগ চালু করতে পারতাম। কিন্তু চালুর পর এ পর্যন্ত যেসব রোগী জরুরি সেবা পেয়েছেন, সেই সেবা তাঁরা পেতেন না।

প্রথম আলো: বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দিতে চান: শিক্ষা, চিকিৎসা না গবেষণা?

মো. শারফুদ্দিন আহমেদ: আমরা গবেষণায় পিছিয়ে ছিলাম। এখন সেটাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। আগে একটা গবেষণার জন্য ৬০ হাজার টাকা অনুদান দেওয়া হতো। এখন অনুদান বাড়িয়ে ৩ লাখ টাকা করা হয়েছে। অন্যদিকে সেরা থিসিসের জন্য ১০-১০ করে ২০ জনকে পুরস্কৃত করা হচ্ছে।

আমাদের চিকিৎসার ব্যাপ্তি দিন দিন বাড়ছে। এখন প্রতিদিন ৮-৯ হাজার মানুষ বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ভিআইপি বা দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা, সচিব, মন্ত্রী বা রাজনৈতিক দলের নেতারা এখানে নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অটোমেশনে জোর দিচ্ছে। যেমন সর্বস্তরের কর্মকর্তা, কর্মচারী, শিক্ষক—সবার হাজিরা ফিঙ্গার প্রিন্টের (আঙুলের ছাপ) মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে। একইভাবে প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করার আগে ফিঙ্গার প্রিন্ট দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কিছু বাধা আসবে জানি। কিন্তু আমরা এটা করব। এটা বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু করা সম্ভব হলে দেশের অন্যান্য মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে করা সহজ হবে।

অন্যদিকে ইনস্টিটিউশনাল প্র্যাকটিসকে (প্রতিষ্ঠানে রোগী দেখা) আমরা আরও গুরুত্ব দেব। এখন এটা বিকেলের দিকে করা হয়, আমরা সময়টা দুপুরের দিকে আনার কথা ভাবছি। আমাদের মূল উদ্দেশ্য বেশি মানুষকে সেবার আওতায় আনার সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া। এসব ছাড়া আমরা এমএসসি নার্সিং কোর্স খুলতে যাচ্ছি।

প্রথম আলো: আপনি দাবি করছেন, আপনি গবেষণায় জোর দিচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে বরাদ্দ কেমন?

মো. শারফুদ্দিন আহমেদ: এক দিনে সব হয় না। আগে গবেষণার জন্য বছরে বরাদ্দ ছিল মাত্র ৪ কোটি টাকা। আমি তা বাড়িয়েছি। বাড়িয়ে গবেষণার জন্য বছরে ১২ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছি।

১৯৯৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয় শুরুর সময় বছরে বরাদ্দ ছিল মাত্র ৪ কোটি টাকা। এখন বরাদ্দ ৪০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে চিকিৎসাসেবার জন্য বরাদ্দ ২২০ কোটি টাকা।

চিকিৎসাসেবা ও গবেষণার বরাদ্দ বাদ দিলে বাকি টাকা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে ব্যয় করা হয়। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে বরাদ্দের একটি বড় ব্যয় হয় নন-রেসিডেন্ট (অনাবাসিক) শিক্ষার্থীদের জন্য, প্রায় ৮৪ কোটি টাকা। বেশ কিছু টাকা বরাদ্দ আছে বৃত্তির জন্য।

আবারও বলছি, আমরা গবেষণায় জোর দিচ্ছি। আমরা গবেষণায় বরাদ্দ ১০০ কোটি টাকায় নিয়ে যাব।

প্রথম আলো: একসঙ্গে অনেককে গবেষণা করতে দেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার বা নীতিমালা কী আছে? বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্লেখযোগ্য গবেষণা কী আছে, যা সাড়া ফেলেছে?

মো. শারফুদ্দিন আহমেদ: টাকা চাইলেই গবেষণার জন্য টাকা দেওয়া হচ্ছে, বিষয়টি এমন নয়। গবেষণা বিষয়ে আমাদের নীতিমালা আছে। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি গবেষণা প্রস্তাব বোর্ডে পর্যালোচনা করা হয়। বোর্ডের অনুমোদন সাপেক্ষে গবেষণা হয়, গবেষণার বরাদ্দ ছাড় করা হয়।

করোনা মহামারিকালেই বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছেন, যা ল্যানসেট-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সাময়িকীতে ছাপা হয়েছে।

প্রথম আলো: বেশ কিছু দিন হয়ে গেছে আপনি দায়িত্ব নিয়েছেন। এই সময়ে উল্লেখযোগ্য কাজ কী হয়েছে?

মো. শারফুদ্দিন আহমেদ: বিশ্ববিদ্যালয়ে সেবা ও একাডেমিক পরিবেশ সুন্দর করার চেষ্টা আমার শুরু থেকেই আছে। আগের চেয়ে প্রতিষ্ঠান পরিচ্ছন্ন দেখায়।

উল্লেখযোগ্য উদ্যোগের মধ্যে আছে বিএসএমএমইউতে জরুরি বিভাগ চালু হয়েছে, গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরতে বা বাড়াতে গবেষণা দিবস উদ্‌যাপন। প্রতি মাসের প্রথম দিন সব বিভাগের প্রধানদের নিয়ে সভা চালু করেছি। এই সভায় প্রতিটি বিভাগের সমস্যা ও করণীয় বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হতে দেখা যাচ্ছে। অনেক দিকনির্দেশনা পাওয়া যাচ্ছে।

প্রথম আলো: আপনার মেয়াদও শেষ হবে, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানকে আরও উন্নত করে রেখে যেতে কী করতে চান?

মো. শারফুদ্দিন আহমেদ: আমি আগেই বলেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ে অটোমেশন জোরদার হবে।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের থাকার বাসা নেই, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের ব্যবস্থা নেই। সরকারের কাছ থেকে পূর্বাচলে ৮ একর জমি নেওয়ার জন্য কাজ শুরু করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বঙ্গবন্ধুর দুটো ভাস্কর্য স্থাপন করব। চেষ্টা করব আগামী প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আগেই তা করতে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে অপারেশন থিয়েটার (ওটি) আছে ৫৬টি। এগুলো এক পালায় চলে। আমরা ৪০টি ওটি দুই পালায় চালানোর উদ্যোগ নিচ্ছি। তা হলে এক দিনে ৮০টি ওটি চালু থাকবে। এর অর্থ বহু মানুষের অস্ত্রোপচার সম্ভব হবে, অপেক্ষমাণ রোগীর তালিকা ছোট হবে।

প্রথম আলো: দেশে আরও কয়েকটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে। সেগুলোর থেকে বিএসএমএমইউর পার্থক্য কী হবে?

মো. শারফুদ্দিন আহমেদ: নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আমার নিজের পর্যবেক্ষণ আগে তুলে ধরতে চাই। আমি মনে করি, বড় মেডিকেল কলেজগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করলে বা উন্নীত করলে ভালো হতো। কাজটি সহজ হতো, ভালো হতো।

নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে বিএসএমএমইউর পার্থক্য তৈরি করবে সময় বা কাল। ওসব বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্পের কাজ সবে শুরু হয়েছে, শেষ হতে ১০ বছর লাগবে। যদিও কেউ কেউ একাডেমিক কাজ শুরু করেছে।

সবশেষে আমি এটা বলতে চাই যে স্বাধীনতার সময় দেশে মানুষ ছিল ৭ কোটি, এখন ১৭ কোটি। কৃষিক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছে। চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য গবেষণায় আমি বিএসএমএমইউকে ওই পর্যায়ে নিয়ে চেতে চাই বা দেখতে চাই।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন