default-image

বেনাপোল বলফিল্ড মাঠে পাশাপাশি সাতটি কফিন। কফিনগুলোতে কাফনের কাপড় পরানো সাতটি ছোট্ট নিথর দেহ। ভেজা চোখে কফিনগুলোকে ঘিরে দাঁড়িয়ে হাজারো শোকার্ত মানুষ। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। প্রকৃতিও যেন যোগ দিয়েছে অশ্রুধারার সঙ্গে।
গতকাল রোববার বেলা দুইটায় বলফিল্ড মাঠে সাত শিশু শিক্ষার্থীর জানাজায় ছিল এমন শোক। গত শনিবার রাতে যশোরের চৌগাছা-মহেশপুর সড়কের ঝাউতলায় শিক্ষাসফরের বাস উল্টে নিহত হয় তারা। জানাজার পর তাদের দাফন করা হয় নিজ নিজ গ্রামে। পরিবার, স্বজন, সহপাঠী, শিক্ষক, প্রতিবেশী—সবাই চোখের পানিতে শেষবিদায় জানায় তাদের।

default-image

বেনাপোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই সাত শিক্ষার্থীর অকালমৃত্যুতে শোকবিহ্বল হয়ে পড়েছে শার্শা উপজেলার পাশাপাশি তিন গ্রাম ছোট আঁচড়া, নামাজ ও গাজীপুর। নিহত সাতজনের মধ্যে পাঁচজনই বেনাপোল পৌরসভাসংলগ্ন গ্রাম ছোট আঁচড়ার, এদের আবার চারজনের বাড়ি এক পাড়ায়। বেশি মাতমও ওই পাড়ায়। ওই চারজন হলো: সৈয়দ আলীর দুই মেয়ে পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী উম্মে সুরাইয়া আফরিন ও তৃতীয় শ্রেণীর মাসুমা আকতার, কালু মিয়ার মেয়ে পঞ্চম শ্রেণীর মিনি আকতার রুনা ও লোকমান হোসেনের ছেলে আশরাফুজ্জামান শান্ত। প্রতিদিন সকালে তারা একসঙ্গে বিদ্যালয়ে যেত ও ছুটির পর বাড়ি ফিরতও একসঙ্গে। শিক্ষাসফরে গিয়ে একসঙ্গেই চলে গেল না-ফেরার দেশে।
আড়াই বছর আগে এক শনিবারেই স্ত্রীকে হারান সৈয়দ আলী। গত শনিবার হারালেন দুই মেয়েকে। স্ত্রীর মৃত্যুর পর দুই মেয়ে ছোট আঁচড়া গ্রামে নানাবাড়িতে থেকেই লেখাপড়া করত। গতকাল ওই বাড়ির আঙিনায় রাখা মেয়েদের লাশের পাশে নির্বাক বসে ছিলেন শোকে স্তব্ধ সৈয়দ আলী। বিলাপেরও ভাষা যেন হারিয়েছেন তিনি।

default-image

দরজায় বসে বিলাপ করছিলেন সুরাইয়াদের নানি নূরনাহার বানু। ‘বু চলে গেলাম, বলে সালাম দিয়ে তারা (সুরাইয়া ও মাসুমা) চলে গেল। আর ফিরে এল না। সারা দিন তাগের সাথে কথা বলতে পারলাম না’—শোকার্ত নূরনাহারের এই আহাজারি ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়।
ছেলে শান্তর মরদেহের পাশে আর্তচিৎকার করছিলেন লোকমান হোসেন। তিনজন তাঁকে ধরে রেখেছেন। কাঁদতে কাঁদতে লোকমান বলেন, ‘সকালে ও (শান্ত) যখন যাচ্ছে, তখন বাড়ির মোবাইলটা ওকে দিলাম। সারা দিনই তার সঙ্গে কথা হয়েছে। দুর্ঘটনার আধা ঘণ্টা আগেও কথা বলেছি। এরপর ফোনে আর তাকে পেলাম না।’
বাস খাদে পড়ার পর রাতে উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া চৌগাছার ঝাউতলা এমকেএনজি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আবদুস সামাদ সকালে ছোট আঁচড়া গ্রামে আসেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘লালশাকের বীজ বের করার জন্য স্থানীয় গ্রামবাসী রাস্তার ওপর লালশাক শুকানোর জন্য ঢেলে রেখেছিল। দুপুরে বৃষ্টিতে রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে যায়। ওই সময় বিচালির একটি ট্রলিকে পাশ কাটাতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে শিক্ষাসফরের বাসটি খাদে পড়ে যায়। রাতে বাসের কাচ ভেঙে সবাইকে আমরা উদ্ধার করেছি। শিশুদের মুখগুলো ভেসে ওঠায় সারা রাত ঘুমাতে পারিনি।’

default-image

নিহত অন্য তিনজন হলো ছোট আঁচড়ার ইউনুচ আলীর মেয়ে মিথিলা খাতুন, নামাজ গ্রামের হাসান আলীর মেয়ে আঁখি খাতুন ও গাজীপুর গ্রামের সেকেন্দার আলীর ছেলে সাব্বির হোসেন। তারাও পরস্পর বন্ধু।
শোকে সকাল থেকে বেনাপোল পৌর শহরে নেমেছে নীরবতা। মাঝেমধ্যে মাইকে শোনা যাচ্ছে নিহতদের জন্য বেনাপোল পৌরসভার তিন দিনের শোক পালনের ঘোষণা। আর সাতজন শিক্ষার্থী হারানো বেনাপোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শোকের চিহ্ন বহন করছে একটি কালো পতাকা। সুনসান বিদ্যালয়ে খোলা কেবল শিক্ষকদের কক্ষ।
দুর্ঘটনাকবলিত বাসটিতে ছিলেন বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নাজমা খাতুন। বিদ্যালয়ের পাশেই তাঁর বাড়িতে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘শনিবার সকাল সাতটায় মেহেরপুরের মুজিবনগরের উদ্দেশ্যে স্কুল থেকে বাসটি ছাড়ে। সন্ধ্যার আগেই ফিরতি পথে বাস ছাড়া হয়। ঝাউতলায় বাসটি পৌঁছালে হঠাৎ বিকট শব্দ হয়। এর পরই বাসের ভেতরের বাতি বন্ধ হয়ে যায়, আমরা পানির মধ্যে। চিৎকার আর আর্তনাদ শুনে এলাকার লোকজন আমাদের উদ্ধার করে নিয়ে যায় হাসপাতালে।’
দুর্ঘটনায় আহত ৩০ জনের মধ্যে ১১ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাদের গতকাল যশোরের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এদের মধ্যে একজন শিক্ষক।
এক বাসে ১০১ জন: জানা যায়, ৫২ আসনের ওই বাসটিতে গাদাগাদি করে বসানো হয়েছিল ১০১ জনকে। এর মধ্যে ৯২ জন ছিল শিক্ষার্থী। শিক্ষক ছিলেন ছয়জন ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির তিনজন। অতিরিক্ত যাত্রী দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা।
জানতে চাইলে শার্শা উপজেলার শিক্ষা কর্মকর্তা ওহেদুল ইসলাম বলেন, ‘অতিরিক্ত চাপাচাপি-গাদাগাদির কারণে হয়তো মৃতের সংখ্যা বেড়ে থাকতে পারে। কী ব্যবস্থাপনায় স্কুল থেকে শিক্ষাসফরে যাচ্ছে, তা আমাদের জানানো হয়নি। ব্যবস্থাপনায় ত্রুটিও থাকতে পারে।’
দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী তিন দিনের মধ্যে দুটি তদন্ত কমিটিকেই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
বাসটির চালক যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার বল্লা গ্রামের ইসরাফিল ও তাঁর সহকারী মহররমকে আসামি করে গতকাল চৌগাছা থানায় একটি মামলা করেছেন থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সাহাবুল আলম। চৌগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মতিয়ার রহমান জানান, বাসের চালক ও সহকারী পলাতক। তাঁদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। বাসটি পুলিশের হেফাজতে রয়েছে।
যশোরে শিক্ষাসফরের বাস দুর্ঘটনায় গতকাল শোক প্রকাশ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেক, প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান। নিহত সাতজনের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে আজ সোমবার দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন