default-image

স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় দেশটা যখন টগবগ করে ফুটছে, তখন একাত্তরের ২৩ মার্চ শৈবালের কনিষ্ঠতম ভাইয়ের জন্ম। উত্তাল সেই সময়কে মাথায় রেখে বাবা তাঁর নামও রেখেছিলেন বিপ্লব। ফুটফুটে দেবশিশুর মতো দেখতে বিপ্লব আনন্দের যে উপলক্ষ নিয়ে এসেছিল, তা স্থায়ী হলো না কয়েক দিনও। ২৫ মার্চ রাতের গণহত্যার খবর এসে পৌঁছাল চট্টগ্রামে। তার দু-এক দিনের ব্যবধানে হত্যাযজ্ঞ শুরু হলো নগরীর ইপিআর ক্যাম্প, বন্দর, স্টেশনসহ বিভিন্ন এলাকায়। সেই সঙ্গে সদ্যোজাত বিপ্লবকে নিয়ে চট্টগ্রাম ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে শুরু হলো শৈবালের পরিবারের ছুটে চলা।

মাসখানেক মামার বাড়িতে কাটিয়ে আরও অনেক শরণার্থীর পরিবারের সঙ্গে সীমান্ত অতিক্রমের এক কষ্টকর যাত্রায় শামিল হলো শৈবালের পরিবার। কোলের শিশু বিপ্লবসহ পাঁচ ভাইবোনের বহর তাদের। বিপ্লব, রিনি, রিতা, রাজীব, কল্লোল আর সবার বড় শৈবাল নিজে। বয়স তখন মাত্র সাড়ে ৯ বছর হলেও যুদ্ধ যেন এক ধাক্কায় বয়সটা অনেক দূর বাড়িয়ে দিয়ে গেল। মে মাসের কোনো এক দিন সীমান্ত অতিক্রমের সময় বিপ্লবের মৃত্যু হয়। সেই শোক নিয়ে মিজোরামের শরণার্থীশিবিরে পৌঁছায় শৈবাল আর তার পরিবার। শিবিরে পৌঁছানোর পাঁচ-ছয় দিনের মাথায় কলেরায় ভুগে পরপর মারা যায় দুই বোন রিনি আর রিতা। ৯ মাসের শরণার্থীজীবনে কোনো শিবিরেই একটানা থাকা হয়নি তাদের। এক শিবির থেকে আরেক শিবিরে যাওয়ার পথে জঙ্গলে এক ঝরনার ধারে মৃত্যু হয় রাজীবের। এরপর আরেকটি শিবিরে রোগে ভুগে মারা যায় পিঠাপিঠি ভাই কল্লোলও। পাঁচ ভাইবোনকে হারিয়ে সদ্য স্বাধীন দেশে মা-বাবার সঙ্গে একাই ফিরেছিল শৈবাল।

একাত্তরের এই স্বজন হারানোর এই গল্প কোনো উপন্যাস বা চলচ্চিত্র থেকে তুলে আনা হয়নি। এই গল্প যাকে নিয়ে সেই শৈবালের পুরো নাম শৈবাল চৌধুরী। চট্টগ্রাম চলচ্চিত্রকেন্দ্রের পরিচালক, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও লেখক হিসেবে পরিচিত তিনি। দেশের সংস্কৃতিমনা লোকজন তাঁকে একনামে চিনলেও একাত্তরের এই বিয়োগান্ত ঘটনার কথা খুব কম লোকই জানেন। মা শান্তিরানী চৌধুরী ও বাবা বিশ্বনাথ চৌধুরী এখন আর বেঁচে নেই। দুঃসহ এই শোকগাথা একাই বহন করতে হচ্ছে শৈবাল চৌধুরীকে।
চলচ্চিত্রে পূর্ণ মনোযোগ দেবেন বলে সরকারি ব্যাংকের চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়েছেন। লেখালেখি, চলচ্চিত্র নির্মাণ ও ভাবনা নিয়েই সময় কাটে শৈবালের। একাত্তরের গল্প শুনব বলে একদিন সময় চেয়ে হাজির হই তাঁর চকবাজারের বাসায়। সেই গল্প টানা বলে যেতে পারেননি শৈবাল। কখনো বলতে বলতে থেমে গিয়ে শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন। কখনো ভেঙে পড়েছেন কান্নায়।

বাবা বিশ্বনাথ ছিলেন পাকিস্তান শেল অয়েল কোম্পানির কর্মকর্তা। একাত্তরের মার্চে তাঁকে করাচি বদলি করা হলে চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন সেই সময়কার রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে। ২৫ মার্চ ঢাকায় ও মার্চের শেষ দিকে চট্টগ্রামসহ সারা দেশে পাকিস্তানি বাহিনী নির্বিচার গণহত্যা শুরু করলে চট্টগ্রামের জামালখানের বাসা থেকে ২৭ মার্চ বেরিয়ে পড়েছিলেন তাঁরা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে। বাবা বিশ্বনাথ পরিবারকে সাতকানিয়ার কেঁওচিয়ার এক গ্রামে পাঠিয়ে মা প্রমীলা চৌধুরীর সঙ্গে জামালখানের পৈতৃক বাড়িতে থেকে যেতে চেয়েছিলেন। তবে পরিকল্পনা অনুযায়ী সব হলো না। স্ত্রী-সন্তানদের কর্ণফুলী পার করে দিতে গিয়ে পরিস্থিতি অনুকূল না থাকায় আর শহরের বাড়িতে ফিরতে পারলেন না বিশ্বনাথ।

বিজ্ঞাপন

এ প্রসঙ্গে শৈবাল চৌধুরী স্মৃতি হাতড়ে বলেন, ‘একদিকে বাড়িতে বৃদ্ধ মা, অন্যদিকে বিপদের মুখে স্ত্রী-সন্তানেরা। এমন দোটানায় যুদ্ধের ৯ মাস মর্মবেদনা পোহাতে হয়েছে বাবাকে। এর মধ্যে একে একে মারা যেতে থাকল ভাইবোনেরা। তবে কেমন যেন পাথরের মতো হয়ে পড়েছিলেন। কথা বলতেন না। তাকিয়ে থাকতেন একদিকে।

কেবল কল্লোলের মৃত্যুর পর বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো চোখের জল দেখেছিলাম তাঁর।’
সাতকানিয়ার কেঁওচিয়া গ্রামে মামার বাড়িতে তাঁরা ছিলেন আশ্রিতের মতো। খাওয়াদাওয়া নিয়ে সব সময় গঞ্জনা শুনতে হতো। মামারা খেতেন ভালো তরকারি দিয়ে, তাঁদের দেওয়া হতো সামান্য খাবার। তবু মেনে নিয়েছিলেন তাঁর মা-বাবা। কিন্তু একসময় মামারা আর রাখতে চাইলেন না তাঁদের। তার ওপর কেঁওচিয়া শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান জেবল হক এসে শৈবালের বাবা বিশ্বনাথকে প্রস্তাব দিলেন মুসলমান হয়ে যেতে, নয়তো মামাবাড়ি ছেড়ে শরণার্থী হয়ে ভারতে যেতে। উপায় না দেখে শরণার্থী হয়ে সীমান্ত অতিক্রমের সিদ্ধান্ত নেন বিশ্বনাথ।

মে মাসের শুরু দিকে ইপিআর আর শরণার্থীদের বিশাল একটা দলের সঙ্গে তাঁরা রওনা হলেন বান্দরবান হয়ে ভারতের মিজোরাম যাবেন বলে। সাতকানিয়া থেকে বান্দরবানের রুমা, সেখান থেকে বড় মোদক হয়ে মিজোরাম গন্তব্য ছিল তাঁদের। পুরোটা পথই হেঁটে যেতে হবে। পথেই তাঁদের সঙ্গে বিভিন্ন গ্রাম থেকে শরণার্থীর দল যোগ দিচ্ছিল তাঁদের সঙ্গে। তাঁদের অনেকেরই ঘরে আগুন দেওয়া হয়েছিল। এমন এক কিশোরীর দেখা পেয়েছিলেন, যার শরীরের নিচের পোশাক রক্তে ভিজে যাচ্ছিল। তখন বুঝতে পারেননি। কিন্তু এখন বুঝেছেন, ধর্ষণের শিকার হয়েছিল সেই মেয়েটি।

সঙ্গে ছোট ভাইবোনেরা থাকায় ধীরে এগোচ্ছিলেন শৈবালেরা। বান্দরবান হয়ে যখন রুমা পৌঁছালেন, তখন ১০ দিন পেরিয়ে গেছে। তাঁদের সঙ্গে তখন মাত্র পাঁচটি পরিবার ছিল। তাঁদের যাওয়ার কথা ছিল রুমা হয়ে মিজোরামের ফারুয়া ক্যাম্পে। কিন্তু সেখানে পৌঁছে শুনতে পান, বান্দরবান সীমান্তে পাকিস্তানি বাহিনী অবস্থান নিয়েছে। তাই আবার ঘুরপথে তাঁরা কাপ্তাই আসেন। সেখান থেকে কাপ্তাই হ্রদ দিয়ে জলপথে হরিণা হয়ে পৌঁছান ঠেগারমুখ নামের সীমান্ত এলাকায়। ওই এলাকায় ঠেগার পাহাড় পার হয়ে যেতে হবে মিজোরাম। এক রাতে সেখানেই মারা যায় তাঁর এক মাস বয়সী ছোট ভাই বিপ্লব।

শৈবাল বলেন, ‘বিপ্লব যে মারা গেছে, এটা মা বুঝতে পারেননি প্রথমে। নিশ্বাস নিচ্ছিল না দেখে বাবাই খেয়াল করেন। সেখানে স্থানীয় কয়েকজন চাকমা ছেলের সহায়তায় তাকে সমাহিত করা হয় কর্ণফুলীর তীরে।’

বিপ্লবের মৃত্যুর পরদিন তাঁরা ঠেগার পাহাড় পাড়ি দেন। সেই পাহাড় থেকে নামলেই মিজোরামের জারুলছড়ি শরণার্থীশিবির। অন্তর্বর্তীকালীন সেই শিবিরে ৩০-৩৫টি লম্বা ব্যারাক ছিল। সেখানে মেঝেতে চট বিছিয়ে থাকতে দেওয়া হয় তাঁদের। ওই শিবির ছিল নানা রোগের আস্তানা। পাঁচ-ছয় দিনের মধ্যে তাদের সব ভাই–বোনের কলেরা দেখা দেয়। হাত-পা সরু হয়ে যেতে থাকে সবার। খাবার দেওয়া হলেও রান্না করে খাওয়ার মতো শক্তিও ছিল না কারও শরীরে। রিনি আর রিতার পায়ের তালুতে ও নাভিতে ঘা দেখা দিল। চার দিন রোগে ভুগে রিনি ও পরদিন রিতা মারা গেল।
পাঁচ বছর বয়সী বোন রিনির কথা বলতে গিয়ে নিজেকে সামলাতে পারেননি শৈবাল। চোখ মুছতে মুছতে তিনি বলেন, ‘রিনি শাহনাজ বেগমের (শাহনাজ রহমতুল্লাহ) গান গাইত খুব। সেই গান শুনতে আসত প্রতিবেশীরাও। আজও যেন চোখে ভাসে ছোট্ট রিনি দুলে দুলে গান গাইছে।’

দুই বোনের মৃত্যুর পর জারুয়ালছড়ি ছাড়ার নির্দেশ এল তাঁদের কাছে। যেতে হবে পাশের পানছড়ি ক্যাম্পে। জঙ্গলের রাস্তা পাড়ি দিয়ে পানছড়ি ক্যাম্পে যাওয়ার পথে রাজীব অসুস্থ হয়ে পড়ে। এক ভোরের দিকে শ্বাসকষ্ট ওঠে তার। ছটফট করতে করতে ঢলে পড়ে সে। পাহাড়ের পাদদেশে ঝরনার পাশে সমাহিত করা হয় রাজীবকে।
মিজোরামের পানছড়ি থেকে কচুছড়ি, সেখান থেকে তৈচং যান তারা। তৈচংয়ে কিছুদিন থেকে যান দেমাগ্রি ক্যাম্পে। শৈবালের বাবা দুর্ঘটনায় পড়েন। পাহাড় থেকে পড়ে গিয়ে আহত হন। অসুস্থ হয়ে পড়ে ছোট ভাই কল্লোলও। বাবা সেরে উঠলেও কল্লোল আর সারেনি। দেমাগ্রি ক্যাম্পেই তাকে লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটতে হতো। অণ্ডকোষ ফুলে গিয়েছিল। দেমাগ্রি থেকে রুৎলং, সেখান থেকে পাচাং ক্যাম্পে আসার পর কল্লোলের অবস্থা আরও খারাপ হয়। অক্টোবর মাসে দুর্গাপূজা চলছিল ক্যাম্পে। কল্লোলের খুব ইচ্ছা ছিল ঠাকুরের কাছে গিয়ে জীবন ভিক্ষা চাইবে। কিন্তু অষ্টমীর দিন মৃত্যু হয় তার।

শৈবাল জানান, সাড়ে ছয় বছরের কল্লোল মারা যাওয়ার পর বাবা প্রথমবারের মতো বিলাপ করে কেঁদে উঠেছিলেন। কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, ‘অনেক দুষ্টুমি করত। তাই বেশি মেরেছি ছেলেটাকে। এখন মনে হচ্ছে, আরেকটু আদর করতে পারতাম যদি!’
কল্লোলের মৃত্যুর পর বাবা ধীরে ধীরে সেরে ওঠেন। পাচাং ছেড়ে তাঁরা চলে আসেন লুংলে ক্যাম্পে। সেখান থেকে আইজল হয়ে শিলচর। শিলচরের পর কাছাড় জেলার ভরখাই ক্যাম্পে স্থান হয় তাঁদের। সেখানেই শুনতে পান দেশ স্বাধীন হয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার খবরে তাঁর মা শান্তিরানী চৌধুরী তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেননি। পাঁচ সন্তানকে হারিয়ে তিনি ক্যাম্পেই থেকে যেতে চেয়েছিলেন। সন্তানেরা সব বিদেশের মাটিতে শুয়ে আছে। তাদের ফেলে আসতে চাননি তিনি।
তবে শৈবালের বাবা বলেছিলেন, যেই দেশের জন্য তাঁকে এত ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে, সেই দেশে ফিরবেনই তিনি। ফিরে আসেন ১৪ ফেব্রুয়ারি। শিলচর থেকে মৌলভীবাজার হয়ে ট্রেনে ভেঙে ভেঙে একেবারে চট্টগ্রাম। দেশে এসে এক আত্মীয়ের বাড়িতে মা প্রমীলা চৌধুরীকেও খুঁজে পান তিনি।

শৈবাল নিজের অতীতের বেদনাবহ কথা ভুলতে পারেন না। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধে সরাসরি যাঁরা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, তাঁদের কথা আমরা জানি। কিন্তু শরণার্থীশিবিরগুলোয় যাঁরা মারা গেছেন, তাঁরা আড়ালেই রয়ে গেছেন আজও।’
এই বলে চুপ করে যান তিনি। মাথা নিচু করে বসে থাকেন। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসা অন্ধকার স্বজন হারানোর শোকের মতোই ঘিরে ধরে তাঁকে।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন