default-image

অগ্রগতির ধারা অব্যাহত রাখতে হলে ভারতের বিশালত্বকে ‘সুবিধা-জনক’ দৃষ্টিতে দেখার পাশাপাশি বাংলাদেশকে ধর্মীয় মৌলবাদের মোকাবিলাও শক্ত হাতে করতে হবে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র আরও বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনার প্রশ্নে দিল্লিতে এক আলোচনা সভায় গতকাল বৃহস্পতিবার এ মনোভাবই বড় হয়ে উঠেছে।
ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শ্যাম শরণ এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত দুই সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি ও পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী মনে করেন, বাংলাদেশ এখন যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেখানে মৌলবাদের মোকাবিলাই তাদের রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা ঠিকমতো করতে না পারলে কয়েক বছর ধরে উন্নয়নের যে ধারা অব্যাহত আছে, তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার এ অঞ্চলও অশান্ত হয়ে উঠবে। দ্য সোসাইটি ফর পলিসি স্টাডিজ আয়োজিত এ গোলটেবিল আলোচনায় বাংলাদেশ থেকেও বিশিষ্টজনেরা যোগ দেন।
বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক ও অচলাবস্থা, তাকে কেন্দ্র করে ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং ধর্মীয় মৌলবাদের ক্রমে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার বিষয়গুলো এ আলোচনায় প্রাধান্য পায়।
শ্যাম শরণ মনে করেন, বাংলাদেশে অনিশ্চয়তা রয়েছে ঠিকই কিন্তু আশার দিকটি আশঙ্কার তুলনায় অনেক উজ্জ্বল। সেই আশার দিকটি হলো কয়েক বছরে বাংলাদেশের প্রায় সব দিকের প্রভূত উন্নতি। ৬ শতাংশ হারে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধিসহ অর্থনীতির সব ক্ষেত্রে অগ্রগতি, মানবসম্পদের বিভিন্ন মানদণ্ডের কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভারতের চেয়েও বেশি উন্নতি এবং খাদ্যে স্বনির্ভরতা লাভ বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাঁর মতে, বাংলাদেশকে বুঝতে হবে, ভারতের বিশালত্ব তার কাছে আশঙ্কার চেয়ে অনেক বেশি সম্ভাবনাময়। কারণ, বাণিজ্যিক দিক দিয়ে বাংলাদেশের বড় সহযোগী হয়ে দাঁড়াচ্ছে ভারত। এ সুযোগের সদ্ব্যবহার দুই দেশের কাছেই এক বিপুল সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে, যা আগামী দিনে আরও প্রসারিত হবে। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্রের শিকড় যত বেশি প্রোথিত হবে, বিকাশও হবে তত বেশি।

গণতন্ত্রের এ বিকাশের ক্ষেত্রেই চলে আসছে আশঙ্কার প্রশ্ন। নির্বাচনকে ঘিরে যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে এবং গত কয়েক মাসে ধর্মীয় মৌলবাদ যেভাবে মাথাচাড়া দিয়েছে, তাতে দেশের সুস্থিতি বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কাই বড় হয়ে উঠছে। সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ ও আবুল বারকাত মনে করেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্রী, শান্তিপ্রিয় ও ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের কাছে এটাই এ মুহূর্তের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বীণা সিক্রি মনে করেন, জামায়াত ও হেফাজত বাংলাদেশে অস্থিরতা আনতে চাইছে, তারা জঙ্গি ইসলামি শাসন কায়েম করতে চায়। সে জন্য তারা মানুষকে ভীতসন্ত্রস্ত করে রাখতে চায়। বিএনপির শাসনামলেও জামায়াত এ কাজই করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে। তিনি বলেন, সেই সময় মন্ত্রিসভার জামায়াতের সদস্যরা জেলায় জেলায় কৃষক পরিবারগুলোকে উৎসাহিত করতেন তাঁদের সদস্য হওয়ার জন্য। তাঁরা হতেনও। কিন্তু যখন ভোটের সময় এল, তখন তাঁরা জামায়াতকে ভোট দিলেন না। এটাই বাস্তব। সাধারণ মানুষ নিজের ভালোটা সবচেয়ে ভালো বোঝেন। জামায়াত যে তাঁদের ভালো করতে পারবে না, সেটা তাঁরা বুঝেছিলেন। বীণা সিক্রি বলেন, ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত জামায়াত সরকারে থেকেও তাদের লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে মানুষের সমর্থন না পাওয়ায়। এবারও মানুষ তাদের প্রত্যাখ্যান করবে। মানুষ ভোট দেয় তাদের অভিজ্ঞতার নিরিখে।

গোলটেবিল সম্মেলনে ঘুরেফিরে এসেছে তিস্তা ও সীমান্ত চুক্তি প্রসঙ্গ। চুক্তি সম্পাদিত না হওয়ায় বাংলাদেশের আশাহত হওয়ার প্রসঙ্গও বারবার উঠেছে। আলোচনায় এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাবের প্রসঙ্গও। পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী মনে করেন, চুক্তি আজ না হলে কাল হবে। এ জন্য ভারতের বিরোধিতা করা অর্থহীন। বরং আমেরিকা যেভাবে জামায়াতকে নরম মৌলবাদী বলে মনে করে, তা বিপজ্জনক। মৌলবাদ নরম বা কঠোর হয় কি না, সে প্রশ্ন ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে মার্কিন মনোভাব। সে বিষয়ে পিনাকরঞ্জন মনে করেন, বাংলাদেশে জামায়াতের ধারক-বাহক বিএনপি যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মদদ পাচ্ছে। তা ছাড়া তিনি বিশ্বাস করেন, গণতন্ত্রের স্বার্থেই বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হওয়া দরকার। বাংলাদেশের রাজনীতিকদের এদিকে বিশেষ নজর দেওয়া দরকার।

পিনাকরঞ্জন বলেন, বাংলাদেশের বিষয়ে ভারত কিছু করুক বা না করুক, সে দেশের রাজনৈতিক আবহে ভারত সব সময়ই একটা বড় ‘ফ্যাক্টর’। ভারত তার মনোভাবের পরিবর্তন ঘটিয়ে এ ফ্যাক্টরের চরিত্রও বদলে দিয়েছে। খালেদা জিয়া বারবার অপমান করা সত্ত্বেও তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করার চেষ্টা করেছে। এ মনোভাবের ব্যাখ্যাতেই শ্যাম শরণ বলেন, প্রতিবেশীদের উপেক্ষা করে যে বড় শক্তি হওয়া যায় না, ১৯৯০-এর পর ভারত তা বুঝেছে। সে কারণেই বাংলাদেশ আজ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সবচেয়ে বড় দোসর। সে কারণেই ভারতের দাদাগিরির অভিযোগও আগের মতো আর ওঠে না।

বাংলাদেশ সরকারের তথ্য কমিশনার সাদেকা হালিম ধর্মীয় মৌলবাদের একটি ভিন্ন দিকের অবতারণা করেন, যা দেশের নারীশক্তির উত্থানের পক্ষে খুবই বিপজ্জনক। তিনি বলেন, বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে সুবিধাজনক অবস্থায় পৌঁছেছে, তাতে দেশের নারীদের অবদান বিপুল। অথচ সেই নারীর ক্ষমতায়ন ও তাঁদের অবস্থানগত উন্নয়নে বাংলাদেশের বিভিন্ন শাসককুলের যা করা উচিত ছিল, তা এখনো পূর্ণভাবে করা হয়নি। সংবিধান সংশোধিত হয়েছে, কিন্তু তা নারীর ক্ষমতায়নকে পূর্ণ মর্যাদা দেয়নি। তাঁর আশঙ্কা, জামায়াত ও হেফাজতের ধর্মীয় মতাদর্শ দেশের নারীদের যেভাবে কপাটবন্দী করে দেখতে চায়, তা সফল হলে দেশের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে। কারণ, সাদেকা হালিমের হিসাবে দেশের লাখ লাখ নারী পোশাকশিল্পে কাজ করেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এ শিল্পের অবদান সর্বাধিক।

বাংলাদেশের এ টালমাটাল অবস্থায় সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখলের সম্ভাবনা কিন্তু ভারতীয় কূটনীতিকেরা উড়িয়ে দিয়েছেন। পিনাক বলেন, এ প্রবণতা দূরীকরণে জাতিসংঘের অবদান প্রবল। তাদের শান্তিরক্ষা বাহিনীতে বাংলাদেশি সেনাদের অংশগ্রহণের আগ্রহ এর কৃতিত্ব দাবি করতে পারে। তা ছাড়া অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আফসির করিমের মতো পিনাকও মনে করেন, বাংলাদেশের সেনাবাহিনী এ অবস্থানের বিপরীত আর কিছু করতে আগ্রহী নয়। তাঁর কথায়, হয়তো পাকিস্তানের সেনানীরাও নন।

সারা দিনের আলোচনার নির্যাস, ভারত কখনো চায় না তাদের পূর্ব সীমান্তের দশা পশ্চিম সীমান্তের মতো হোক। কোনো কারণে তেমন হলে সেটাই হবে এ উপমহাদেশের পক্ষে সবচেয়ে বিপজ্জনক। এবং তার মোকাবিলায় দুই দেশের গণতন্ত্রী, প্রগতিশীল ও শান্তিকামী মানুষকে একজোট হওয়া দরকার।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন