default-image

জুবায়ের আহমেদ হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া পলাতক পাঁচ আসামিকে খুঁজে বের করে রায় কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন জুবায়েরের মা হাসিনা আহমেদ। এ মামলার রায় শোনার পর কান্নাজড়িত কণ্ঠে প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ কথা বলেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র জুবায়ের হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে গতকাল রোববার। রায়ে পাঁচজনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ, ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছেন আদালত। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় অপর দুই আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪-এর বিচারক এ বি এম নিজামুল হক এ রায় ঘোষণা করেন। মামলার ১৩ আসামিই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থী ও বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী। মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া পাঁচজন হলেন খন্দকার আশিকুল ইসলাম, রাশেদুল ইসলাম, জাহিদ হাসান, মাহবুব আকরাম ও খান মোহাম্মদ রইস। তাঁরা সবাই পলাতক।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ পাওয়া ছয়জন হলেন ইশতিয়াক মেহবুব, মাজহারুল ইসলাম, শফিউল আলম, নাজমুস সাকিব, কামরুজ্জামান ও অভিনন্দন কুণ্ডু। এঁদের মধ্যে ইশ তিয়াক পলাতক। মাহমুদুল হাসান ও মো. নাজমুল হুসেইন খালাস পেয়েছেন। রায় ঘোষণার সময় কারাগারে থাকা সাত আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়।
গত ২৮ জানুয়ারি যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন শেষে ৪ ফেব্রুয়ারি এই মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য করা হয়। অবরোধ-হরতালে কারাগারে থাকা সাত আসামিকে নিরাপত্তার কারণে ওই দিন হাজির না করায় রায় ঘোষণার তারিখ ৮ ফেব্রুয়ারি ধার্য করেন আদালত।
রায়ে পর্যবেক্ষণ: রায়ে বলা হয়, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ঘটনার গভীরে ঢুকে বর্তমান রাজনীতির চরম বিশৃঙ্খলা, নীতিহীন ও আদর্শচ্যুত চেহারা উন্মোচন করেছেন। এতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কর্তৃপক্ষ সিন্ডিকেটও এসব প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হন। কারণ প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্রাতিরিক্ত প্রভাব বিদ্যমান রয়েছে।
রায়ে বলা হয়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে উল্লেখিত অনৈতিক কর্মকাণ্ডের শেষ পরিণতি হচ্ছে জুবায়ের হত্যাকাণ্ড। অনুরূপ অহেতুক হত্যাকাণ্ড মানবতা ও নৈতিকতাকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করে। এতে ভুক্তভোগীর পরিবারের ওপর নেমে আসে শোকের ছায়া। এমনকি পারিবারিক, সামাজিক ও আর্থিক নানা রকম সমস্যাও পরিবারগুলোকে গ্রাস করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পেশিশক্তির জোরে কোনো ধরনের সহিংসতা, নৃশংসতা, অশান্তি সৃষ্টি, নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা, হানাহানি, উগ্রতা, বর্বরতা শিক্ষার অনূকূল পরিবেশের ক্ষেত্রে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, যা কারও কাম্য হতে পারে না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত কোনো হত্যাকাণ্ড বা সন্ত্রসী কর্মকাণ্ডের বিচার সাম্প্রতিক অতীতে না হওয়াটাও পরবর্তী সময়ে একই ঘটনা ঘটাতে উৎসাহিত করছে।
রায়ে আরও বলা হয়, এ রকম হত্যাকাণ্ডে ছাত্ররাজনীতি সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হয়, যা স্বাভাবিক কারণেই ছাত্ররাজনীতিকে করে কলঙ্কিত। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হত্যা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড প্রতিহত করার জন্য ছাত্ররাজনীতির ক্ষেত্রে যুগোপযোগী আচরণবিধি তৈরি করা সময়ের দাবি বলে প্রতীয়মান হয়।
গণমাধ্যমকর্মীদের বিভিন্ন প্রশংসনীয় ভূমিকার উল্লেখ করেন বিচারক।
ঘটনাপ্রবাহ: ২০১২ সালের ৮ জানুয়ারি জুবায়েরকে ছাত্রলীগের প্রতিপক্ষের নেতা-কর্মীরা ক্যাম্পাসে কুপিয়ে জখম করেন। পরদিন ভোরে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার মদিনাবাগ নাবলাপাড়ার মো. তোফায়েল আহমেদের ছেলে তিনি।
আইনজীবী সূত্র জানায়, জুবায়ের হত্যার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আশুলিয়া থানায় মামলা করে। মামলায় ২০১৩ সালের ৮ এপ্রিল পুলিশ ১৩ ছাত্রের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। ওই বছরের ৮ সেপ্টেম্বর অভিযোগ গঠন করা হয়। মামলায় ৩৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ২৭ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষে সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর তাছলিমা ইয়াসমিন দিপা এবং আসামিপক্ষে আইনজীবী সৈয়দ রেজাউর রহমান ও জামাল উদ্দিন খন্দকার মামলা পরিচালনা করেন।
রায় কার্যকর চায় পরিবার
কলাপাড়া (পটুয়াখালী) ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্বিবিদ্যালয় প্রতিনিধি জানান, রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে নিহত জুবায়েরের পরিবার। রায়ে খুশি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরাও। তাঁরা বলেছেন, এই রায়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
রায়ে কী হতে পারে, তা নিয়ে কয়েক দিন ধরে দুশ্চিন্তায় ছিলেন জুবায়েরের বাবা নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য তোফায়েল আহমেদ ও মা গৃহিণী হাসিনা আহমেদ। কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়ে সকালে তাঁরা বাসায় ফেরেন। দুপুরে কলাপাড়া পৌর শহরের মদিনাবাগের বাসায় কথা হয় জুবায়েরের বাবা-মায়ের সঙ্গে। কথা বলার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁরা।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে হাসিনা আহমেদ বলেন, ‘কী রায় হয়, তা দেখার জন্য আমি টিভিতে চোখ রেখে বসে ছিলাম। যে রায় হয়েছে, তাতে আমরা খুশি। এখন আমাদের একটাই চাওয়া, রায় কার্যকর করা হোক। ফাঁসি হওয়া যেসব আসামি পলাতক রয়েছে, তাদের খুঁজে বের করে রায় কার্যকর করা হোক।’
তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘আমি চাই বিশ্ববিদ্যালয় যেন শুধু পড়াশোনার জায়গা হয়। সেখানে যেন মেধার প্রতিযোগিতা হয়। সরকারের কাছে তাই একটাই চাওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ত্রাস বন্ধ করুন। পড়াশোনার পরিবেশ নিশ্চিত করুন।’
জুবায়েরের সহপাঠী আবিদ আজাদ রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘আন্দোলনের ফলেই আমরা এ রায় পেয়েছি।’
সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক আহ্বায়ক মৈত্রী বর্মণ বলেন, রায় কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে, পলাতকদের গ্রেপ্তার করতে হবে। একই সঙ্গে ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক পরিবেশ বদলাতে হবে। না হলে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে।
নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী জুনানজিনা আহমেদ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে আমার বন্ধুদের মধ্যে একজন খুন হয়েছে আর অন্য ১৩ জন খুনি হয়েছে। কিন্তু তারা কেউ খুনি ছিল না। যে পথ দিয়ে একজন ছাত্র খুনি হয়ে ওঠে, সেই পথ আমাদের বন্ধ করতে হবে।’
রায়ে সন্তোষ জানিয়েছেন সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষক নাসিম আখতার হোসাইন, নইম সুলতান, দর্শন বিভাগের রায়হান রাইন, এ এস এম আনোয়ারুল্লাহ ভূঁইয়া, ইতিহাস বিভাগের এ টি এম আতিকুর রহমান, আনিছা পারভীন, নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের মো. আমিনুল ইসলাম, পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের মো. জামাল উদ্দিন প্রমুখ।
ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক মোহাম্মদ গোলাম রব্বানী বলেন, ‘জুবায়ের হত্যার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকেরা একসঙ্গে আন্দোলন করেছেন, আন্দোলন অব্যাহত রেখেছেন। তার ফল হলো এই রায়।’

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন