বিজ্ঞাপন

এই হুড়োহুড়ি অবশ্য আমাদের জাতীয় চরিত্র। তাই এ দেশে ‘সর্বাত্মক’ লকডাউনও হয় ঢিলেঢালা। রাস্তায় মানুষ হাঁটলে কড়াকড়ি চলে ঠিকই, তবে বড় বড় কারখানা খোলা থাকে, গণপরিবহনও চলে সরবে। আর বিভিন্ন আলো–ঝলমলে শপিং মল ক্রেতাকে জানায় উদাত্ত আহ্বান।

এ বিষয়ে একজন ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা বয়ান করা যায়। সংগত কারণেই তাঁর নাম প্রকাশ করা হলো না। তিনি বিভিন্ন কোম্পানির হয়ে স্যানিটারি ও বিদ্যুতের মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করতেন। তবে সাম্প্রতিক লকডাউনের কারণে সব কোম্পানির কাজ বন্ধ। এ কারণে তাঁর বেতনও বন্ধ। ঈদের খরচ তুলতে এখন তিনি বাসাবাড়ির ‘ছুটা’ কাজগুলো করছেন। কারণ, এই মানুষগুলোর সঞ্চয় গত এক বছরের করোনাকালে শেষ প্রায়। সাম্প্রতিক আলাপচারিতায় ওই ব্যক্তি বক্তব্য, ‘ভাই, এইডা কেমন লকডাউন? দিলে পুরা দ্যান, সব বন্ধ থাকুক। এমনে দেওয়ার মানে কী? কাজও তো পাই না। কেউ কাজ করায়, কেউ করায় না। রোজগার শ্যাষ।’

তবে রোজগার শেষ হলেও তাঁর ঈদের খরচ কিন্তু ‘নাই’ হয়ে যায় না। তাই চাঁদরাত পর্যন্ত রোজগারের আশায় থেকে তাঁকে ‘দ্যাশের’ পথই ধরতে হয়। কারণ, তাঁর ভাষায়, ‘ঈদে ঢাকায় থাকলে তো খাওনই পামু না। বাড়িত গেলে তাও চায়াচিন্তে বউ-পোলাপানের মুখে কিছু দেওন যাইব।’

ঢাকা মহানগরীর এই আর্থসামাজিক নিরাপত্তাহীনতা কিন্তু ঢাকা ত্যাগের অন্যতম বড় কারণ। করোনার কারণে এমনিতেও দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। জরিপের ভিত্তিতে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেম বলছে, করোনার প্রভাবে দেশে সার্বিক দারিদ্র্যের হার (আপার পোভার্টি রেট) বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ শতাংশ। অন্যদিকে, বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এক জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, কোভিডের আঘাতে দেশে নতুন করে দরিদ্র হয়েছে ২ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ। এ বছরের মার্চ পর্যন্ত যেখানে শহরাঞ্চলে নতুন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৫৯ শতাংশ, সেখানে গ্রামাঞ্চলে তা ৪৪ শতাংশ। সুতরাং শহরে দরিদ্রদের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।

default-image

আর এই দরিদ্ররা যদি খরুচে শহুরে জীবনে টিকে থাকতে পারছে না বলে মনে করে, তবে কি তাদের দোষ দেওয়া যায়? সরকার কি এই মহামারিকালে দরিদ্রদের টিকিয়ে রাখতে যথেষ্ট সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দিচ্ছে? অন্তত কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার তুলনায় দরিদ্রদের দিকে সরকারের মনোযোগ যে কম, সেটি কিন্তু সাদা চোখেই বোঝা যায়। শিল্পমালিকদের হাজারো ‘আবদার’ যত সহজে মানা হয়, ঠিক তেমনিভাবেই দরিদ্রদের ‘ভিড়’-কে অবলীলায় হেলা করা হয়। আমাদের মন্ত্রীরা তাদের বাড়ি ফেরায় ‘মর্মাহত’ হন। কিন্তু তাদের বাড়ি ফেরা ঠেকাতে আসলে কী করা হয়েছে? মনে রাখতে হবে, শপিং মল ও ঘাটের ভিড় কিন্তু প্রকৃতিগতভাবে এক নয়। দুটোকে এক করে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে সব দোষ চাপিয়ে দেওয়া নিরাপদ হলেও ঠিক ইনসাফ হয় না।

default-image

এই ইনসাফ হচ্ছে না শ্রমিকদের সঙ্গেও। ঈদ চলে এলেও তৈরি পোশাকশিল্পের সব শ্রমিক এখনো বেতন-বোনাস বুঝে পাননি। শিল্প পুলিশের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, আশুলিয়া, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও খুলনায় ৪ হাজার ৭৫৪টি পোশাক ও বস্ত্র কারখানা আছে। তার মধ্যে গত মঙ্গলবার পর্যন্ত ৭ শতাংশ কারখানা বেতন দেয়নি। আর ৪৩৬টি দেয়নি বোনাস। অথচ মালিকেরা সরকারি প্রণোদনা কিন্তু পাচ্ছেনই।

মোদ্দাকথা, ছুটি পেলে অধিকাংশ মানুষ আগে ঢাকা ছাড়ত শুধু নাড়ির টানেই। কিন্তু করোনার মধ্যে বাস্তবতা আর এ রকম নেই। ঢাকা ছাড়ার জন্য মানুষের পাগলপারা চেষ্টায় জনস্বাস্থ্য অবশ্যই ঝুঁকিতে পড়ছে। তবে পেটের চিন্তা মাথায় ঢুকলে মাথা একটু কমই কাজ করে। সুতরাং মাথাকে ঠিক রাখতে হলে আগে পেট ভরা থাকতে হবে। সরে আসতে হবে তেলা মাথায় অবিরত তেল ঢেলে যাওয়ার নীতি থেকে। নইলে শুধু শাপশাপান্ত করে সমস্যার সমাধান হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন