default-image

করোনা থেকে সুস্থ হয়ে যদি বেঁচে থাকেন তবে নাতি-পুতিদের ডেকে মহামারির গল্প শোনাবেন তিনি। ওই গল্পের শুরুটা হবে এ রকম, ‘আমি তখন মাদ্রিদের প্রথম সচিব, আর তোমাদের বাবাকে নিয়ে আমি একা থাকি। তখন ওর বয়স দুই বছর। সেই ক্রাইসিস টাইমে আমি করোনা ফেস করেছি।’ নাতি-পুতিরা অবাক হয়ে শুনবে ‘প্যান্ডেমিক সারভাইভার সাহসিনী দাদি’র গল্প।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে কথাগুলো লিখেছেন স্পেনের মাদ্রিদে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব তাহসিনা আফরিন শারমিন। বেঁচে থাকলে তিনিই হবেন ভবিষ্যতের প্যান্ডেমিক সারভাইভার সাহসিনী ওই দাদি।
তাহসিনা আফরিন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ১৫ মার্চ। ২৬ মার্চ পর্যন্ত তাঁকে বাড়িতে কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। একদিকে করোনার ভয়াবহ নানা শারীরিক জটিলতা, অন্যদিকে দুই বছর বয়সী ছেলেকে খাওয়ানো থেকে শুরু করে সবকিছু নিজ হাতেই সামলাতে হচ্ছে তাঁকে।

শিশুকে নিয়ে একাকী সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া এই মা ফেসবুকে আরও লিখেছেন, ‘এটা বৈশ্বিক মহামারি, আর আমি একটা ছোট্ট শিশুর একাকী মা, আমি অস্থির হব না তো কে হবে?’ প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘আপনারা সবাই দোয়া করবেন, আমি আমার ছেলেটার জন্য হলেও যাতে তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাই। এখানে আমি ছাড়া ওর তো আর কেউ নেই।’

বিজ্ঞাপন
default-image

তাহসিনা যখন স্পেন যান, তখন তিনি ৬ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। পরে ছেলের জন্ম হয় সেখানেই। দেশে থাকা বাবা, মা, স্বামী যিনি যখন পারেন, মাদ্রিদে গিয়ে এই মা ও ছেলেকে সঙ্গ দেন। কিন্তু করোনার প্রাদুর্ভাবে স্বজনদের সেই আসা-যাওয়া কঠিন হয়ে গেছে। বিশ্বজুড়ে করোনার সংক্রমণ শুরুর পর থেকে গত এক বছর তাঁর সংগ্রামের ধরন ছিল একরকম, এবার নিজেই আক্রান্ত হয়ে ছেলেকে নিয়ে সংগ্রামের ধরনটা হয়ে গেছে অন্য রকম। সংগ্রামও বেড়ে গেছে বহুগুণ।

স্ত্রী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন—বেসরকারি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক আর্কিটেক্ট মো. মারুফ হোসেন খবরটা শুনে মাদ্রিদ যাওয়ার জন্য একবার টিকিট কাটেন। আবার স্ত্রীর শরীর কিছুটা ভালো হয়েছে শুনে তা বাতিল করেন। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। এ অবস্থায় মাদ্রিদে গেলে স্বামী নিজেও আক্রান্ত হতে পারেন, এ আশঙ্কাতেই তাহসিনা চাচ্ছেন না এই মুহূর্তে স্বামী মাদ্রিদে যান।
তাইতো হোয়াটসঅ্যাপে কথা বলার সময় তাহসিনা বললেন, ‘স্বামী এখানে এসে করোনায় আক্রান্ত হলে তখন তাঁকেও দেখতে হবে, এখন তো শুধু ছেলেকে দেখতে হচ্ছে।’

মায়ের সঙ্গে মাদ্রিদে থাকা ছেলে শেহজাদেরও করোনার লক্ষণ ছিল। তবে পরীক্ষা করে নেগেটিভ ফলাফল এসেছে। এখনো সর্দিসহ নানান জটিলতা আছে তার। ছেলেকে একটু আরাম দিতে নেবুলাইজ করতে হয় তাহসিনাকে। বললেন, ‘আমার শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা। নাকে কোনো গন্ধ নেই। প্রচণ্ড দুর্বলতা তো আছেই, মনে হয় যদি একটু শুয়ে থাকতে পারতাম! কিন্তু উপায় তো নেই। আমার সহকর্মীরা খাবার রেখে যাচ্ছেন দরজার পাশে। তাই আপাতত রান্না করতে হচ্ছে না। তবে ফ্রিজের খাবার গরম করাসহ অন্যান্য সব কাজই করতে হচ্ছে।’

দূতাবাসে তাহসিনার এটাই প্রথম চাকরি। এর আগে শিক্ষানবিশ হিসেবে এক বছর জাপানে ছিলেন। বাবার ইচ্ছা পূরণে দূতাবাসে যোগ দিয়েছেন। এমবিবিএস পাস করে অনকোলজিতে উচ্চতর পড়াশোনা করছিলেন। বাবার চাওয়া ছিল তিনি বিসিএস দিয়ে ক্যাডার হবেন। সেই সুবাদে বিসিএস দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চাকরি ও মাদ্রিদে যাওয়া তাঁর।

default-image

তাহসিনা জানালেন, মেডিকেলে পড়ার সময় মাইক্রোবায়োলজি আর মেডিসিনে বেশি নম্বর পেতেন। অণুজীব-জীবাণুর বিভিন্ন বিষয় মুখস্থ। করোনা শুরুর এক বছর পর অণুজীব জয়ী হলো, আর করোনা মহামারি তাঁকেও ছুঁয়ে গেল। গত এক বছরে দেশে থাকা বাবা, মা, ছোট বোনও করোনায় আক্রান্ত হন। তবে এ রোগে কাছের কাউকে হারাতে হয়নি এখন পর্যন্ত।

ছেলেকে নিয়ে সংগ্রামের গল্প বলতে গিয়ে তাহসিনা জানালেন, মাদ্রিদে যাওয়ার সময় কথা ছিল, কাজের জন্য একজন সহকারীকে সঙ্গে নিতে পারবেন। তবে সহকারীর ভিসা আটকে যায়। তখন ওই দেশ থেকেই বাচ্চাকে দেখাশোনা করতে লোক (বেবিসিটার) নিয়োগ দিতে বলা হয়। বেবিসিটারের যে বেতন, তা দিতে গেলে সংসার চালানোই কঠিন হয়ে যাবে। তাই সে চিন্তা বাদ দিতে হয়। ছেলেকে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে পাঠানোর বয়স হলে ছেলেকে কেন্দ্রে নামিয়ে দিয়ে ছুটতেন কর্মস্থলে। তারপর অফিস শেষে ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ফিরতেন।

default-image

গত বছরের ১৪ মার্চ স্পেনে লকডাউন শুরু হয়ে চলে জুন পর্যন্ত। তারপর বাড়িতে থাকতে না হলেও প্রথমে নিয়ম ছিল ছয়জনের বেশি একত্র হওয়া যাবে না। বর্তমানে তা চারজন করা হয়েছে। ছেলের কথা ভেবে মানুষের ভিড় এড়িয়ে চলা, হাত ধোয়াসহ অন্যান্য সতর্কতা সব সময় মেনে চলেছেন তাহসিনা। এরপরও বাজারে যাওয়া বা গণপরিবহনে যাতায়াতের কোনো ফাঁকে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন বলে ধারণা করছেন।

তাহসিনা বললেন, ‘করোনা পরীক্ষার আগে দুই দিন হালকা জ্বর ছিল। যেহেতু অফিস করছিলাম, তাই টেস্ট করাই। বাসায় একা আছি বলে পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি সহকর্মীরা সব সময় চিন্তায় থাকেন। তাই প্রতিদিন নিয়ম করে সকালে কেমন আছি, তা খুদেবার্তায় কোনো না কোনো সহকর্মীকে জানাতে হয়।’

বিজ্ঞাপন
default-image

করোনা থেকে মুক্ত হলেও পুরোপুরি সুস্থ হতে অনেক সময় লেগে যায়। এখন তাহসিনার মূল চিন্তা সেটাই। জানালেন, দূতাবাসের নারী কর্মীদের জন্য নিজস্ব শিশু দিবাযত্নকেন্দ্র নেই। সুস্থ হলে ছেলেকে বাইরের কেন্দ্রে রেখে আসা, সেখান থেকে বাসায় নিয়ে যাওয়াসহ সব ঝক্কিঝামেলা কেমনে পোহাবেন, তাই ভাবনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
তাহসিনা বললেন, ‘যখন আমার কাজের সহকারীর ভিসা বাতিল হলো তখন অনেকে দেশে ফিরতে বলেছিলেন। কিন্তু তা আমার জন্য অপমানজনক মনে হয়েছে। ফিরে গেলে শুনতে হতো, মেয়েরা বিদেশে চাকরি করতে পারেন না। অন্য নারী সহকারীদের জন্যও তা বাজে উদাহরণ হতো। তাই আল্লাহর ওপর ভরসা করে চাকরি করার সিদ্ধান্ত নিই।’

তাহসিনা আক্ষেপ করেই বললেন, ‘কর্মক্ষেত্রে শিশু দিবাযত্নকেন্দ্র নেই, বাসায় কাজের সহকারী নেই। সব কাজ একা করতে হয় বলে অফিসের নিয়মিত কাজ ছাড়া তেমন বড় কোনো চ্যালেঞ্জ নিতে পারি না; যা প্রায় সময় মন খারাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।’
তবু হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষীণ হেসে তাহসিনা বললেন, ‘ছেলে মনে হয় মায়ের কষ্ট বুঝতে পারে। তাই এই বয়সী বাচ্চার যতটা দুষ্টুমি করার কথা, তা করে না সে।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন