বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কপোতাক্ষের পরই গোলপাতার ঝাড় দিয়ে শুরু বনের প্রাচীর। এই কপোতাক্ষজুড়ে যেমন আছে ভাঙন আর হারানোর গল্প, তেমনি আছে জীবনের বিপুল আয়োজনের ব্যতিক্রম হয়ে থাকা দু-একটা জয়মাল্য ফুল। তবে এই তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনা নগরের মানুষের কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতেই হারিয়ে যায়। ঝড়–জলোচ্ছ্বাসে বারবার ঠিকানা বদলের ধারাবাহিকতায় উপকূলের মানুষও নিজ ভূমিতে থিতু হওয়ার সুযোগ পায় কম।
এ বয়সেও আগুন রোদে নদীপথে দিনে দুবার না এসে একবার দীর্ঘ সময় থাকলেই তো পারেন, জিজ্ঞেস করেছিলাম। সুকুমার বাউলিয়া লম্বা-চওড়া হাসি দিয়ে বললেন, একটা বেলা ছেলেপেলেগুলো তখন নাটাই ছাড়া ঘুড়ির মতো ভোঁ ভোঁ করে ঘোরে। বনের দিকের নদীতে যায়, না হলে রোদের ভেতরই জালসি (হাতে ঠেলা ছোট জাল) নিয়ে নামে। ভাটার টানে কাদায় আটকে পড়া গুলি, মেনু মাছ ধরতে ছোটে। তখন নিজেরাই এক–একটা কাদামাখা ভূত হয়ে ঘুর ঘুর করে। ওই বেলার লেখাপড়া তখন লবডঙ্কা। না আসলে হয় বলেন?

default-image

সত্যি হয় না। এমন মানুষ না এলে একটি নোনা ভূমির বিষণ্নতা আর হারানোর যন্ত্রণার ভেতর মুদ্রার ভিন্ন পাশের গল্প লেখা হয় না। শুধু প্রজন্মের পর প্রজন্ম নয়, প্রত্যন্ত একটি জনপদই বিরানভূমি থেকে যেতে পারে একজন সুকুমার বাউলিয়ার অভাবে। কয়রার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নে পল্লী বিদ্যুতের বাতি পৌঁছেছে মাত্র বছর কয়েক আগে। খুলনার দৌলতপুরের সুকুমার চার যুগ আগে ভূমিপুত্র হয়ে আসেননি কয়রায়। জীবনের অভিঘাত টেনে এনে আশ্রয় দিয়েছে। তখনো এই জনপদ ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে যায় আবার ভেসে ওঠে। কখনো কখনো মরদেহ পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া ছাড়া গতি নেই আপনজনের। শ্বাপদসংকুল প্রান্তরের মানুষের টিকে থাকার লড়াইয়ের মাপে স্মৃতির মূল্য অমূল্য হয় না কখনো। সেই জনপদে তিনি আশ্রয় খুঁজে নিলেন। আর মানুষ দেখল, হঠাৎ আসা মানুষটা আসলে নিজেই আশ্রয়কেন্দ্র হয়ে উঠলেন বহুজনের জন্য। এসএসসি পাস সুকুমার দেখলেন, এখানকার শিশুরাও পূর্বসূরির অনুগামী। নদী, নৌকা, বনের বিকল্প ভাবতে শেখেনি। ছোট শিশুদের অক্ষরজ্ঞানের চেয়ে বেশি আগ্রহ, গোলপাতার ফল দেখা বা জোয়ার–ভাটার পূর্বাভাস দিতে পারায়। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দূরের আর সেখানে নিয়মকানুনের জন্যও বনজীবী, জঙ্গল করা মানুষের সন্তানদের পাঠানোর আগ্রহ কম। তিনি সেই শিশুদের জন্য ১৯৭৮ সালে একার উদ্যোগে শুরু করলেন যাত্রা।

বাদাবন থেকে আনা গোলপাতা বিছিয়ে বসো, মাটিতে দাগ দিয়ে শেখো স্বরবর্ণ। শুরু হলো শেখানোর নেশা। কিন্তু একার প্রচেষ্টায় কতটুকু সম্ভব! নদী থেকে তুলে আনেন, বনের ধার থেকে ধরে আনেন, খেলার মাঠ থেকে কান ধরে টেনে এনে বসান নব ধারাপাতের সামনে। তখন থেকেই হাজতখালী শিশুশিক্ষা নিকেতন প্রাক্‌ প্রাইমারিকে সবাই বলে ‘পাঠশালা’। তিনটি শ্রেণির পাঠদান করেন একমাত্র শিক্ষক। বাংলা, অঙ্ক, ইংরেজির পাশাপাশি প্রতিদিন সময় নিয়ে শেখানো হয় নীতিকথা ও সমাজবিজ্ঞান। খুদে শিক্ষার্থীরা মাস্টারমশাইকে ভয় পেতে পেতে ভালোবাসতে শেখে। তাদের অভাবী অভিভাবক এই শিক্ষকের কাছে যখন-তখন আসেন নানা সমস্যা নিয়ে। মন দিয়ে শোনেন, সমাধান দেন। মাঝেমধ্যে নিজেও ডাকেন। নদীতে মাছ ধরা নারী, বন থেকে মধু সংগ্রহ করা পিতা সন্তানের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অভিভাবক হিসেবে আলোচনায় অংশ নেন। অজান্তে এভাবেই বাড়ে মানুষের নিজের প্রতি নিজের সম্মান। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর এই মানুষেরা এত দিন জানত, তারা শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগে সংবাদ শিরোনাম। ত্রাণের জন্য পানির ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ। একজন মানুষ ধীরে ধীরে বদলে দিতে শুরু করল তাদের মানসিকতা। শিশুদের মনস্তত্ত্ব খুব শক্তিশালী। তারা মা–বাবার সম্মান–অসম্মানটা খুব বোঝে। তাই পড়তে বিশেষ ইচ্ছা না থাকলেও মাস্টারমশাইকে ওরা ঠিক ভালোবাসে। এতটাই অধিকার যে এ শিক্ষকের একার একটা ছবি তোলারও যেন অধিকার নেই।

default-image

বনজীবীদের সন্তানদের দুই বেলা পাঠের বিনিময়ে পাঠশালার মাসিক বেতন দুই শ টাকা। কারও আবার সেটুকু সামর্থ্যও নেই। কিন্তু বেতন দিতে পারছে না বলে এ পাঠশালা থেকে মন খারাপ করে কেউ কখনো ফেরেনি। তবে উপকূলের এই প্রান্তিক ভূমিতে একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে যখন মানুষের বেঁচে থাকাটাই জিতে যাওয়ার সমান, তখন কারও কাছে এমন উদ্বৃত্ত থাকে না, যা দিয়ে একটি ঘর বানিয়ে দেওয়া যায়। আজ এখানে, কাল সেখানে বসে তিনি ছাত্রদের পড়াচ্ছিলেন ৪৩ বছর ধরে। যতটুকু ছাউনি, বেড়া সেটুকুও উড়িয়ে নিয়েছে আম্পান। বসার স্থান না পেয়ে খুঁজে নিয়েছিলেন পরিত্যক্ত এক পোলট্রি ঘর। পূতিগন্ধময় সে ঘরে গোলপাতা পচে দলা পাকিয়ে ছাউনির জায়গায় জায়গায় সরে ফাঁক হয়েছে। সেখান দিয়ে চাঁদ–সূর্য–রোদ–জোছনা সবই আসে। গরিব ছাত্ররা ভিজতে ভিজতে নিচের চাটাই টেনে আরও একটু সরে বসে ভেজা মাটিতেই। উপকূলের রোদের তাপ নুনের মতোই বিষাক্ত হয়ে শরীর পোড়ায়। তামাটে হয়ে যাওয়া সুকুমার বাউলিয়া বসে থাকেন ভাঙা চেয়ারে। উঠে দাঁড়ালে কখনো পা দেবে যায় পরিত্যক্ত পোলট্রি ফার্মের মেঝের কাদায়। দড়ি ঝোলানো ব্লাকবোর্ডের কাছে এগিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়ে অসহায় হয়ে তাকান ফাঁকা ওই কালো জমিনে।

default-image

আম্পানের পর যেমন কপোতাক্ষ দৈর্ঘ্যে–প্রস্থে বড় হয়েছে, উল্টো আবার পলি জমে অনেক প্রবাহের সরল মুখ গেছে আটকে। সেখানে থকথকে কালো পানির উৎকট গন্ধ। ঝড় আসছে, আঘাতে নুয়ে যাচ্ছে গাছপালা, ভেসে উঠছে মৃত মাছ, বাস্তুহীন হওয়ার ইতিহাস তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এই চার যুগ ধরে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি ছাড়েননি পাঠশালায় পড়ানোর দায়িত্ব। এই তাঁর একমাত্র উপার্জনের পথ। কয়েকটা দিন খুলনায় ছিলেন। তখন পালা করে পড়াতেন সুভাষ চন্দ্র মণ্ডল আর রানা প্রতাপ নামে দুজন শিক্ষক। সুকুমার বাউলিয়া আবার ফিরে আসেন পুরোনো জনপদে। নৌকায় দুই বেলা যাতায়াতে মাসে ভাড়া ছয় শ টাকা। বেতনের হাজার চারেক টাকা পাওয়ার পর একবারে শোধ করেন। সে বেতনও প্রায় অনিয়মিত। এমন নিঃস্ব–অসহায় অভিভাবকদের সন্তানদের তিনি পড়াবেন ব্রত করেছেন। ফলে পরিত্যক্ত মুরগির ঘর হলেও নিজের দায়িত্বটি পালন করে আসছিলেন। একদিন এ গ্রামেরই এক যুবকের চোখে পড়ল। তিনি সুকুমার বাউলিয়ারই অনেক আগের এক ছাত্রের সন্তান। তিনি আর তাঁর পরিচিতজনেরা মিলে শুরু করলেন পাঠশালার জন্য ঘর তৈরির উদ্যোগ। বড় অবদান নোনা নদীর পাড়ের গ্রামের মানুষের। কেউ বেঁধে দিল ঘরের চালের বাঁধন, কেউ বানিয়ে আনল শিশুদের জন্য বেঞ্চ। একজন দিল মেঝেটা একটু পোক্ত করে। সরকারি জমিতে নতুন করে শুরু হলো হাজতখালী শিশুশিক্ষা নিকেতন, যা এখানকার সবার কাছে সুকুমার স্যারের পাঠশালা নামে চেনা।

default-image

৪৩ বছর পর অবশেষে পেলেন একটি শ্রেণিকক্ষের স্কুল। সুকুমার বাউলিয়ার শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বহুদিন হলো। সস্তা মোবাইল ফোনটিও নষ্ট। যোগাযোগের সুযোগই নেই। এগিয়ে এলেন এ গ্রামেরই আরেক তরুণ পবিত্র কুমার সরকার। দুজনের মাঝখানে প্রায় অনুবাদকের ভূমিকা নিলেন পবিত্র।
শিক্ষকের স্ত্রী নীহারিকা দেবী এ গ্রামেরই মেয়ে। দুই সন্তানের মধ্যে ছেলেটি থাকে সিলেটে। তিনি ভালো চাকরি করেন। মেয়েটি থাকে খুলনায়। সন্তানদের কাছে থাকলে তো আর এত কষ্ট করতে হয় না জিজ্ঞেস করতেই উল্টো জানতে চাইলেন, জীবনের পরিপূর্ণতা কেমন করে আসে? আমি নিরুত্তর। বললেন, একটা গল্প শুনবেন?
আমি দুই বেলা রুটি খাই। সব দিন যে সময়মতো বানানো সম্ভব হয়, তা না। একদিন একটু আগে আগে আসার প্রয়োজন ছিল। নৌকা থেকে নামার সময় দেখেছে আমার প্রথম শ্রেণিপড়ুয়া এক ছাত্র। কিছুক্ষণ পর যখন ছেলেটা পাঠশালায় এল, দূর থেকে দেখছি ও দৌড়াচ্ছে। এক হাতে বই–খাতা আরেক হাতে গোল কিছু একটা দুলছে। কাছাকাছি হলে দেখলাম, একটা লাল রুটি। আমার অভাবী ছাত্র মাকে অনুরোধ করে একটা রুটি বানিয়ে আনতে পেরেছে। কে জানে ওটুকু আটাও হয়তো পাশের বাড়ি থেকে চেয়ে আনা। সঙ্গে আর কিছু নেই, শুধু একটা রুটি। কিন্তু আমার ছাত্র সেদিন আমাকে যা দিয়েছে, এমন উপহারের চেয়ে মূল্যবান কিছু কেউ কি আমাকে কখনো দিতে পারবেন আপনারা?

default-image

দ্বিরালাপের শেষে জানতে চাইলেন, দুজন সন্তানের চেয়ে জীবনের শেষ মুহূর্তে অনেক সন্তানকে একসঙ্গে কাছে পাওয়া অনেক বেশি প্রাপ্তির কি না? তিনি চলে যাওয়ার পর মাহফুজ বা পূজা, তূর্য বা মাসুমা অনেক অনেক বড় হবে। এই গ্রামে ফিরে আসবে। মাঠের পাশের ছোট ঘরটা দেখে তাদের মনে পড়বে মাস্টারমশাইয়ের স্মৃতি। নিজেদের শৈশবের স্মৃতি তাদের উসকে দেবে আরও কয়েকজন অভাবী শিশুর শিক্ষার দায়িত্ব নিতে। এভাবেই প্রজন্মের সৎ ইচ্ছায় তিনি থাকবেন বলে বিশ্বাস করেন উপকূলের একজন শিক্ষক সুকুমার বাউলিয়া। নিজের বিদায় আয়োজন নিয়ে খুবই আড়ম্বরপূর্ণ স্বপ্ন দেখার সাহসী এ শিক্ষক নুনের বিষেও এক উজ্জ্বল আলো।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন