default-image

পাবনায় প্রথম শহীদ হন বীর মুক্তিযোদ্ধা জি এম শামসুল আলম বুলবুল। ভালো গান গাইতেন। তাঁর টেপ রেকর্ডারটিতে নিজের গান ধারণ করেছিলেন। কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ‘এ কোন মধুর শরাব দিলে’ গানটি যখন বেজে উঠল, তখন অনুষ্ঠানজুড়ে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

রাজধানীর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে আজ বৃহস্পতিবার আয়োজিত হয় মুক্তিযুদ্ধের স্মারক গ্রহণ ও তহবিল সংগ্রহ অনুষ্ঠানটি। সেখানে মুক্তিযোদ্ধা বুলবুলের টেপ রেকর্ডার ও মৃত্যুর সময় হাতে থাকা ঘড়িটি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরকে হস্তান্তর করেন তাঁর পরিবার।

অনুষ্ঠানে ‘ছালাম ছালাম হাজার ছালাম’ গানের রচয়িতা কবি ফজল-এ-খোদার ডায়েরি, বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাসান মাসুদের পরিচয়পত্র ও গেরিলা কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালনের দলিলপত্র, শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটকের প্রথম সংস্করণ, পটুয়াখালীর বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ রশিদ উদ্দিনের কারাপঞ্জি, কুমিল্লার বীর মুক্তিযোদ্ধা অলি আহাম্মদের সোনামুড়া ক্যাম্পের হিসাব দপ্তর পরিচালনাকালীন ভাউচার, পেটি ক্যাশ রেজিস্ট্রার, হিসাব বই ও দলিলপত্র মুক্তিযুদ্ধের স্মারক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরকে দিয়েছে তাঁদের পরিবার। এ ছাড়া কয়েকজন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে বিভিন্ন অঙ্কের অনুদান দেন।

বিজ্ঞাপন
default-image

পাবনার লস্করপুরে মুক্তিযোদ্ধা বুলবুলসহ আরও তিনজন শহীদ হন। শহীদ বুলবুলের স্মৃতি স্মারকটি হস্তান্তর করেন তাঁর বোন সায়মা জাহান। অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, মা ভাইকে দূরের কবরস্থানে দাফন করতে দেননি। মায়ের ঘরের জানালা ঘেঁষে হয় ভাইয়ের কবর।

মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকার বংশাল এলাকার গেরিলা কমান্ডার আবুল হাসান মাসুদ এখন যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। তাঁর স্মারকটি জাদুঘরকে দেন বোন অধ্যাপক হাফিজা খাতুন। নিজের কথায় তিনি তুলে ধরেন তাঁর মা কীভাবে দুই ভাইকে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। ভাইয়েরা মুক্তিযুদ্ধে যেতে চাইলে মা তাঁদের অঙ্গীকার বুঝতে চেয়েছিলেন। রান্নার জন্য গাছ কেটে খড়ি সংগ্রহের কঠিন কাজটি তাঁদের করে দিতে বলেন। দুই ভাই যখন নিঃসংকোচে কাজটি করে দিলেন, মা সন্তানদের বললেন পেছন ফিরে না তাকিয়ে যুদ্ধে যেতে।
হাফিজা খাতুন বললেন, তাঁর ভাইয়ের পরিচয়পত্রটি তিনি তাঁর পাসপোর্টের সঙ্গে রাখতেন। তিনি বলতেন, মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়েছে, তবে যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। যুদ্ধটা হবে সামনে।

default-image

ফজল-এ-খোদার ডায়েরিটি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের কাছে তুলে দেন তাঁর ছেলে ওয়াসিফ এ খোদা, ‘কবর’ নাটকের প্রথম সংস্করণ তুলে দেন অধ্যাপক ভুঁইয়া ইকবাল, রশিদ উদ্দিনের কারাপঞ্জি তুলে দেন তাঁর কন্যা লীলা রশিদ এবং অলি আহাম্মদের স্মারক তুলে দেন তাঁর কন্যা তাসরিন সুলতানা। অনুষ্ঠানে স্মারক বিবরণী পাঠ করেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের কর্মকর্তা আমেনা খাতুন।

অনুষ্ঠানে চিকিৎসক অধ্যাপক লতিফা শামসুদ্দীনের বক্তৃতায় মুক্তিযুদ্ধের মর্মস্পর্শী বর্ণনা উঠে আসে। তখন তিনি বগুড়ায় চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত ছিলেন। যুদ্ধের পর তিনি অনেক নির্যাতিত নারীকে উদ্ধার করেছিলেন। তিনি বলেন, নারীদের এই নির্যাতনের কথাগুলো কম লেখা হয়, এসব কথাও সামনে আনতে হবে।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ও সাংসদ আসাদুজ্জামান নূর বলেন, এই স্মারকগুলো বেদনার, আবার গৌরবের। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এই গৌরব ও বাস্তব ইতিহাসকে ধারণ করে। এগুলোর কোনো মূল্য হয় না, এগুলো অমূল্য।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আরও গবেষণা করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন জাদুঘরের ট্রাস্টি ও সদস্যসচিব সারা যাকের। তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মের সঙ্গে সেতুবন্ধ করতে হবে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি সারওয়ার আলী, মফিদুল হক, ব্যবস্থাপক (কর্মসূচি) রফিকুল ইসলাম প্রমুখ।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন