আলোচনা সভায় বক্তারা

জঙ্গিবাদ দমনে দরকার রাজনৈতিক ঐক্য

বিজ্ঞাপন

এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ জঙ্গিবাদ দমন। জামায়াতসহ জঙ্গিবাদ ও মৌলবাদ মোকাবিলায় দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা ও ঐক্য জরুরি বলে মনে করেন বিশিষ্টজনেরা।
গতকাল শনিবার ‘জঙ্গিবাদের হুমকি: বাংলাদেশ ভাবনা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় এসব কথা বলেছেন বিশিষ্টজনেরা। তাঁরা এ-ও বলেছেন, দেশের প্রচলিত আইনের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমেই জঙ্গিবাদকে রুখতে হবে। বিচারবহির্ভূত হত্যা বা ‘গুম’-এর মাধ্যমে এর নির্মূল সম্ভব নয়।
রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে গতকাল শনিবার এই আলোচনার আয়োজন করে বাংলাদেশ সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট। বক্তারা জামায়াতে ইসলামীকে জঙ্গিবাদের সহযোগী হিসেবে আখ্যায়িত করে দলটিকে নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি এর অর্থের উৎস ও প্রকাশনা নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক বলেন, জঙ্গিবাদ বাংলাদেশের একটি বাস্তবতা। কিন্তু বাংলাদেশের সৃষ্টির পেছনে যে দর্শন ছিল, তাতে জঙ্গিবাদের কোনো স্থান নেই, আছে নিরঙ্কুশ ধর্মনিরপেক্ষতা। তিনি বলেন, ‘জঙ্গিবাদ নির্মূলে বিচারবহির্ভূত হত্যার কথা আমরা চিন্তাও করতে পারি না।’
বর্তমান আইন কমিশনের চেয়ারম্যান খায়রুল হক বাংলাদেশের সন্ত্রাস দমন আইনের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরা অনেক আইন তৈরি করেছি। কিন্তু প্রয়োগ করছি না। অন্যায় হচ্ছে কিন্তু এর প্রতিকার হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে মানুষ নিজের হাতে আইন তুলে নেবে।’ তিনি সঠিক বিচার না হওয়ার কারণ হিসেবে দুটি বিষয় উল্লেখ করেন। প্রথমত, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মান অত্যন্ত খারাপ। দ্বিতীয়ত, সংস্থাগুলোর কোনো দায়িত্ববোধ নেই। দায়সারাভাবে তদন্ত করার ফলে এর প্রভাব পড়ে বিচারের ক্ষেত্রে।
জঙ্গিবাদের উত্থানের কারণে মানবাধিকার হুমকির মধ্যে রয়েছে বলে মন্তব্য করেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে জাতীয় নির্বাচনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজ জঙ্গিবাদ দমন। যাঁরা জাতীয় নির্বাচনের কথা বলছেন, তাঁরা জাতিকে ভুল বার্তা দিচ্ছেন।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আমীর-উল ইসলাম বলেন, জঙ্গিবাদ দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। মসজিদের ইমাম ও ইসলামি নেতাদের নিয়ে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করতে হবে।
জামায়াত ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বিএনপির সঙ্গে সরকারের আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মত দেন সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ফারুক চৌধুরী।
ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আলোচনায় অংশ নিয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল দেশে মৌলবাদের উত্থানে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রশ্রয় ও আপসকামিতাকে দায়ী করেন।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন বলেন, জঙ্গিবাদ কোনো দলের সমস্যা নয়, এটি এখন দেশের জাতীয় সমস্যা। এ সমস্যা থেকে দ্রুত উত্তরণের জন্য পথ খুঁজে বের করতে হবে। জঙ্গিবাদ তৎপরতা দমনে রাজনৈতিক বিভাজন বন্ধ করতে হবে।
সমকাল-এর সম্পাদক গোলাম সারওয়ার জঙ্গিবাদ দমনে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রস্তাব দেন। হেফাজতকে সমাবেশের অনুমতি দিয়ে সরকার ভুল করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ‘গডফাদারদের’ আইন প্রয়োগ করে নিষিদ্ধ করার দাবি জানান। জঙ্গিবাদ দমনে বৈশ্বিক পর্যায়ে টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাবও দেন তিনি।
সর্বস্তরে একই শিক্ষাক্রম চালু করার প্রস্তাব দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খন্দকার ইব্রাহীম খালেদ। তিনি জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে পরিশীলিত করার পাশাপাশি জামায়াত-বিএনপির সময় নিয়োগ পাওয়া জঙ্গিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার পরামর্শ দেন।
মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশীদের সভাপতিত্বে এ আলোচনার সঞ্চালনা করেন আইনজীবী তানিয়া আমীর। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মেজর জেনারেল (অব.) কে এম সফিউল্লাহ, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি সারোয়ার আলী ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বক্তব্য দেন। এ ছাড়া আরও বক্তব্য দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আনোয়ার হোসেন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আলী যাকের, সাংবাদিক আবেদ খান, সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইসফাক এলাহী চৌধুরী, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না প্রমুখ।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন