বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

২.

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ২৭ মে থেকে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ১১১তম আন্তর্জাতিক শ্রম সম্মেলনের আয়োজন করেছে। প্রথম আলোর গতকাল বুধবারের প্রতিবেদন বলছে, এ সম্মেলনে অংশ নিতে সুইজারল্যান্ড যাচ্ছে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ানের নেতৃত্বাধীন ৪৩ জনের একটি বহর।

এই বহরে শ্রম মন্ত্রণালয়, মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ দপ্তর, সরকারের আরও কয়েকটি সংস্থার প্রতিনিধি, শ্রমিকনেতা, সিবিএ নেতা ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা যাচ্ছেন। ৪৩ জনের এই সফরে ২৫ জনের খরচ বহন করবে সরকার। ২৫ জনের পেছনে মোট কত ব্যয় হবে, তা জানতে পারেনি প্রথম আলো। তবে শ্রম মন্ত্রণালয়ের খরচে যাওয়া ১১ জনের পেছনে ব্যয় হবে দেড় কোটি টাকা। জনপ্রতি ১৩ লাখ ৬৪ হাজার টাকার মতো। এ টাকার উৎস সরকারি কোষাগার; তেল, চিনি, সাবান কিনে মানুষ যে কর দেয়, তা জমা হয় সরকারের কোষাগারে। এই সরকারি কোষাগারে রাখা ‘গেরস্তের মুরগি’ এখন ‘সরকারি শিয়াল’–এর খপ্পরে পড়েছে।

৩.

প্রথম কথা হলো, আইএলওর শ্রম সম্মেলনে এ বিশাল বহরের যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ, এ সম্মেলনে এমন কোনো কাজ থাকে না, যেখানে এত মানুষের যাওয়ার প্রয়োজন হবে।

রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম অনেকটা শোভনভাবে প্রথম আলোকে বলেছেন, অন্য দেশ থেকে ৫ থেকে ১০ জনের একটি প্রতিনিধিদল এ সম্মেলনে অংশ নিতে তিনি দেখেছেন। বড়সংখ্যক মানুষ সেখানে যাওয়ার মতো কোনো কাজ থাকে না। উল্লেখ্য, জনাব হাতেমের দুই দফা শ্রম সম্মেলনে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে।
দ্বিতীয় কথা হলো, এই সফরে মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তাদের স্বজনদের যাওয়া একেবারে অনৈতিক ও দুর্নীতির শামিল। সেটা নিজেদের টাকায় গেলেও।

উল্লেখ্য, জেনেভা সফরের বহরে থাকছেন প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ানের মেয়ে ও জামাতা, চাচাতো ভাই এবং আপন ভাই (প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সহকারী বা এপিএস)। আরও তিন কর্মকর্তা নিজেদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে জেনেভা যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এখন শুধু ভিসার অপেক্ষা।

প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান প্রথম আলোর প্রতিবেদকের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, সরকারি সফরের অংশ হিসেবে আত্মীয়স্বজনদের নিয়ে যাওয়ার একটি কারণ, ভিসা পাওয়া সহজ। এখানে একটি প্রশ্ন ওঠে যে স্বজনেরা যাতে সহজে ভিসা পান, তার জন্য বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের অংশ করাটা নৈতিক কি?

৪.
সরকার ব্যবস্থায় অধীন দপ্তরগুলোর কর্মকাণ্ড তদারকি করে মন্ত্রণালয়। শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীন দপ্তর থেকে চারজন করে কর্মকর্তাকে সরকারের বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে জেনেভা সফরে কেন যেতে হবে, সেই প্রশ্ন করতে পারতেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। কেন শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খালেদ মামুন চৌধুরীকে (অতিরিক্ত সচিব) তাঁর স্ত্রীকে সঙ্গী করে জেনেভা যেতে হবে, সেই প্রশ্নও তুলতে পারত মন্ত্রণালয়। এ জন্যই জনগণ তাঁদের বেতন দিয়ে রাখে, যাতে মানুষের করের টাকার অপচয় না হয়। সরকারি কর্মকর্তারা যাতে কোনো অপচয়-অনিয়ম করতে না পারেন, তা তদারকির দায়িত্ব মন্ত্রীর।

জেনেভা সফরের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাচ্ছি, অধীনস্থ দপ্তরগুলোর চারজন করে কর্মকর্তা বহরে নিজেদের নাম লিখিয়েছেন। মন্ত্রণালয় সেটায় বাধা না দিয়ে নিজেরাও পাঁচজনের জেনেভা যাওয়ার বন্দোবস্ত রেখেছে। প্রতিমন্ত্রী সরকারি সফরে এত বেশি কর্মকর্তাদের যাওয়া এবং অতিরিক্ত সচিব-যুগ্ম সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সফরে যাওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করতে পারতেন। তিনি সেটা না করে যাচ্ছেন মেয়ে, জামাতা ও ভাইকে নিয়ে।

সংসদীয় ব্যবস্থায় মন্ত্রণালয়গুলোর কর্মকাণ্ড তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিতের দায়িত্ব সংসদীয় স্থায়ী কমিটির। জেনেভা সফরে ৪৩ জনের বহর যাওয়ার প্রয়োজন আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারত শ্রম মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। কিন্তু কমিটি সেটা করেনি। বরং নিজেদের ‘ভাগ’ নিশ্চিত করেছে। ৪৩ জনের বহরে আছে দুজন সংসদ সদস্যের নাম, যাঁরা সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য।

৫.

জেনেভা সফরের ক্ষেত্রে আমরা দেখলাম, অনৈতিকতা ও অপচয় ঠেকানোর ক্ষেত্রে সরকারি যে ব্যবস্থা থাকে, তার পুরোপুরি অনৈতিকতার অংশ হয়ে গেছে। গেরস্ত যাঁর কাছে মুরগি বর্গা দিচ্ছেন, তিনিই ‘শিয়াল’ হয়ে যাচ্ছেন।

শুধু জেনেভা সফর কেন, অপচয়, বিলাসিতা ও অনিয়মের অভিযোগ তো ভূরি ভূরি। গত ২ জানুয়ারি প্রথম আলোতে প্রকাশিত ‘গাড়িবিলাসে ঢাকার দুই সিটি’ শিরোনামের আরেক প্রতিবেদন বলছে, গাড়ি ব্যবহারসংশ্লিষ্ট বিধি হালনাগাদ না করেই ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা প্রাধিকারভুক্ত না হয়েও গাড়ি ব্যবহার করছিলেন। দক্ষিণ সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিজে একটি কোটি টাকা দামের গাড়ি যেমন ব্যবহার করছিলেন, তেমনি স্ত্রীকেও ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন করপোরেশনের আরেকটি কোটি টাকা দামের গাড়ি। জ্বালানি তেল ব্যবহার করা হচ্ছিল ইচ্ছেমতো। এই অনিয়ম ঠেকানোর কথা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু দেখা গেল, মন্ত্রণালয়ের দুজন কর্মকর্তা নিয়ম ভেঙে সিটি করপোরেশনের গাড়ি ব্যবহার করেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একটি প্রকল্পের গাড়ি কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ব্যবহার নিয়ে প্রথম আলোতে প্রতিবেদন হয়েছিল গত বছরের ২৭ আগস্ট। ওই প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহার করছিলেন প্রকল্পটির পরিচালকের স্ত্রী ও সন্তান। আর প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহার করতে দেওয়া হয়েছিল মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের। তখন প্রথম আলোর প্রশ্নের জবাবে খেপে গিয়ে এক কর্মকর্তা বলেছিলেন, এ কাজ তো সবাই করে। শুধু তার নামে প্রতিবেদন কেন। উল্লেখ্য, কৃষি সম্প্রসারণের কার্যক্রম তদারকির কাজটি কৃষি মন্ত্রণালয়ের।

৬.

জেনেভা শহরে বিশাল বহরের গমনায়োজন নিয়ে প্রথম আলোর শেষের পাতায় প্রকাশিত গতকালের প্রতিবেদনের পাশাপাশি তিন নম্বর পাতায় প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদন দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য। খবরটি হলো, রেলপথ মন্ত্রণালয়–সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি মন্ত্রণালয়কে বিদেশ সফরের আয়োজন করতে বলেছে।

আগেই বলেছি, সংসদীয় কমিটির প্রধান কাজ কমিটির আওতাধীন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যালোচনা, অনিয়ম ও গুরুতর অভিযোগ তদন্ত করা এবং বিল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দেওয়া বা সুপারিশ করা। এ ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় থেকে বিশেষ কোনো সুবিধা নিলে, তা স্বার্থের সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিভিন্ন সময় মন্ত্রণালয়ের টাকায় সংসদীয় কমিটির বিদেশ সফর নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। পরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সংসদ সচিবালয়ের খরচে সংসদীয় কমিটির সদস্যদের বিদেশ সফরের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।

৭.

যে সরকারি কর্মকর্তা স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে জেনেভা যাচ্ছেন, তিনি এ যুক্তি তুলে ধরতে পারেন যে নিজের টাকায় গেলে অসুবিধা কি? উল্টো প্রশ্ন করা যায়, নিজের টাকায় গেলে সরকারি সফরের অংশ হওয়ার প্রয়োজন কি? সরকারি সফরে যাচ্ছেন সরকারের কর্মকর্তা। সেখানে তিনি সম্মেলনে অংশ নেবেন, রাতে হোটেলে বসে সম্মেলনের নথিপত্র পড়বেন, সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নেবেন; এটাই তো কাজ। তাঁকে যদি স্ত্রীকে নিয়ে ঘুরতে যেতে হয়, খেতে যেতে হয়, কেনাকাটা করতে যেতে হয়, তাহলে তিনি সরকারের কাজ কখন করবেন। আর যদি পড়াশোনার প্রয়োজন না থাকে, নথিপত্র না থাকে, তাহলে এত বিশাল বহর নিয়ে সম্মেলনটিতে যাওয়ার দরকার কী?

৮.

আমরা জানি, সম্মেলনের নামে এগুলো আসলে ভ্রমণ। বিদেশ সফরে সরকারি কর্মকর্তাদের যে পরিমাণ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা দিয়ে তাঁরা অনায়াসে স্বজনদের নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন, কেনাকাটা সারতে পারেন।

এ জন্য প্রকল্পের ভেতরে বিদেশ সফরের জন্য কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। কেউ বিদেশ যেতে চান খাল খনন দেখতে, কেউ খিচুড়ি রান্না শিখতে, কেউ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রশিক্ষণের নামে। কর্মকর্তারা অভিজ্ঞতা অর্জন শেষে সপ্তাহখানেক পরেই অনেক ক্ষেত্রে অবসরে যান। অনেক ক্ষেত্রে বদলি হয়ে যান। জনগণের পুরো টাকাই জলে যায়।

প্রকল্পে এভাবে বিদেশ সফরের নামে যাতে অপচয় না হয়, সে জন্য তদারকির দায়িত্ব পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু দেখা যায়, বিদেশ সফরের অনুমোদন যাতে পাওয়া যায়, সে জন্য ভাগ হিসেবে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দু-চারজন কর্মকর্তাকেও বিদেশ যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। এভাবে পুরো ব্যবস্থাটাই অনিয়মের অংশীদার হয়ে গেছে।

আশার কথা হলো, নানা ছুতোয় বিদেশ সফরে অবশেষে লাগাম টানছে সরকার। সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের বিষয়ে বুধবার অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছেন, এখন থেকে বিদেশ সফর আর নয়। যদি বিশেষ কারণে কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরে যতে হয়, তাহলেই যাবেন। অন্যথায় নয়। সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর কমানো হচ্ছে। কমানো হবে।’

শেষ করি সাবেক সচিব মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের বুধবারের একটি ফেসবুক পোস্টকে দিয়ে। তিনি লিখেছেন, শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা হলো, যেকোনো সরকারের সবচেয়ে বড় শত্রু ১. মোসায়েব জনপ্রতিনিধি, ২. ধান্দাবাজ ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা ও ৩. চাটুকার সাংবাদিক। শ্রীলঙ্কার সাধারণ মানুষ এখন এদের ওপর ক্ষোভ ঝাড়ছে ও শায়েস্তা করছে।

  • লেখক: প্রথম আলোর ডেপুটি হেড অব রিপোর্টিং

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন