পার্বত্য চট্টগ্রামে (রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি) চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, বমসহ ১১টি পাহাড়ি জনগোষ্ঠী সবাই পাড়ার আশপাশে প্রাকৃতিক বনাঞ্চল সংরক্ষণ করেন। এটিই শত বছরের পাড়াবন ঐতিহ্য। পুরোনো প্রতিটি পাড়ায় এখনো পাড়াবন (পাড়া রিজার্ভ) ঐতিহ্য রয়েছে। প্রবীণেরা বলেছেন ৪০ থেকে ৪৫ বছর আগে প্রতিটি পাহাড়ি পাড়ায় পাড়াবন ছিল। নানা কারণে ঐতিহ্য ধরে রাখতে না পেরে অনেক পাড়া-গ্রাম পানি ও বাস্তুসংস্থানের সংকটে টিকে থাকতে পারেনি। এখনো যেসব পাড়ায় পাড়াবন নেই, সেখানে উষ্ণ হয়ে ওঠা পরিবেশে পানির উৎস দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে ওই পাড়াগুলোর পানির সংকটে টিকে থাকা অসম্ভব হবে।

রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক নিখিল চাকমা বলেছেন, পাড়াবন ঐতিহ্যে প্রতিটি পাড়ায় ‘ক্ষুদ্রায়তনের জলবায়ু অঞ্চল’ গড়ে তোলা সম্ভব। ওই জলবায়ু অঞ্চলে পানিকাঠামো (ওয়াটারশেড), প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রতিবেশ (ইকোসিস্টেম) অটুট থাকে। এ জন্য পাহাড়ের জনবিন্যাস টিকিয়ে রাখতে হলে প্রাকৃতিক বনাঞ্চল সংরক্ষণের মাধ্যমে প্রতিটি পাড়ায় ‘ক্ষুদ্রায়তনের জলবায়ু অঞ্চল’ গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।

বান্দরবান সদর উপজেলার রেনিক্ষ্যংপাড়া, রোয়াংছড়ির মংয়ো খুমি পাড়া, রুমা রুমানাপাড়াসহ কিছু পাড়া ঘুরে দেখা গেছে পাড়াবনে গর্জন, গামার, চিবিট, বহেড়া, চাপালিশ, ডুমুর, গুটগুটিয়াসহ অসংখ্য প্রজাতির বিশাল বিশাল গাছ, গাছগুলোতে লতাগুল্ম। পাহাড়ের ঢালে, খাদে অনেক জায়গায় সূর্যের আলোও পৌঁছায় না। ছায়াঢাকা বনাঞ্চলে পাখির গান এবং ঝিরি ও ঝরনা পানিপ্রবাহের শব্দে মুখর। মংয়ো খুমি পাড়ার হয়রে খুমি, রিংকু খুমি জানালেন তাঁদের পাড়াটি দুই শতাধিক বছরের পুরোনো। ৪৭ একরের পাড়াবনটি পাড়ার চেয়েও প্রাচীন। প্রাকৃতিক বনাঞ্চলটি পাড়া স্থাপনের সময় থেকে তাঁদের পুরুষেরা রেখে দিয়েছেন। এখনো তাঁরা পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। রেনিক্ষ্যংপাড়ার কার্বারি (পাড়াপ্রধান) রিংরাউ ম্রো জানালেন বনাঞ্চলে ছায়ায় তাঁদের ঝিরি ও ঝরনাগুলোতে পানির প্রবাহ শুকনো মৌসুমে কিছুটা কমলেও সারা বছর পানির কোনো সমস্যা হয় না। অন্যদিকে কয়েক কিলোমিটার দূরে ম্রোলংপাড়ার পাড়াবাসী কোনো পাড়াবন না থাকায় বর্ষা মৌসুম ছাড়া বছরের অধিকাংশ সময় পানিসংকটে থাকে।

জায়গায় পাড়াবাসীর উদ্যোগে প্রাকৃতিক বনাঞ্চল সংরক্ষণই পাড়াবন। সর্বনিম্ন ২০ একর থেকে সর্বোচ্চ ৮০০ একরের পাড়াবনের মালিক সংশ্লিষ্ট পাড়াবাসী। মংয়ো খুমি পাড়ার ৭৮ বছরের প্রবীণ তাই অং খুমি বলেছেন মূলত বননির্ভর পাহাড়ি জনগোষ্ঠী ঘরবাড়ি নির্মাণের বাঁশ, গাছ সংগ্রহ, পানির উৎস ধরে রাখা, পরিবেশের ভারসাম্য, ঘূর্ণিঝড়সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাসস্থান রক্ষার জন্য পাড়াবন সংরক্ষণ করা হয়। প্রতিটি পাড়ার পাড়াবন রক্ষা কমিটির অনুমতি ছাড়া কেউ বন থেকে গাছ, বাঁশসহ কোনো সংগ্রহ ও বন্য প্রাণী শিকার, জলজ প্রাণী আহরণ করা যাবে না। এ নিয়ম কেউ ভঙ্গ করলে কঠোর শাস্তি ও জরিমানা করা হয়। শত বছর ধরে পাহাড়িরা এ ঐতিহ্য ধরে রেখে পাড়া বা জনবসতি টিকিয়ে রেখেছে।

বেসরকারি সংস্থার গবেষক অংশৈসিং মারমা বলেছেন পাড়াবনের ঐতিহ্য অনুসরণে সমতল অঞ্চলেও পতিত জমিতে তথাকথিত বনায়নের নামে বনবাগান না করে প্রাকৃতিক বনাঞ্চল সৃজন ও সংরক্ষণ করা সম্ভব। এমনকি অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হলে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন রোধে অবদান রাখতে পারে।

পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষায় পাড়াবন: পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও ভূমি অধিকার সংরক্ষণ আন্দোলনের জেলা সভাপতি জুয়ামলিয়ান আমলাই বলেছেন পাড়াবন হচ্ছে প্রাকৃতিক সংরক্ষিত বনাঞ্চল। একমাত্র প্রাকৃতিক বনাঞ্চলই পরিবেশ ও প্রতিবেশগত ভারসাম্য ধরে রাখতে পারে। কারণ, সেখানে প্রাকৃতিকভাবে ছোট-বড় শত শত প্রজাতির গাছ, বাঁশ ও লতাগুল্ম জন্মে। বারো মাসই ওই বনে কোনো না কোনো ফুল ও ফলে ভরপুর থাকে। এতে পাড়াবন হয়ে ওঠে হরেক রকম পাখি ও বন্য প্রাণীর আবাসস্থল। বনাঞ্চলে জলধারা বা ঝিরি-ঝরনাগুলো সারা বছরে পানি থাকে। জলজ প্রাণীর আধারে পরিণত হয়। এভাবে পরিবেশ ও প্রতিবেশের একটি পরিপূরক বাস্তুসংস্থান গড়ে ওঠে।

উদ্ভিদ ও প্রাণবৈচিত্র্যের আধার পাড়াবনগুলো: ইউএনডিপির গত আগস্টে প্রকাশিত পাড়াবনের উদ্ভিদ ও প্রাণবৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিটি পাড়াবন উদ্ভিদ ও প্রাণবৈচিত্র্যের আধার। প্রাকৃতিক বনাঞ্চল কমে যাওয়ায় পাড়াবনগুলো উদ্ভিদ সংরক্ষণাগার ও বন্য প্রাণীর আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। সেখানে ৫৫০ প্রজাতির উদ্ভিদ ও ৩৬৯ প্রজাতির বন্য প্রাণী পাওয়া গেছে। উদ্ভিদের মধ্যে ১০৮ পরিবারের ১৬৩ প্রজাতির বৃক্ষ, ২০৯টি ভেষজ প্রজাতি, ৯১টি গুল্ম, ৭৯ ধরনের লতাগাছ ও ১৩ ধরনের ইপিফাইট পাওয়া গেছে। বন্য প্রাণীর মধ্যে ৪০টি পরিবারের ১৯৯ প্রজাতির পাখি, ১৩৫ ধরনের কীটপতঙ্গ, ৬৪ প্রজাতির সরীসৃপ, ৫৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী ও ৩০ ধরনের উভচর প্রাণীসহ আরও অনেক প্রজাতি রয়েছে। বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীর মধ্যে ইন্ডিয়ান পেঙ্গুলিন, নীলগলা গিরগিটি, লেঙ্গুর, মায়াহরিণ, বড় আকারের কালো কাঠবিড়ালিসহ আরও অনেক প্রজাতি প্রাণী পাড়াবনে পাওয়া গেছে। একমাত্র প্রাকৃতিক বনাঞ্চলেই এ প্রাণী টিকে থাকে।

পাড়াবনের বর্তমান অবস্থা: ঐতিহ্যগত পাড়াবনকে গবেষকেরা গ্রামীণ সাধারণ বন (ভিলেজ কমন ফরেস্ট বা ভিসিএফ) নাম দিয়েছেন। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) ভিসিএফ নিয়ে এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভিসিএফ ব্যবস্থা একটি ভালো লোকজ চর্চা (বেস্ট প্র্যাকটিস)। তিন পার্বত্য জেলায় এ পর্যন্ত ৩৮৫টি পাড়ায় ভিসিএফ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রাঙামাটিতে ১৬২টি, বান্দরবানে ১৬১টি ও খাগড়াছড়িতে ৬২টি পাড়াবনে ৪৫ হাজার ৬ একর বনাঞ্চল রয়েছে। এ ছাড়া দুর্গম অনেক পাড়াবনের তালিকা পাওয়া যায়নি। পাড়াবনবিহীন পাহাড়ের পাড়াগুলো তীব্র পানির সংকটে পড়েছে। এ জন্য আরও অনেক পাড়াবাসী নতুন করে পাড়াবন সংরক্ষণ করছেন। ইউএনডিপি ওয়াটার শেড কো-ম্যানেজমেন্ট হিসেবে পাড়াবন ঐতিহ্য চর্চা ও শক্তিশালীকরণে সহযোগিতা দিচ্ছে বলে সংস্থাটির বান্দরবানের জেলা ব্যবস্থাপক খুশিরায় ত্রিপুরা জানিয়েছেন।

পাড়াবনের প্রতিবন্ধকতা: খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় ৭০০ একরের পাবলাখালী পাড়াবন দেখভালের দায়িত্বে থাকা ত্রিদীব দেওয়া বলেছেন, বহিরাগত লোকজন জুমচাষের জন্য বন কেটে ফেলে এবং গাছ-বাঁশ চুরি করে নিয়ে যায়। কিন্তু আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। লামা বদুঝিরিপাড়ার কার্বারি (পাড়াপ্রধান) মজন ত্রিপুরা জানিয়েছেন, ৭০ একরের পাড়াবনের প্রায় ১০ একরে এক কোম্পানি দখল করে পাড়াবন কেটে একাশিয়াগাছ রোপণ করেছে। এ ছাড়া মূল্যবান গাছ কাটার জন্য কাঠ পাচারকারী চক্র ও ভূমি দখলে ভূমিদস্যুরা সক্রিয় রয়েছে।

আরণ্যক ফাউন্ডেশনের গ্রিন লাইফ প্রকল্পের পরিচালক আবদুল কুদ্দুস বলেছেন, পাড়াবনের মূল সমস্যা আইনগত ভিত্তি। পার্বত্য শাসনবিধিতে (১৯০০ সাল) মৌজাবন সংরক্ষণের উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বন আইনে মৌজাবন ও পাড়াবনের কোনো কিছু উল্লেখ নেই। সামাজিক মালিকানায় পাড়াবন পরিচালনা করা হয়। কিন্তু আইনগতভাবে সরকারিভাবে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ নেই। এর ফলে বনদস্যুরা ছলেবলে-কৌশলে মূল্যবান গাছ কেটে নিয়ে গেলে ভূমিদস্যুরা দখল করলে পাড়াবাসী অসহায় হয়ে পড়ে। এ জন্য আইনগত ভিত্তি পরিষ্কার করা দরকার।

বন অধিদপ্তরের রাঙামাটির জুম নিয়ন্ত্রণ বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা জি এম মোহাম্মদ কবির বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাড়াবনগুলো দেশের পরিবেশ রক্ষায় অবদান রাখছে। এ বনাঞ্চল সরকারি খাসভূমিতে হওয়ায় বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। তারপরও পাড়াবনের সংশ্লিষ্টদের যেকোনো প্রয়োজনে বন বিভাগ সব সময় সহযোগিতা দিয়ে এসেছে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন