বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

জনস্বাস্থ্য আন্দোলন

রক্তদান বলতে বোঝায় স্বেচ্ছায় রক্ত দেওয়া এবং সেই রক্ত অন্য একজনের শরীরে ঢুকিয়ে দেওয়া বা ‘ট্রান্সফিউশন’ করা। এই দেওয়া-নেওয়ায় অর্থ বা স্বার্থ জড়িত থাকে না।

গত শতকের সত্তরের দশকে সন্ধানী যখন রক্তদান কর্মসূচি শুরু করেছিল, তখন রক্ত দেওয়া নিয়ে অনেক ভুল ধারণা ছিল। সামাজিক বাধাও ছিল। একজন সমর্থ মানুষ রক্ত দিলে তাঁর যে কোনো ক্ষতি হয় না, তা অনেকের জানা ছিল না।

রক্তদানকে আজ আর কোনো কঠিন কাজ বলে মনে হয় না। কিন্তু ৪৪ বছর আগে কাজটি এত সহজ ছিল না। কাজটিকে স্বাভাবিক পর্যায়ে আনতে সন্ধানী অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। সন্ধানীর কারণেই রক্তদান একটি সামাজিক আন্দোলনের চেহারা নেয়। বাংলাদেশে চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ে টেকসই কোনো আন্দোলন চোখে পড়ে না। এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম সন্ধানীর কর্মসূচি। সন্ধানীর উদ্যোগকে সাধারণ মানুষ, নাগরিক সমাজ ও পেশাজীবীরা সব সময় প্রশংসা করেছেন। তবে সন্ধানী ছাড়াও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, কোয়ান্টাম, বাঁধন, বাংলাদেশ পুলিশের রক্তদান কর্মসূচি আছে।

সন্ধানী মনে করে, পেশাদার রক্তদাতাদের রক্ত সব সময় নিরাপদ হয় না, তাই স্বেচ্ছায় রক্তদান বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। স্বেচ্ছায় রক্তদাতা বাড়াতে দেশের ২৬টি মেডিকেল কলেজে সন্ধানী শাখা খুলেছে। এ ছাড়া সন্ধানীর ৮টি ক্লাব আছে। আছে সন্ধানী কেন্দ্রীয় রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্র।

দৃষ্টিহীনে আলোদান

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা দেশে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সমস্যা। একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের চোখে অন্য মানুষের কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করলে মানুষ পৃথিবীর আলো দেখতে পায়—এই বিজ্ঞান দেশবাসীকে বুঝিয়েছে সন্ধানী। সন্ধানী গড়ে তুলেছে জাতীয় চক্ষুদান সমিতি। কর্নিয়া সংগ্রহ, কর্নিয়া সংরক্ষণ ও সরবরাহ এই সমিতির প্রধান কাজ। এই কাজে সন্ধানীর আছে নিজস্ব হাসপাতাল। এ রকম সংগঠন ও উদ্যোগ দেশে আর দেখা যায় না।

সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতি গড়ে ওঠার পেছনেও একটি ইতিহাস আছে। ১৯৮৪ সালে রংপুরের একটি দরিদ্র পরিবারের মেয়ে টুনটুনির চোখে কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (তৎকালীন পিজি হাসপাতালে)। এটাই দেশে প্রথম কর্নিয়া প্রতিস্থাপন। ওই সময় টুনটুনি প্রায় আড়াই মাস হাসপাতালে ভর্তি ছিল। তখন নিয়মিতভাবে টুনটুনির খবর সংবাদপত্রে ছাপা হতো। টুনটুনির চোখে কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের পুরো উদ্যোগ ছিল সন্ধানীর।

সন্ধানী এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষকে দৃষ্টি ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। কাজটি মোটেও সহজ নয়। মানুষের মৃত্যুর পর তার পরিবারের সদস্যরা শোকের পরিবেশে থাকেন। সেই পরিবেশে মৃত ব্যক্তির চক্ষু বা কর্নিয়া চাওয়া খুব চ্যালেঞ্জের বিষয়। সেই চ্যালেঞ্জ শুরু থেকে মোকাবিলা করে চলেছে সন্ধানী। তবে সন্ধানীর সঙ্গে এখন রোটারি ইন্টারন্যাশনালসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান যুক্ত হয়েছে। এ বিষয়ে চার হাজার মেডিকেল শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার একটি কর্মসূচিও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রয়েছে।

সন্ধানীর দেখানো পথে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ ও অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে রক্তদান ও চক্ষুদান বিষয়ে নানা উদ্যোগ নিতে দেখা গেছে। চার দশক আগে সন্ধানী প্রথম যে দিন রক্তদান কর্মসূচির আয়োজন করেছিল, সেই ২ নভেম্বরকে ‘জাতীয় স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদান দিবস’ হিসেবে প্রতিবছর উদ্‌যাপন করা হয়।

সন্ধানী শুধু রক্তদান বা চক্ষুদানের মধ্যে তাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখেনি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটি বিভিন্ন সময় টিকা কার্যক্রম, ড্রাগ ব্যাংক পরিচালনা, ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা, শীতবস্ত্র বিতরণ করেছে এবং এখনো করে।

সন্ধানীর কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদ ও সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতির সদস্য অধ্যাপক মনিলাল আইচ প্রথম আলোকে বলেন, সন্ধানী বৈজ্ঞানিক তথ্য দিয়ে মানুষকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে রক্তদানে ক্ষতি নেই, মৃত্যুর পরও চক্ষু দেওয়া যায়। দেশের জনস্বাস্থ্যের অগ্রযাত্রায় সন্ধানীর এই সামাজিক আন্দোলনের তাৎপর্য ও গুরুত্ব অনেক।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন