বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
সন্তানের সনদ পেতে মা-বাবার জন্মনিবন্ধন সনদ বাধ্যতামূলক করায় ভোগান্তি।

সুরমা বেগমের সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর। বললেন, সকালে এসেছেন। তখন পর্যন্ত কাজ শেষ করতে পারেননি। কাগজপত্র প্রস্তুত করতে তাঁকে একাধিকবার কম্পিউটার ও ফটোকপির দোকানে যেতে হয়েছে।

কেন জন্মনিবন্ধন লাগছে? জবাবে সুরমা বেগম বললেন, ছেলে হাসিব মিয়া মোহাম্মদপুর কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউট সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষা দেবে। বিদ্যালয় থেকে একটি একক নম্বর তৈরির জন্য জন্মনিবন্ধন সনদ চেয়েছে। ছেলের সনদ আগেই করা ছিল। তখন মা-বাবার সনদ লাগত না। তবে সনদে ছেলের নামের ইংরেজি বানানে ভুল থাকায় এখন সংশোধন করতে হচ্ছে। নতুন নিয়ম অনুসারে ছেলের সনদ সংশোধন করার আগে তাঁদেরও (মা-বাবা) সনদ তৈরি করতে হচ্ছে।

সুরমা বেগম জানান, এক ব্যক্তি দুই দিনের মধ্যে সনদ করে দেবেন বলে সকালে দেড় হাজার টাকা নিয়েছিলেন। তবে সেই ব্যক্তি কোনো রসিদ না দেওয়ায় টাকা ফেরত নিয়েছেন। যদিও সনদের জন্য সরকারিভাবে জনপ্রতি লাগে ৫০ টাকা।

সুরমা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সন্তানদের জন্মসনদ পেতে মা-বাবার জন্মসনদ জমা না দিতে হলে এত ভোগান্তিতে পড়তে হতো না।

সনদ পেতে ভোগান্তির এই পটভূমিতে আজ ৬ অক্টোবর পালিত হচ্ছে ‘জাতীয় জন্মনিবন্ধন দিবস’। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য, ‘সবার জন্য প্রয়োজন, জন্ম ও মৃত্যুর পরপরই নিবন্ধন’।

জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন আইন কার্যকর হয়েছে ২০০৬ সালের ৩ জুলাই। আইন অনুযায়ী, শিশুর জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে জন্মনিবন্ধন বাধ্যতামূলক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তিসহ ১৮টি ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন সনদ বাধ্যতামূলক।

সনদ সংশোধনে ভোগান্তি বেশি

গত রোববার বেলা ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত রাজধানীতে পরিবহন পুল ভবনে অবস্থিত জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ে ছিলেন এ প্রতিবেদক। মো. আরিফ তাঁর বড় ভাই মো. আমিনুরের জন্মসনদ সংশোধন করতে এসেছেন ধামরাই থেকে। তিনি প্রথম আলোকে জানান, আমিনুরের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও জন্মসনদে ভিন্ন ভিন্ন জন্ম তারিখ লেখা। উপজেলা ও রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ে একাধিকবার ঘুরেও কোনো সমাধান পাননি।


দালালদের দৌরাত্ম্য

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী জানান, দুই বছর আগে এক দালালকে ছয় হাজার টাকা দিয়ে নিজের, স্ত্রী ও দুই সন্তানের জন্মনিবন্ধন সনদ করেছিলেন। তবে পরে সন্তানের সনদ হারিয়ে যায়। ঢাকার একটি কার্যালয় থেকে ওই সনদের অনুলিপি এক হাজার টাকা দিয়ে দুই দিনের মধ্যেই পেয়েছেন। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সনদ পেতে ২০ দিন লাগে।

টাকা দিলে দ্রুত সনদ পাওয়ার বিষয়ে ডিএনসিসির আঞ্চলিক কার্যালয়ের (অঞ্চল ৫) সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ফিরোজ আলম বলেন, ‘আমাদের কানে কখনো কখনো সনদের জন্য বেশি টাকা নেওয়ার অভিযোগ আসে। তবে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শনাক্ত করা যায় না।’ কাউকে টাকা না দিয়ে সবাইকে নিয়ম মেনে সনদ সংগ্রহের পরামর্শ দেন তিনি।

মা-বাবার সনদের কারণে জটিলতা

জন্মনিবন্ধন রেজিস্ট্রার কার্যালয় সূত্র জানায়, পুরোনো সার্ভারে একাধিক সনদ নেওয়ার সুযোগ ছিল। ২০১৯ সালে বার্থ-ডেথ রেজিস্ট্রেশন ইনফরমেশন সিস্টেম (বিডিআরআইএস) নামে সফটওয়্যার চালু হয়েছে। এখন একাধিক সনদ নেওয়া যায় না। তবে সফটওয়্যারটির সুবিধা শতভাগ চালু হয়নি। ফলে এক ব্যক্তির একাধিক সনদকে ত্রুটিযুক্ত দেখায় না। এতে দেশের জনসংখ্যার চেয়ে জন্মনিবন্ধনের সংখ্যা বেশি দেখায়। গত ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জন্মনিবন্ধন হয়েছে ১৮ কোটি ৪৯ লাখ ৩৯ হাজার ৪২৬টি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১৮ সালের জরিপ অনুসারে দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৪৬ লাখ।

ডেপুটি রেজিস্ট্রার জেনারেল মো. ওসমান ভুইয়া প্রথম আলোকে বলেন, জন্মনিবন্ধনসংক্রান্ত জটিলতা শনাক্তে রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় থেকে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি সন্তানের সঙ্গে মা–বাবার জন্মনিবন্ধন সনদ বাধ্যতামূলক করাসহ আরও কিছু জটিলতা চিহ্নিত করেছে। জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন বিধিমালা ২০১৮ সংশোধনের মাধ্যমে জটিলতা দূর করা হবে। জনবলের সংকট থাকায় সমস্যা সমাধান করতে সময় বেশি লেগে যায় বলে জানান তিনি।

সনদপ্রাপ্তি সহজ করতে হবে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বলেন, জন্ম, মৃত্যু ও স্থানান্তর—এই তিনটি উপাত্ত নিয়ে জনগণের সেবার জন্য বয়স অনুপাতে চাহিদাভিত্তিক পরিকল্পনা নেওয়া যায়। জন্মনিবন্ধন সনদ থাকলে ভুয়া বয়সের সনদ দেখিয়ে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করাসহ নানা কাজ করা যাবে। শতভাগ লোককে জন্মনিবন্ধনের আওতায় আনতে সনদপ্রাপ্তিকে সহজ ও ঝামেলামুক্ত করতে হবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন