default-image

মন্ত্রণালয় টাকা দিলে কাজ হবে, না দিলে হবে না—জলাবদ্ধতা নিরসনে এই হচ্ছে ঢাকা ওয়াসার বর্তমান অবস্থান। অথচ স্বাবলম্বী ও লাভজনক একটি সংস্থা ওয়াসা। বছর বছর এই সংস্থার লাভ বেড়েছে। কিন্তু জলাবদ্ধতা নিরসনে সংস্থাটির নিজস্ব বরাদ্দের পরিমাণ কমছে। কমতে কমতে এখন এটি শূন্যের কোঠায় পৌঁছেছে।

সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে ওয়াসা এখন মন্ত্রণালয়ের মুখাপেক্ষী। নানা রকম প্রকল্প ও টাকার আবদার থাকলেও নিজ পকেট থেকে এক টাকা খসাতেও রাজি না। 

একসময় ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনের দায়িত্ব ছিল জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কাঁধে। ১৯৮৯ সালে এই দায়িত্ব পায় ঢাকা ওয়াসা। ফলে নগরবাসীকে পানি সরবরাহের পাশাপাশি বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনেরও মূল দায়িত্ব এই সংস্থার।

>মন্ত্রণালয়ই ভরসা
খাল–নালা রক্ষণাবেক্ষণে আয় নেই
তাই অর্থ বরাদ্দে আগ্রহ নেই

ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রায় ৩৬০ কিলোমিটার পানিনিষ্কাশনের বড় নালা তৈরি করেছে সংস্থাটি। এ ছাড়া সংস্থাটির আওতায় আছে ১০ কিলোমিটার বক্স কালভার্ট ও মোট ৭৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ২৬টি খাল। এগুলো রক্ষণাবেক্ষণ, প্রয়োজনমতো উন্নয়ন ও গবেষণার জন্য এই সংস্থার আছে দুটি সার্কেল ও একটি বিভাগ। এগুলো হচ্ছে ড্রেনেজ (পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ) সার্কেল, ড্রেনেজ গবেষণা ও উন্নয়ন সার্কেল এবং পরিকল্পনা ও উন্নয়ন (ড্রেনেজ) বিভাগ। 

মাঠপর্যায়ে জলাবদ্ধতা নিরসনের মূল কাজটি করে পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ সার্কেল। এই সার্কেলের দায়িত্বশীল দুজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত দুই অর্থবছরে (২০১৭–১৮ ও ২০১৮–১৯ অর্থবছর) এই সার্কেলকে এক টাকাও বরাদ্দ দেয়নি সংস্থাটি। এমনকি গত অর্থবছরে লিখিতভাবে পৌনে তিন কোটি টাকা দিতে চেয়েও দেয়নি। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই সার্কেলের একজন কর্মকর্তা বলেন, ওয়াসার সবচেয়ে অবহেলিত একটি অঙ্গ হচ্ছে ড্রেনেজ (পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ) সার্কেল। এই সার্কেলে কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বেতন–ভাতা ছাড়া অন্য কোনো বরাদ্দ নেই। তাই মন্ত্রণালয় থেকে টাকা পেলে কাজ থাকে, আর টাকা না দিলে কিছু করারও থাকে না। ওয়াসা লাভজনক সংস্থা হওয়ার পরও এমন অবস্থানের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা ভালো বলতে পারবেন।

এই সার্কেলের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ওয়াসার লাভ যখন কম ছিল, তখনো প্রতিবছর পৌনে ৩ কোটি থেকে ১১ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া যেত। কিন্তু এখন লাভের অঙ্ক আগের চেয়ে বেড়েছে। এতে বরাদ্দ না বেড়ে উল্টো শূন্য হয়েছে।

ওয়াসার সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪–১৫ অর্থবছরে সংস্থাটির মোট লাভ ছিল ১০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। ২০১৫–১৬ অর্থবছরে লাভ হয়েছে ১৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা। আর ২০১৬–১৭ অর্থবছরে ২২ কোটি ৬০ লাখ এবং ২০১৭–১৮ অর্থবছরে লাভ হয়েছে ২৮ কোটি ২০ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতিবছরই লাভ বেড়েছে। 

নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান প্রথম আলোকে বলেন, লাভের অঙ্ক বাড়ায় ওয়াসার উচিত ছিল জলাবদ্ধতার নিরসনে বরাদ্দ বাড়ানো। কিন্তু তা হয়নি। তাঁর মতে, যেসব নালা ও খাল আছে, সেগুলো ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ করলে অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা হতো না। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের চেয়ে নতুন কিছু নির্মাণে ওয়াসার আগ্রহ বেশি। কারণ, রক্ষণাবেক্ষণে টাকার প্রবাহ কম।

এমন অবস্থায় ঢাকার পানি সরানোর জন্য প্রতি অর্থবছরেই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কাছে টাকা চেয়ে আবেদন করছে ঢাকা ওয়াসা। ২০১৭–১৮ অর্থবছরের শেষ দিকে চেয়েছিল ৬০ কোটি টাকা। ওই সময় ঢাকায় জলাবদ্ধতার তীব্রতাও বেশি ছিল। পরে ওই অর্থবছরের শেষ দিকে ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয় মন্ত্রণালয়। ওয়াসা বলছে, ওই টাকায় ১৯টি খালের (২০–২৫ কিলোমিটার) অংশ খনন ও পরিষ্কার, ৮ দশমিক ৮০ কিলোমিটার বক্স কালভার্ট ও ২৮০ কিলোমিটার পানিনিষ্কাশন নালা পরিষ্কার করা হয়েছে। এর বাইরে নালায় বৃষ্টির পানি যাওয়ার জন্য ১ হাজার ৩০০টি ক্যাচপিট (সড়কের পাশে বৃষ্টির পানি প্রবেশের পথ) বসানো হয়।

২০১৮–১৯ অর্থবছরেও ৪০ কোটি টাকা চেয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছিল ঢাকা ওয়াসা। আবেদনটি বিবেচনাধীন থাকা অবস্থাতেই ৪০ কোটি টাকার দরপত্র আহ্বান করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশও দেওয়া হয়। সেই কাজগুলো এখনো চলছে। ওই অর্থবছরে মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ আসে মাত্র ৫ কোটি টাকা। এরপর চলতি অর্থবছরে আরও ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে মন্ত্রণালয়। 

ওয়াসার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গত অর্থবছরে ৩৫ কোটি টাকা ঘাটতি ছিল। এই ঘাটতি সমন্বয় ও আরও কাজের জন্য মন্ত্রণালয় থেকে এই অর্থবছরে আরও ৫০ কোটি টাকা চাওয়া হবে বলে আলোচনা চলছে।

গত দুই অর্থবছরে ড্রেনেজ রক্ষণাবেক্ষণে কোনো বরাদ্দ না দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, আগে ওয়াসা থেকে সামান্য কিছু টাকা দেওয়া হতো। এখন মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া অর্থের মাধ্যমে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করা হয়। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘ড্রেনেজ থেকে আমাদের কোনো আয় নেই।’

তবে রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ওয়াসার বরাদ্দ না রাখার বিষয়টিকে অবহেলা হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সহসভাপতি অধ্যাপক আকতার মাহমুদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, শুধু পানি সরবরাহের দায়িত্ব নিলে হবে না, ড্রেনেজের দায়িত্বও ওয়াসার। 

এদিকে রক্ষণাবেক্ষণে ওয়াসার নিজস্ব বরাদ্দ কমার পাশাপাশি প্রশ্ন উঠেছে ওয়াসার তত্ত্বাবধানে থাকা জলাবদ্ধতা নিরসনসংক্রান্ত দুটি প্রকল্প নিয়েও। ২০১৭ সালে ঢাকায় তীব্র জলাবদ্ধতার পর সে সময়ের স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন আশ্বাস দিয়েছিলেন, আগামী বছর থেকে আর এমন অবস্থা হবে না। এরপর ২০১৮ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রকল্প দুটির অনুমোদন দেয়। ‘ঢাকা মহানগরের ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও খাল উন্নয়ন’ এবং ‘হাজারীবাগ, বাইশটেকী, কুর্মিটোলা, মান্ডা ও বেগুনবাড়ি খালে ভূমি অধিগ্রহণ এবং খনন/পুনঃখনন’ নামে প্রকল্প দুটির বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ১ হাজার ১৫৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। গত জুন পর্যন্ত প্রকল্প দুটির অগ্রগতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক বছরে এর একটি প্রকল্পের অগ্রগতি ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ, আর ১৪ মাসে অন্য প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র দেড় শতাংশ।

প্রকল্পের ধীরগতি সম্পর্কে তাকসিম এ খান বলেন, জমি অধিগ্রহণ–সংক্রান্ত জটিলতার কারণে প্রকল্পের কাজ শুরু করতে বিলম্ব হয়েছে। এখন পুরোদমে কাজ চলছে। 

অধ্যাপক আকতার মাহমুদ অবশ্য বলেছেন, প্রতিবছর শুধু খাল খনন করলে জলাবদ্ধতা নিরসন হবে না। ওয়াসা পয়োনিষ্কাশন মহাপরিকল্পনা করলেও সেটি বাস্তবায়ন করে না। এ অবস্থায় পরিস্থিতি বদলাবে না।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0