বার্ষিক প্রতিবেদনে বলেছে ইউজিসি

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ

বিজ্ঞাপন

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ এবং তাঁদের গুণগত মান আশানুরূপ নয় বলে উল্লেখ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। ইউজিসি বলেছে, উচ্চশিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটলেও শিক্ষার প্রত্যাশিত মান নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।
ইউজিসির সর্বশেষ (৪০তম) বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আয় বাড়ানোর সম্ভাব্য উপায় হিসেবে শিক্ষার্থী বেতন ও আবাসিক হলে সিট ভাড়া বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনটি গতকাল বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের কাছে হস্তান্তর করেছে ইউজিসি।
স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর পড়ানো হয়—জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন এমন সরকারি কলেজগুলোকে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নেওয়ার উদ্যোগের মধ্যে ইউজিসি এই প্রতিবেদন দিল। এই প্রতিবেদনেও এ বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছে। তবে ইউজিসি এ বিষয়ে তদারকি জোরদার করতে বলেছে। স্নাতক (সম্মান) পড়ানো সরকারি কলেজগুলোকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নেওয়ার ব্যাপারে গত ৩১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশনা দেন। সম্প্রতি এক সভায় উপাচার্যরাও এর পক্ষে মত দেন।
দেশে স্নাতক পর্যায়ের মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৪৮ শতাংশই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে পড়াশোনা করছেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সরকারি-বেসরকারি কলেজের সংখ্যা ২ হাজার ১৫৪টি। এগুলোতে শিক্ষার্থী রয়েছেন প্রায় ২১ লাখ। এর মধ্যে ২৭৯টি সরকারি কলেজে শিক্ষার্থী ১৩ লাখের বেশি। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে স্নাতক (সম্মান) পড়ানো হয় ৫৫৭টি কলেজে।
প্রতিবেদনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজটের কথাও বলা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিপ্রাপ্ত স্নাতকদের গুণগত মান আশানুরূপ নয়। কতিপয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজ থেকে পাস করা স্নাতকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ।
শিক্ষার্থী বেতন বাড়ানোর আহ্বান: প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে নিজস্ব আয় বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। আয় বাড়ানোর সম্ভাব্য উপায় হচ্ছে শিক্ষার্থী বেতন ও আবাসিক হলে সিট ভাড়া বৃদ্ধি। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দ্বিধাবোধ করে। কিন্তু শিক্ষার্থী বেতন ও হলে সিট ভাড়া বৃদ্ধি একটি যৌক্তিক প্রস্তাব। প্রতিবেদনে এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। ইউজিসি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জবাবদিহি বাড়ানোর কথাও বলেছে।
বর্তমানে ৩৭টি স্বায়ত্তশাসিত ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৮০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্প্রতি কিছু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক বিষয়কে কেন্দ্র করে শিক্ষক অসন্তোষের ফলে শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত ভর্তি পরীক্ষাকে ত্রুটিপূর্ণ উল্লেখ করে বিদ্যমান ভর্তি পরীক্ষার বিকল্প উদ্ভাবন করে ভর্তি-প্রক্রিয়ায় আমূল সংস্কারের সুপারিশ করেছে।
তিন দক্ষতা বাড়ানোর সুপারিশ: প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের ইংরেজি ভাষা, লিখিত ও মৌখিক নিজস্ব চিন্তা উপস্থাপন এবং তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক দক্ষতা বাড়াতে বলা হয়েছে। এ জন্য শিক্ষাক্রমে প্রয়োজনীয় বিষয় সংযোজন করতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে বার্ষিক পরীক্ষা পদ্ধতি ও কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিস্টার পদ্ধতি রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি সমন্বিত পদ্ধতি ও সিলেবাসে সামঞ্জস্য আনতে বলা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা যাতে ‘ক্রেডিট’ স্থানান্তরের মাধ্যমে এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেন। এ ছাড়া চার বছরমেয়াদি স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি যেহেতু ‘প্রান্তিক ডিগ্রি’ গণ্য হয়, সে জন্য স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বাছাই করা মেধাবী স্নাতকদের ভর্তির পরামর্শ দিয়েছে ইউজিসি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য, সহ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ নেই। এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
ইউজিসি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ধরনের ফি সহনীয় রাখার সুপারিশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই প্রতিবছর টিউশন ও ভর্তি ফিসহ অন্যান্য ফি বৃদ্ধি করে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান যাচাইয়ের জন্য গত বছরের মতো এবারও ‘অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল’ গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া যেসব জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় নেই, সেসব জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ওপর প্রতিবেদনে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষকতার পেশায় আকৃষ্ট করতে আকর্ষণীয় বেতনকাঠামো করার জন্যও সরকারের কাছে সুপারিশ করেছে ইউজিসি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা আশা করব সরকার এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করবে। এ জন্য ইউজিসিকে শুধু সুপারিশকারী হিসেবে না রেখে ক্ষমতা দেওয়া উচিত।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন