সেনাবাহিনীতে অভ্যুত্থানচেষ্টা ও সরকার উৎখাতের ব্যর্থ চেষ্টার পর চাকরিচ্যুত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক ও প্রবাসী ব্যবসায়ী ইশরাক আহমেদের খোঁজ মেলেনি সাড়ে তিন বছরেও। এ নিয়ে এখন আর কেউ কিছু বলতেই পারছেন না। তাঁদের গ্রেপ্তারে পুলিশের আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারপোলের সহায়তা চাওয়া হয়েছিল।
তবে এ ঘটনায় জড়িত একজন মেজর জেনারেল ও একজন ব্রিগেডিয়ারসহ ১৫ সেনা কর্মকর্তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। বিচারে তাঁদের কয়েকজনকে চাকরিচ্যুত ও সাজা দেওয়া হয়। একজন মেজর জেনারেলকে অবসর দেওয়া হয়েছে এবং একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেলকে চাকরিতে বহাল রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত অবসরপ্রাপ্ত দুই সেনা কর্মকর্তাকে সাজা দিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানোর পর একজন সাজা শেষে মুক্তি পান।
সূত্র জানায়, এর আগে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভায় ব্যর্থ অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল। ওই সভার সিদ্ধান্তের পর পলাতক দুজনকে গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলের সহায়তা চাওয়া হয়। ওই সময় কমিটির পক্ষ থেকে এ ঘটনা নিয়ে বেসামরিক আদালতে আইনি কার্যক্রম পরিচালনার কথাও বলা হয়েছিল। কিন্তু বেসামরিক আদালতে এ নিয়ে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
জানতে চাইলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতি সুবিদ আলী ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘বর্তমানে কমিটিতে এ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না, তা আমার মনে নেই। এর আগে কমিটিতে কী হয়েছিল, তা বলতে পারব না।’
সম্প্রতি উইকিলিকসের মাধ্যমে ফাঁস হওয়া আরবি ভাষায় সৌদি কূটনৈতিক বার্তায় জানা গেছে, সৌদি দূতাবাস রিয়াদে তাদের মন্ত্রণালয়কে ওই ঘটনার পর যে বিবরণ জানিয়েছিল, তাতে বলা হয়েছে অভ্যুত্থানকারীরা তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন সেনাবাহিনীর প্রধানসহ কয়েকজন উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করে সরকার উৎখাতের পরিকল্পনা করেছিলেন। এর ‘সমন্বয়কারীর’ দায়িত্বে ছিলেন বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত লে. কর্নেল শরিফুল হক ডালিম। তবে সৌদি দূতাবাসের মতে, ঘটনাটি কার্যত ছিল ‘অত্যন্ত সীমিত’। কিন্তু সরকার বিষয়টিকে তার পক্ষে প্রচারণার কাজে লাগায়।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির কার্যপত্রে দেখা গেছে, জড়িত ব্যক্তিরা যাতে পালিয়ে যেতে না পারেন, সে জন্য নজরদারি বাড়ানো হয়। তাঁদের ধরতে দেশের সব সেনানিবাস ও বন্দরে ছবিসহ বিস্তারিত তথ্য পাঠায় সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনীর একটি দল এ বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে বলে কমিটিকে জানানো হয়।
পলাতক দুই ব্যক্তির অবস্থান সম্পর্কে ঢাকায় ইন্টারপোলের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোর (এনসিবি) দায়িত্বরত এআইজি মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, এ ব্যাপারে তাঁদের কাছে কোনো তথ্য নেই। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তাও এ ব্যাপারে কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, পলাতক মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক সম্পর্কে তাঁরা এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য পাননি। তবে ইশরাক ওই ঘটনার পর বেশ কিছুদিন থাইল্যান্ডে ছিলেন; এখন যুক্তরাজ্যে আছেন বলে তাঁরা ধারণা করছেন।
অভ্যুত্থানচেষ্টা নিয়ে ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি ঢাকায় সেনা সদরে এক সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ‘সেনাবাহিনীর সাবেক ও বর্তমান কিছু সদস্য দেশের গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত এবং সেনাবাহিনীতে অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেছিল। গত বছরের (২০১১) ১৩ ডিসেম্বর এ পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যায়। সেনাবাহিনীর মধ্যম সারির কয়েকজন কর্মকর্তা এর সঙ্গে জড়িত। তাঁদের মধ্যে তিনজনের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট তথ্য পায় সেনাবাহিনী। এ তথ্যের ভিত্তিতে অবসরপ্রাপ্ত দুই সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। আর চাকরিরত একজন কর্মকর্তা সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে যান। অভ্যুত্থান চেষ্টার ঘটনা তদন্তে ওই বছরের ২৮ ডিসেম্বর একটি তদন্ত আদালত গঠন করা হয়।’ এরপর ওই ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর সৈয়দ মো. জিয়াউল হককে ধরিয়ে দিতে ছবিসহ সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হয়। একই সঙ্গে দেশের সব সেনানিবাস ও বন্দরে ছবিসহ বিস্তারিত তথ্য পাঠানো হয়।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, পলাতক জিয়ার সঙ্গে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহ্রীরের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের নিশ্চিত তথ্য পেয়েছিলেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। অভ্যুত্থানচেষ্টার কিছুদিন আগে সেনানিবাস এলাকায় হিযবুত তাহ্রীর একটি প্রচারপত্র বিতরণ করে। এতে শেখ হাসিনা সরকারকে অপসারণের আহ্বান জানানো হয়েছিল।
সূত্র জানায়, এ ঘটনা তদন্তে সেনা প্রশাসন ঢাকা ও ঢাকার বাইরে প্রথমে পাঁচটি ও পরে আরও ছয়টিসহ মোট ১১টি তদন্ত আদালত গঠন করে। তদন্ত আদালত ৭৪ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পাওয়া অভিযোগ তদন্ত করেন। আদালতের সুপারিশের পর ১৫ কর্মকর্তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। তাঁদের একজন মেজর জেনারেল ও একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ছিলেন। ১৫ কর্মকর্তার মধ্যে ৮ জন বিভিন্ন সময় ফৌজদারি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। আদালতের রায়ে বেশ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তাকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। অবসরপ্রাপ্ত দুই কর্মকর্তা এহসান ইউসুফ ও এ কে এম জাকির হোসেনকে আটকের আড়াই বছর পর গত ২৩ এপ্রিল সাজা দিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। দুই কর্মকর্তার মধ্যে জাকির হোসেন কিছুদিন আগে সাজা খেটে মুক্তি পান। আর এহসান ইউসুফ এখনো কারাগারেই আছেন।
তবে সাজাপ্রাপ্ত সব কর্মকর্তার ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। এ ব্যাপারে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে লিখিত তথ্য চাওয়া হলেও তারা কোনো তথ্য দেয়নি।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0