default-image

করোনাকালে জীবনের ভোলটাই পাল্টে গেল। কাজের লোক না থাকায় প্রথম প্রথম সমস্যা হতো। কিন্তু ঠেলার নাম বাবাজি। আসলে প্রতিটা কাজেরই একটা রেসিপি আছে। সেটা খুঁজে বের করাটাই আসল। ধরুন মেঝে মুছবেন। একটা মপ নেন। লাইজল মেশানো পানিতে মপটা ভেজান। এরপর সোজা হয়ে দাঁড়ান। ঠিকঠাক সোজা হয়ে না দাঁড়ালে কিন্তু পিঠ বা কোমরের ব্যথায় কাত হয়ে পড়ে থাকতে হবে কয়েকটা দিন। ক্রিকেট ব্যাট ধরার মতো করে এবার ডান্ডাটা দুই হাতে ধরুন। এরপর ডান দিকে মেঝেতে লম্বালম্বি করে একটা টান দিন। এবার হাত ঘুরিয়ে আবার বাঁ দিকে লম্বালম্বি করে টান দিন। মাত্র ১৫ মিনিটের কাজ।

কাপড় ধোয়ারও সহজ পদ্ধতি আবিষ্কার করেছি। আধা বালতি গরম পানি নিন। তিন চামচ গুঁড়া সাবান মেশান। কাপড় ভিজিয়ে রাখুন এক ঘণ্টা। অফিস বন্ধ। ফলে চিন্তা নেই। বাসায় পরার কাপড়টুকুই যথেষ্ট। ঘণ্টাখানেক পর লুঙ্গি আর তোয়ালে নিয়ে বাথরুমে ঢুকে পড়ুন। দরজাটা ভালো করে লাগান। লুঙ্গি পরে থাকলে কাছা মেরে নিন। এরপর বালতির ভেতরে পা দিয়ে দুই মিনিট কাপড় খচাখচি করুন। ধোয়া শেষ। বালতিতে পরিষ্কার পানি ঢেলে কাপড় ধুয়ে হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রাখুন। কাপড় চিপাচিপির বাকি কাজটা অন্য কাউকে ভাগ করে দিন। এবার শাওয়ার ছেড়ে আরামে গোসল সেরে বেরিয়ে আসুন।

বিজ্ঞাপন

মাসের পর মাস কোর্টে যাই না। আয়-রোজগার বন্ধ। জমানো টাকাও প্রায় শেষ। খরচ কমাতে পল্টনের চেম্বার ছেড়ে দিলাম। অনেকেই শুনি ভার্চ্যুয়াল কোর্টে মামলা করেছেন। আমার কাছে একটাও আসেনি। ৩ মাস ১৭ দিন পর একজন ফোন করে বললেন, একটা মামলা করে দিতে হবে। শুয়ে ছিলাম। তড়াক করে উঠে বসলাম। এত দিন পর টাকার গন্ধ পেয়েছি। কিসের মামলা? বললেন, রিট। বাঁকা হয়ে বসে ছিলাম। শিরদাঁড়া সোজা হয়ে গেল। একটু বেশি টাকার গন্ধ মনে হচ্ছে। ঘটনাটা খুলে বললেন। বুঝলাম, মামলা জমবে। মক্কেল বললেন, তাহলে আসি?

করোনার কারণে এত দিন বের হইনি। এবার নিঃসংকোচে বললাম, আসুন, আসুন।

স্বাস্থ্যবিধি মেনে রীতিমতো যুদ্ধসাজ নিলাম। ডাবল মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস, চশমা, পকেটে স্যানিটাইজার। আর অন্তরে বউয়ের উপদেশ। যত বর্ম পরেছি, করোনাভাইরাসের সাধ্য কি আমাকে চিনতে পারে? মানুষেরও সাধ্য তো আরও দূরে।

একটা অটোরিকশায় চেপে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সামনে গিয়ে নামলাম। আহা, কত দিন পর! সামনে তাকিয়ে দেখি আমারই মতো যুদ্ধসাজে একজন দাঁড়িয়ে। আমার দিকে তাকিয়ে আছেন জিজ্ঞাসু চোখে। আমি নির্বাক। একবার মনে হয় চিনি চিনি, আরেকবার মনে হয় চিনি না। নেপথ্যে যেন বাজে হেমন্তের বিষাদভরা গান, ‘আজ দুজনার দুটি পথ ওগো দুটি দিকে গেছে বেঁকে।’ উত্তম কুমার যেমন হঠাৎ স্মৃতি ফিরে পেয়েছিলেন। যুদ্ধসাজ ভেদ করে আমরা দুজনও যেন হঠাৎ চিনতে পারলাম পরস্পরকে। আরে, এ তো আমাদের চিরচেনা সহকর্মী। দুজনে একসঙ্গে কোরাসে বলে উঠলাম, ‘কেমন আছেন, ভাই?’

তিন ফুট দূরত্ব বজায় রেখে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলাম। এই কয়েক মাসে বারের অনেক পরিবর্তন এসেছে। সম্পাদকের রুমের সামনে বিশাল ডিসপ্লে। সেখানে থমকে দাঁড়াই। দেখতে পাই, একের পর এক পরিচিত নাম, পরিচিত ছবি আসছে ডিসপ্লেজুড়ে। আমার একটু সময় লাগে বুঝতে। যেসব আইনজীবী গত কয়েক মাসে করোনায় সবার অগোচরে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন, তাঁদের নাম। প্রথামাফিক বারে তাঁদের কারও জানাজা হয়নি। কেউ ফুল দেয়নি মরদেহে। আপনজন হয়তো শব্দ করে কাঁদেওনি, পাছে প্রতিবেশীরা একঘরে করে দেয়।

এবার ভালো করে তাকিয়ে দেখি, ডিসপ্লে বোর্ডের ওপর লেখা ‘শোকবার্তা’। তাঁদের সঙ্গে আর কখনো দেখা হবে না। মনে মনে বলি, ‘হে বন্ধু, বিদায়!’ চোখ দুটো ভিজে আসে। চেম্বারের দিকে যাওয়ার পথে আমার গতি কমে আসে।

লেখক, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন