default-image

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) সম্প্রতি ঢাকার পথে বিক্রি হওয়া খাবারের ১৪৯টি নমুনা পরীক্ষা করে ভয়জাগানো তথ্য পেয়েছে। ঝালমুড়ি, পানিপুরি, ভেলপুরি, চটপটি, নুডলস, ফলের রস, তেঁতুল-কাঁচাকলা-জলপাই-ধনেপাতা ও মসলা দিয়ে তৈরি মিশ্র ফলের ভর্তা, কতবেলভর্তা ও জলপাইভর্তা পরীক্ষা করেছে সংস্থাটি। দেখা গেছে, এসব খাবারের মধ্যে লেবু ও তেঁতুলের শরবত ছাড়া সব কটিই বিপজ্জনক মাত্রায় টোটাল কলিফর্ম ও ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। এই ব্যাকটেরিয়া মূলত প্রাণীদের মলমূত্রে থাকে।

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে পথের খাবারের এই নিম্নমান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনই পরিস্থিতিতে আজ পালিত হচ্ছে জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘টেকসই উন্নয়ন-সমৃদ্ধ দেশ: নিরাপদ খাদ্যের বাংলাদেশ’।

বিএআরসির গবেষণায় পথের খাবারের নমুনার প্রতি গ্রামে ১ হাজার ১০০টির ওপরে টোটাল কলিফর্ম ও ই-কোলাই পাওয়া গেছে। অথচ প্রতি গ্রাম খাবারে ৩০টির ওপরে এই ব্যাকটেরিয়া থাকা বিপজ্জনক। খাবারের সঙ্গে মানুষের শরীরে তা প্রবেশ করলে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করবে। পানির মধ্যে একটি কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া থাকা আরও বেশি বিপজ্জনক। ডায়রিয়া, কলেরা থেকে শুরু করে নানা ধরনের রোগবালাই এর জন্য তৈরি হয়। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের পুষ্টিহীনতা ও অসুস্থতার অন্যতম কারণ হচ্ছে এসব রোগ।

পথের খাবার তৈরি থেকে খাওয়া পর্যন্ত পুরো বিষয়টি অস্বাস্থ্যকর। প্রতিটি পর্যায়ে ব্যাকটেরিয়াসহ নানা জীবাণু প্রবেশের সুযোগ রয়েছে।
মনিরুল ইসলাম, বিএআরসির খাদ্য ও পুষ্টি বিভাগের প্রধান
বিজ্ঞাপন

খাবারের নমুনাগুলো খাদ্যমান পরীক্ষার আন্তর্জাতিক সংস্থা এসজিএসের ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়েছে। নেওয়া হয়েছে যাত্রাবাড়ী, খিলগাঁও, নিউমার্কেট, সদরঘাট, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল, ধানমন্ডি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, গাবতলী, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, গুলিস্তান, ভাষানটেক, বসিলা ও মিটফোর্ড এলাকা থেকে।

বিএআরসির গবেষণাটির নেতৃত্ব দিয়েছেন খাদ্য ও পুষ্টি বিভাগের প্রধান মনিরুল ইসলাম। গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ পথের খাবার খান। রাস্তার পাশে ১৪০ ধরনের খাবার বিক্রি হয়। খাবারে মূলত পানি থেকেই ব্যাকটেরিয়া যাচ্ছে। খাবার তৈরি, পরিবেশনের জন্য ব্যবহৃত পাত্র এবং আশপাশের ধুলাবালু থেকেও ব্যাকটেরিয়া খাবারে যায়। যায় বিক্রেতার হাত থেকেও।

মনিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, পথের খাবার তৈরি থেকে খাওয়া পর্যন্ত পুরো বিষয়টি অস্বাস্থ্যকর। প্রতিটি পর্যায়ে ব্যাকটেরিয়াসহ নানা জীবাণু প্রবেশের সুযোগ রয়েছে।

ঢাকা সিটি করপোরেশন উত্তর ও দক্ষিণের কার্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব খাবার দোকানের নিবন্ধন বা অনুমোদন দেওয়ার ব্যবস্থা নেই। তাদের কোনো তালিকাও নেই এই দুই সংস্থা বা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কাছে। খাবারের মান তদারকিও সরকারি কোনো সংস্থা করে না।

খাদ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক দেশেই স্ট্রিট ফুড বা পথের খাবার অত্যন্ত জনপ্রিয়। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও চীনের মতো দেশের বড় শহরগুলোতে পথের খাবার বিক্রির জন্য আলাদা ব্যবস্থাপনা রেখেছে। খাবারকে স্বাস্থ্যসম্মত রাখতে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা রেখেছে। মান নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত তদারকি হয়।

বিএআরসির গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ পথের খাবার খান। রাস্তার পাশে ১৪০ ধরনের খাবার বিক্রি হয়। খাবারে মূলত পানি থেকেই ব্যাকটেরিয়া যাচ্ছে।

এ ব্যাপারে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য মো. রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা পথের খাবারকে নিরাপদ করতে একটি নীতিমালা তৈরি করেছেন। খাবার বিক্রির জন্য এলাকা নির্দিষ্ট করাসহ অন্যান্য উদ্যোগ নেওয়া হবে।

গবেষণা করতে গিয়ে দেখা গেছে, ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ঢাকায় সিটি করপোরেশন স্বাস্থ্যসম্মতভাবে খাবার বিক্রির জন্য ৪০০ হকারকে কাচে ঘেরা ভ্যান দিয়েছিল। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) তাতে অর্থায়ন করেছিল। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার এক বছরের মাথায় বেশির ভাগ হকার ভ্যানের চারপাশের কাচে ঘেরা অংশটি সরিয়ে ফেলেছেন।

এ ব্যাপারে ঢাকা সিটি করপোরেশন (ডিসিসি) উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকার রাস্তায় অস্বাস্থ্যকর খাবার বিক্রি নিয়ে তাঁরা চিন্তিত। এ জন্য রাজধানীর বড় আবাসিক এলাকাগুলোতে ১২টি স্ট্রিট ফুড বিক্রির উন্নত মানের গাড়ি বা ক্যারাভ্যান নামানোর উদ্যোগ নিয়েছেন তাঁরা। তাঁর আশা, বেসরকারি উদ্যোক্তারা তাঁদের দেখাদেখি এ ধরনের ভ্যান নামাবে।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে ডিসিসি দক্ষিণের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আমীনউল্লাহ নুরী বলেন, এসব খাবারের দোকানের বেশির ভাগই অবৈধ। এগুলো উচ্ছেদ করার পরিকল্পনা আছে।

তবে পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীবাসীর বড় অংশ পথের খাবারের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে রিকশাওয়ালা, দিনমজুর, শ্রমিক ও নিম্ন আয়ের মানুষ। পথের খাবারের দাম কম, সহজে পাওয়া যায়। দাম বেশি হলে বা দোকানগুলো উচ্ছেদ হলে নিম্ন আয়ের মানুষ সমস্যায় পড়বেন।

এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক নাজমা শাহীন প্রথম আলোকে বলেন, নিম্ন আয়ের মানুষ আর্থিক কারণেই দামি ও পুষ্টিকর খাবার পান না। যে খাবারগুলো তাঁরা খান, সেগুলোকে স্বাস্থ্যসম্মত ও পুষ্টিকর করতে প্রথমে খাবারগুলোর তালিকা তৈরি করা দরকার। তা না করে যদি খাবার দামি ক্যারাভ্যানে নিয়ে আসা হয় বা দোকান উচ্ছেদ করা হয়, তাহলে আরও বিপদ বাড়বে। বিক্রেতাদের রোগজীবাণু ও পুষ্টি সম্পর্কে ধারণা দিতে প্রশিক্ষণ এবং অন্যান্য সহায়তা দেওয়া দরকার।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন