বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আর মোনঘরের যাত্রা শুরু হয় রাঙামাটি শহরের অদূরে রাঙ্গাপানির মিলন বিহারকে কেন্দ্র করে । প্রথম দিকে এটি ‘পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম’-এর শাখা হিসেবে পরিচালিত হয়েছিল। শুরুতে মোনঘরের শিক্ষার্থী ছিল সাকল্যে ৩০ জন। এ সময় সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও ফরাসি এক বেসরকারি সংস্থা থেকে মোনঘরের জন্য কিছু সহায়তা প্রদান করা হয়।

১৯৮০ সালে মোনঘর আবাসিক বিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৮২ সালে এটি বিদ্যালয় হিসেবে তৎকালীন কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক স্বীকৃতি লাভ করে এবং ১৯৮৫ সালে প্রথম এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি পায়। পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম কিংবা মোনঘর প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্দেশ্যই হলো পার্বত্য এলাকার সুবিধাবঞ্চিত, দরিদ্র, অনাথ পাহাড়ি শিশুদের শিক্ষালাভের সুযোগ করে দেওয়া। বর্তমানে মোনঘরের অধীনে একটি আবাসিক বিদ্যালয়, ছাত্রাবাস, কারিগরি বিদ্যালয়, নাট্যকলা ও সংগীত বিদ্যালয়, কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার, রিসোর্স সেন্টার, মিনি হাসপাতালও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

মোনঘরের আবাসিক শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবাদানের জন্য মোনঘরের কম্পাউন্ডেই ১২ বেড-সংবলিত একটি মিনি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এ হাসপাতালে সার্বক্ষণিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য একজন খণ্ডকালীন চিকিৎসক, একজন মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট, একজন নার্স ও একজন আয়া কর্মরত রয়েছেন।

তিন পার্বত্য জেলার বিভিন্ন জাতিসত্তার প্রায় দেড় হাজারের মতো শিক্ষার্থী এখানে পড়ালেখা করছে। গত সাড়ে চার দশকে মোনঘর থেকে কয়েক শ ছাত্রছাত্রী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, নার্সিং কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিজ নিজ যোগ্যতায় উজ্জ্বল স্বাক্ষর রাখছেন।

মোনঘরের বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর জন্য ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল ‘মোনঘর ছাত্রকল্যাণ সংস্থা’। এ সংস্থার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল মোনঘরের সব শিক্ষার্থীর মধ্যে সৌহার্দ্যভাব ও ঐক্য গড়ে তোলা। একই সঙ্গে শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতিচর্চা ও সৃজনশীল কাজে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করা। পরে ১৯৯৯ সালে পুনর্বিন্যাস করে সংগঠনটির নতুন নামকরণ হয় “দ্য মোনঘরীয়ান্স”। বর্তমানে দ্য মোনঘরীয়ান্স ‘ মোনঘর হাইয়ার এডুকেশন লোন প্রোগ্রাম (HELP) নামে একটি শিক্ষা প্রকল্প পরিচালনা করে। হেল্প প্রকল্পটি মূলত মোনঘরের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার জন্য ঋণ প্রদান করে থাকে।

‘মোনঘর’ একটি চাকমা শব্দ, যার অর্থ হলো জুমের একটি অস্থায়ী মাচাং ঘর। এ মোনঘর থেকে জুমের পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় এবং জুমের ফসল সেখানে প্রথম তোলা হয়। তাই মোনঘর প্রকৃত অর্থেই পাহাড়ের ‘মোনঘর’। যে মোনঘরের ছায়াতলে এসে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, চাক্, ম্রো, পাংখোয়া, মণিপুরিসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের শিশুরা এসে শিক্ষার আলো নিয়ে তারা আবার ফিরে যায় নিজ নিজ এলাকায়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সুবিধাবঞ্চিত অসহায় অনাথ পাহাড়ি শিশুদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার লক্ষ্য নিয়ে শ্রীমৎ জ্ঞানশ্রী মহাথেরো তৎকালীন দুর্গম ও অজপাড়াগাঁ দীঘিনালার বোয়ালখালীতে অনাথ আশ্রম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যে স্বপ্নের যাত্রা শুরু করেছিলেন, আজও সেই স্বপ্নের কান্ডারি হয়ে আছে মোনঘর। অর্ধশতক বছর আগে জ্ঞানশ্রী মহাথেরো যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, আজ সেই স্বপ্নের আলো দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশের মাটিতেও ছড়িয়ে পড়ছে। মোনঘরের বহু শিক্ষার্থী আজ দেশে ও বিদেশে প্রতিষ্ঠিত।

১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরে পার্বত্য চুক্তির পরে ১৯৯৯ সালে ফরাসি বেসরকারি সংস্থা পার্টাজ বাংলাদেশ থেকে তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিলে মোনঘরের অন্যতম আর্থিক সহায়তার উৎস বন্ধ হয়ে যায়। তখন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড থেকে মোনঘর পাঁচ বছর মেয়াদি একটি প্রকল্পের অনুমোদন পায়। যার কারণে মোনঘর শিশুসদনের শিক্ষার্থীদের অন্তত খাবারের নিশ্চয়তাটুকু পাওয়া গিয়েছিল। ২০০৭ সালে এ প্রকল্পটি শেষ হয়ে গেলে মোনঘর আবারও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। এ কঠিন সময়েই মোনঘরের প্রশাসনিক কাঠামো নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ গ্রহণ করে নতুন প্রজন্মের হাতে সব কার্যক্রম তুলে দেওয়া হয়। ২০০৮ সাল থেকে নতুনের হাত ধরে মোনঘরের নতুন যাত্রা আবার শুরু হলো।

সাড়ে চার দশক ধরে বিভিন্ন চড়াই-উতরাই পেরিয়ে মোনঘর আজ যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, এর পেছনে যে শক্তিটি কাজ করে তা হলো ‘আত্মপ্রত্যয়’। শ্রীমৎ জ্ঞানশ্রী মহাথেরো যে প্রত্যয় অর্থাৎ ‘আত্মশক্তি’ নিয়ে অনাথ আশ্রমের যাত্রা শুরু করেছিলেন, সেই ‘প্রত্যয়’ই মোনঘরকে এগিয়ে নেওয়ার শক্তি জুগিয়ে যাচ্ছে। শ্রীমৎ জ্ঞানশ্রী মহাথেরো এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘সরকারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে অনাথ আশ্রম প্রতিষ্ঠা করিনি, নিজস্ব শক্তি ও চেষ্টা দিয়ে আশ্রম গড়ে তুলেছি’ (সূত্র : মোনঘরের ৪০ বছরপূর্তি স্মারকগ্রন্থ, ২০১৫)। নানান প্রতিকূলতার মাঝে মোনঘর কর্তৃপক্ষের বর্তমানে এ উপলব্ধি এসেছে, কারোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে নয়, বরং আত্মনির্ভরশীলতার মধ্য দিয়ে মোনঘরকে টিকিয়ে রাখতে হবে।

মোনঘরের সাবেক শিক্ষার্থী অশোক কুমার চাকমা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে তিনি বৃত্তি নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সোশ্যাল প্লানিংয়ের ওপর মাস্টার্স সম্পন্ন করে দেশে ফিরে বর্তমানে মোনঘরের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, ‘নিজস্ব শক্তি দিয়ে আত্মনির্ভরশীল হয়ে মোনঘরকে টিকে থাকতে হবে। ২০২৫ সালে মোনঘরের সুবর্ণজয়ন্তী পালিত হবে। আমাদের আশা, ৫০ বছরে মোনঘর একটি সম্পূর্ণ আত্মনির্ভরশীল প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়ে পাহাড়ের আলোকবর্তিকা হিসেবে আলোকিত মানুষ গড়ার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।’

মোনঘর হলো পাহাড়ের নানান সংস্কৃতির সম্মিলনের একটি বাতিঘর। বিভিন্ন জাতিসত্তার ছেলেমেয়েরা একত্রে থাকার সুবাদে তারা যেমন নিজের স্বতন্ত্র পরিচিতি ও বৈশিষ্ট্যকে অনুধাবন করতে পারে, তেমনি তাদের মধ্যে অন্য ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসাও তৈরি হয় এবং তাদের চিন্তা ও মননে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বিশালতা গড়ে ওঠে।

সবশেষে আমাদের প্রত্যাশা, মোনঘর শুধু শিক্ষার আলো নয়, একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের সব জাতিসত্তার মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির মাধ্যমে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন রচনা করে পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রাখবে। মোনঘরই হলো একমাত্র প্রতিষ্ঠান যেখানে ভিন্ন ভিন্ন জাতিসত্তার ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির ছেলেমেয়েদের এক ছাদের নিচে এনে তাদের মধ্যে নির্মল এক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি করছে। তাই বলা যায়, বঙ্গবন্ধু যে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, মোনঘর যেন তাঁর সেই স্বপ্নেরই প্রতিচ্ছবি।


ইলিরা দেওয়ান: হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন