default-image

কোনো কোনো অফিসের প্রবেশপথে বসানো হচ্ছে জীবাণুমুক্তকরণ টানেল। কোথাও প্রতিদিন সবাইকে একসঙ্গে না এনে পালাক্রমে দায়িত্ব পালনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। কাজের পরিসর সীমিত রাখা হচ্ছে কোনো কোনো অফিসে। আর সবাইকে মাস্ক পরাসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রস্তুতি তো থাকছেই।

এমন প্রস্তুতি নিয়ে টানা ৬৬ দিন বন্ধের পর আজ রোববার খুলছে দেশের সব সরকারি-বেসরকারি অফিস। পুঁজিবাজারসহ অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানও খুলছে।

করোনাভাইরাস মহামারির বিস্তার রোধে আরোপ করা লকডাউন (অবরুদ্ধ করা) বা বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার ক্ষেত্রে সব দেশকে ছয়টি পরামর্শ দিয়েছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এসব শর্ত পূরণ হলেই কেবল লকডাউন তুলে নেওয়ার পক্ষে সংস্থাটি। ৬ মে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় সংস্থাটির মহাপরিচালক তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস এই ছয় পরামর্শ দেন। এসব পরামর্শের মধ্যে রয়েছে জোরদার নজরদারি, রোগীর সংখ্যা কমা ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসতে হবে। প্রত্যেক রোগী চিহ্নিত, পৃথক্‌করণ, পরীক্ষা ও চিকিৎসা করা এবং রোগীর সংস্পর্শে আসা সব ব্যক্তিকে শনাক্ত করার সক্ষমতা স্বাস্থ্যব্যবস্থার থাকতে হবে। বাকি চার পরামর্শের মধ্যে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তি পর্যায়ে স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়।

দেশে বর্তমানে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের সব দিকই ঊর্ধ্বমুখী। নমুনা পরীক্ষায় শনাক্তের হার যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যু। তাই সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে নানা প্রস্তুতি নিয়ে সীমিত পরিসরে নানা প্রতিষ্ঠান ও গণপরিবহন চালু হলেও সংক্রমণের ঝুঁকি থাকছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা। তাঁরা বলছেন, এ রকম পরিস্থিতিতে ঘোষিত স্বাস্থ্যবিধিগুলো কঠোরভাবে না মানলে সামনে মারাত্মক সমস্যা দেখা দিতে পারে।

অফিস ও অফিসের বাইরে স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত নির্দেশনাগুলো কীভাবে মানা হবে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলাম গতকাল শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা যে নির্দেশনা দিয়েছেন, তা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তর এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা এটি নিশ্চিত করবেন।

আর এটি মানার জন্য বড় ধরনের সম্পদেরও প্রয়োজন নেই। মাস্ক পরা, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার ইত্যাদি বিষয় সবাই মিলেই নিশ্চিত করতে হবে।

>

৬৬ দিন বন্ধের পর আজ খুলছে দেশের সব সরকারি-বেসরকারি অফিস। মাস্ক না পরলে জরিমানা কার্যকরের সিদ্ধান্ত।

নতুন করোনাভাইরাসের সংক্রমণের বিস্তার রোধে গত ২৬ মার্চ থেকে দেশে সাধারণ ছুটি শুরু হয়। সাত দফায় ছুটি বাড়িয়ে গতকাল শেষ হয়েছে। আজ থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত সীমিত আকারে অফিসগুলো খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সীমিত আকারে গণপরিবহন, নৌযান, ট্রেন এবং বিমানও চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। ১৫ দিন পর্যবেক্ষণ করে দেখে ধীরে ধীরে সবকিছু স্বাভাবিক করে দেওয়ার পরিকল্পনা সরকারের।

সরকারের এই সিদ্ধান্তের কারণে ঈদের ছুটির পর থেকেই মানুষ ঢাকায় আসতে শুরু করেছে। ঢাকার রাস্তাঘাটেও মানুষের ভিড় বাড়ছে। এমন পরিস্থিতির কারণে সংক্রমণের ঝুঁকির আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা।

যদিও সরকার বলছে, জীবন ও জীবিকার কথা চিন্তা করেই সরকার সীমিত আকারে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও অফিস খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ১৩ দফা নির্দেশনা মানার জন্যও পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

গতকাল ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত এক আন্ত মন্ত্রণালয় সভায় স্বাস্থ্যবিধি মানার ওপর বেশি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। মাস্ক না পরলে জরিমানা কার্যকরের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া সংক্রমণের ধরন অনুযায়ী, বিভিন্ন এলাকাকে রেড জোন, গ্রিন জোন ইত্যাদিতে ভাগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এই সভায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব, পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধিরা উপস্থিতি ছিলেন। সভায় উপস্থিত একজন সচিব প্রথম আলোকে এই তথ্য জানান।

করোনা পরিস্থিতির তথ্য জানাতে গতকাল নিয়মিত সংবাদ বুলেটিনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত মহাপরিচালক নাসিমা সুলতানা সুরক্ষিত হয়ে বের হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেন, মাস্ক না পরলে জরিমানার সম্মুখীন হতে পারেন।

প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়েও ছিল প্রস্তুতি। সচিবালয় এলাকায় দায়িত্বরত পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার রাজীব দাস প্রথম আলোকে বলেন, আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দর্শনার্থী পাস দেওয়া হবে না। শুধু সচিবালয়ে কর্মরত কর্মকর্তা–কর্মচারীরাই সচিবালয়ে প্রবেশ করতে পারবেন।

দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা দেখভাল হয় শিক্ষা ভবন খ্যাত মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর থেকে। সংস্থাটি গতকাল জীবাণুমুক্তকরণ টানেল স্থাপনসহ বিভিন্ন প্রস্তুতি নিয়েছে। অধিদপ্তরের পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) শাহেদুল খবির চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, প্রথমত তাঁদের সব কর্মকর্তা–কর্মচারীকে প্রতিদিন অফিসে আসতে হবে না। পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করা হবে। যাঁরা আসবেন সবাইকেই মাস্ক পরাসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি অবশ্যই মেনে চলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। জীবাণুমুক্তকরণ টানেলের পাশাপাশি তাপমাত্রা মাপার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া এই মুহূর্তে অতি জরুরি কাজ ছাড়া বাইরের লোকদের আসতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। অতি জরুরি প্রয়োজনে কেউ এলে ভবনের বাইরে থেকে যাতে সেবা পেতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করা হয়েছে। অনলাইনেও সেবার সুযোগ থাকছে।

মানুষের ভিড়ের একটি বড় জায়গা ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর। সংস্থাটির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল সাকিল আহমেদ গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের এখানে আপাতত কেবল অতি জরুরি পাসপোর্ট (চিকিৎসার মতো প্রয়োজন) ও ভিসার (মূলত বিদেশিদের) কাজ হচ্ছে। পাসপোর্টের বায়োমেট্রিকের কাজ পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকবে। কাজের পরিধি এখন সীমিত থাকবে বলে তিনি জানান।

অন্য দপ্তরগুলোতেও কমবেশি প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবু অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর মধ্যে ভয় কাজ করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি দপ্তরের একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অবশ্যই অফিসে যাবেন। কিন্তু শঙ্কা তো কাজ করছেই।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবিলায় সরকার গঠিত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সভাপতি ও বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিলের সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লা গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও পরিবহন চালুর ক্ষেত্রে যেসব স্বাস্থ্যবিধি মানার কথা বলা হয়েছে, তা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করতে হবে। আর তা হলে কোনো লাভ হবে না। স্বাস্থ্যবিধি বাস্তবায়নের জন্য অফিস-আদালত ও পরিবহনে শক্ত তদারকি ব্যবস্থা করে তা মানতে হবে। না মানলে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0