default-image

কপিরাইট বা মেধাসম্পদের নিবন্ধনের সংখ্যা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। তবে সৃজনশীল সাহিত্য নিবন্ধনে সংশ্লিষ্টদের সচেতনতা ও আগ্রহ কম। অপরদিকে মেধাসম্পদকে সুরক্ষা দিতে বিদ্যমান আইন সংশোধনের উদ্যোগ ঝুলে আছে। আইনটি যুগোপযোগী করার উদ্যোগের অগ্রগতি গত ছয় বছরে অতি সামান্য।

মানুষের মেধা ও সৃজনশীল সম্পদের আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা হলো কপিরাইট। সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে রয়েছে কপিরাইট অফিস। আগারগাঁওয়ে জাতীয় গ্রন্থাগার ভবনে এর দপ্তর। মেধাসম্পদের আইনি অধিকার নিশ্চিত করতে এই কার্যালয় থেকে বিধি মোতাবেক নিবন্ধন করতে হয়। যদিও এটা বাধ্যতামূলক নয়। তবে মেধাসম্পদের নিবন্ধন না থাকার সুযোগে অনেক অসাধু ব্যবসায়ী জনপ্রিয় বই, গান, গানের অডিও-ভিডিও অ্যালবাম নকল করে বিক্রি করছেন।

গত কয়েক বছরে ফকির মন্টু শাহের তিন খণ্ডের লালনসংগীতের স্বত্ব নিয়ে কুষ্টিয়ার কাকলী খাতুন বনাম ঢাকার হাওলাদার প্রকাশনী, জনপ্রিয় মাসুদ রানা ও কুয়াশা সিরিজের বই নিয়ে শেখ আবদুল হাকিম বনাম কাজী আনোয়ার হোসেনের দ্বন্দ্বসহ এ রকম কয়েকটি ঘটনার শুনানি ও কিছুটা নিষ্পত্তি করে আলোচিত হয়েছে কপিরাইট অফিস। সাম্প্রতিক সময়ে কপিরাইট অফিসে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে সংগীতের কপিরাইট নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে। এমন একটি মামলায় ২০১৮ সালে একজন নামী শিল্পীকে কারাগারে যেতে হয়।

এমন পরিপ্রেক্ষিতে আজ ২৩ এপ্রিল দেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব পুস্তক ও কপিরাইট দিবস।

কপিরাইট নিবন্ধনের গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে চাইলে কপিরাইট নিবন্ধক জাফর রাজা চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘মেধাসম্পদটির ওপর আর্থিক ও নৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য কপিরাইট নিবন্ধন করা দরকার। এতে তাঁর উত্তরাধিকারেরাও আইনগত সুরক্ষা পান। কিন্তু আমাদের দেশে কপিরাইটের ব্যাপারে উদাসীনতা রয়েছে। এ কারণে নকলকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না।’

বিজ্ঞাপন

ঝুলে আছে আইন সংশোধনের উদ্যোগ

কপিরাইট কার্যালয়ের তথ্যমতে, স্বাধীনতার পর প্রথম কপিরাইট আইন পাস করা হয় ১৯৭৪ সালে। পরে আইনটি বাতিল করে ২০০০ সালে নতুন আইন করা হয়। এটা ২০০৫ সালে আবার সংশোধন করা হয়, যার বিধিমালা জারি হয় পরের বছর ২০০৬ সালে।

এরপরও অনেক নতুন নতুন বিষয় চলে আসায় এবং কিছু বিষয়ে অস্পষ্টতা থাকায় ২০১৫ সালের অক্টোবরে আইনটি সংস্কারের আলোচনা শুরু হয়। ২০১৮ সালে আইনটি সংস্কার করে পাঠানো হয় আইন মন্ত্রণালয়ে। এরপর তিন বছর পার হয়েছে।

কপিরাইট আইন একটি বড় পরিসরের আইন। ১০৮টি ধারা ও ৩০৬টি উপধারা নিয়ে আইনটি গঠিত। কপিরাইট অফিস সূত্রের ভাষ্য, তাদের সংশোধনী প্রস্তাবের ওপর মন্ত্রিসভা বিভাগের আইন শাখা কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছিল। তারা এ বিষয়ে কাজ করে এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে আবার মন্ত্রিসভা বিভাগে পাঠায়। এরপর এটা আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ বিভাগে যাবে। সেখান থেকে জাতীয় সংসদে।

সংশোধিত খসড়ায় ১০৮টি ধারার মধ্যে ৬৮টিতে সংস্কার প্রস্তাব আনা হয়েছে। এতে ধারাগুলোর দুর্বোধ্যতা ভেঙে সহজ করা, তথ্যপ্রযুক্তিসংক্রান্ত কিছু বিষয়, নৈতিক অধিকার, প্রতিবন্ধীদের অধিকার, টাস্কফোর্স গঠন, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিশেষ করে আইনে জরিমানা অনূর্ধ্ব ২ লাখের বদলে ৫ লাখ, সাজা অনূর্ধ্ব ২ বছরের স্থলে ৪ বছর করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এ ছাড়া সংশোধনীতে বিশেষভাবে রয়েছে দেশের লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যগত জ্ঞান সুরক্ষার প্রস্তাব।

আইনটি পাসের গুরুত্ব সম্পর্কে কপিরাইট নিবন্ধক জাফর রাজা চৌধুরী গত বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ করতে পারছি না। আইনটি পাস হলে প্রয়োগ বা বাস্তবায়নে জোর দিতে পারব। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের কাছ থেকে বেশি সহায়তা পাব। ডিজিটাল পাইরেসির ব্যাপারে বেশি কাজ করার সুযোগ ঘটবে।’

সৃজনশীল সাহিত্যের নিবন্ধন কম

বাংলা একাডেমির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, করোনার কারণে এ বছর সীমিত সময়ের বইমেলায় প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ২ হাজার ৫৭৬। গড়ে প্রতিবছর বইমেলায় ৪ হাজার বই প্রকাশিত হয়। আর সারা বছরে মিলিয়ে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৭ হাজারের কাছাকাছি। এর মধ্যে নিবন্ধন হয় খুব অল্পসংখ্যকই। দেখা গেছে, এই সময়ে সফটওয়্যার, শিল্পকর্ম, ওয়েবসাইট, সংগীত, চলচ্চিত্রের নিবন্ধন বাড়লেও সৃজনশীল সাহিত্যকর্মের নিবন্ধন ততটা বাড়েনি।

বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি ও সময় প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফরিদ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের লেখক-প্রকাশক কেউই কপিরাইটের বিষয়ে আগ্রহী নন। উভয় পক্ষের আগ্রহ থাকতে হবে আগে। কপিরাইট অফিসের সক্রিয়তায় যদি কোনো ঘাটতি থাকে, আমাদের উদ্যোগ দিয়ে তাদের সচল রাখতে হবে। যদিও কপিরাইট অফিস খুব আগ্রহ নিয়ে কাজ করছে, সেটাও দৃশ্যমান নয়। তারা বছরে এক-দুটি সেমিনার করে তাদের কার্যক্রম সীমিত রেখেছে।’

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন