‘কী আর করুম। দুঃখের কপাল। ঘরের চাল ছিদ্র। রুয়ার কাঠ নষ্ট। ঝড়ের সময় ডরে খাটের নিচে শুইয়্যা থাকি। বৃষ্টির সময় ঘরে পানি আহে। এত কষ্ট সহ্য অয় না। মনয় সব ফালিয়্যা মইর্যাি যাই।’ কথাগুলো বলছিলেন টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার লাউহাটী ইউনিয়নের শৈলকুড়িয়া আশ্রয়ণকেন্দ্রের বাসিন্দা লাভলী বেগম (৪৫)।
লাভলী বেগমের মতো আশ্রয়ণকেন্দ্রটিতে ৪০টি পরিবারের দুই শতাধিক সদস্য মানবেতর জীবন যাপন করছে। ২০০১ সালে সেনাবাহিনী শৈলকুড়িয়া গ্রামে আশ্রয়ণকেন্দ্রটি নির্মাণ করে। সেখানে যমুনা, পদ্মা, মেঘনা ও ধলেশ্বরী নামে চারটি স্থাপনা রয়েছে। প্রতিটিতে রয়েছ ১০টি কক্ষ। এগুলোর মেঝে মাটির, বেড়া ও চাল টিনের।
গত শনিবার সরেজমিনে দেখা যায়, ঘরগুলোর টিনের চাল ছিদ্র হয়ে গেছে। ঘরের ভেতর থেকে ওপরের দিকে তাকালে আকাশ দেখা যাচ্ছে। চাল আটকে রাখার জন্য ব্যবহৃত কাঠ (রুয়া) পচে নষ্ট হয়ে গেছে। বৃষ্টির সময় ঘরে পানি পড়ে। বৃষ্টির পানি থেকে রেহাই পেতে পলিথিন টানানো হয়েছে। এ ছাড়া সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য একমাত্র বিনোদনকেন্দ্রটির (কমিউনিটি সেন্টার) চাল, দরজা-জানালা ভেঙে গেছে। ভেতরে ভাঙা চেয়ার-টেবিল পড়ে রয়েছে।
চম্পা বেগম (৪০) বলেন, ‘চাল ছিদ্র অওয়াতে খাটে হুয়াই আল্লাহ (আকাশ) দ্যাহা যায়। বর্ষাকালে ভুগান্তি হুবে।’
মেঘজান বেগম (৪৫) ও মর্জিনা বেগম (৪২) বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ঘরের দুরবস্থা। তবে সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেই। বস্তিতে থাকায় তাঁদের মূল্য নেই। অভাবের সংসারে কেউ সাহায্যেরও হাত বাড়ায় না।
আশ্রয়ণকেন্দ্রের আরেক বাসিন্দা নাছিমা বেগম (৪৫) বলেন, একমাত্র বিনোদনকেন্দ্রটির দুরবস্থার কারণে দীর্ঘদিন সেখানে কোনো অনুষ্ঠান হয় না। আগে সরকারি কর্মকর্তারা সেখানে বসে আলোচনা করতেন। এখন কেউ এলে বাইরে বসে কথা বলেন।
এর বাইরেও আশ্রয়ণকেন্দ্রের বাসিন্দারা বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছেন। বাহার উদ্দিন (৬০) বলেন, এখানে কবরস্থান নেই। কেউ মারা গেলে দুর্ভোগ বেড়ে যায়। আশপাশে কেউ মরদেহ দাফন করতে দেয় না। অনেক দূরে আগে যেখানে তাঁরা বাস করতেন, সেখানকার মাতব্বরদের হাতে-পায়ে ধরে মরদেহ কবর দিতে হয়।
নীলকমল দাস (৪০) বলেন, গত বছর তাঁর স্ত্রীর বড় বোন মারা যান। তাঁকে শ্মশানে দাহ করার জন্য আশপাশে অনেকের কাছে মিনতি জানিয়েছিলেন, কিন্তু লাভ হয়নি। পরে আশ্রয়ণকেন্দ্রের অদূরে নদীর পাড়ে তাঁকে দাহ করা হয়।
লাউহাটী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম খান বলেন, আশ্রয়ণকেন্দ্রের বাসিন্দারা কষ্ট করে বসবাস করছেন। ওই ঘরগুলো সংস্কার করা জরুরি। না হলে সামনে ঝড়-বৃষ্টির সময় তাদের দুর্ভোগ বাড়বে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শাহাদত হোসেন কবির বলেন, সম্প্রতি তিনি আশ্রয়ণকেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন। কমিউনিটি সেন্টারটি দ্রুত সংস্কার করা হবে। বসবাসের ঘরগুলো দ্রুত সংস্কারের জন্য উপজেলা প্রকৌশলীকে দিয়ে ব্যয় প্রাক্কলন করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পাশের একটি পুকুর খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ওই পুকুরে মাছের চাষসহ প্রয়োজনীয় কাজ করে বসবাসকারীরা লাভবান হতে পারবেন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন