মায়ের কাছে গল্প শুনতাম, ৩০-৪০ বছর আগেও নাকি সরকারপ্রধানেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নৈশভোজ কিংবা রিভার ক্রুজে আমন্ত্রণ জানাতেন। উদ্দেশ্য ছিল, অনানুষ্ঠানিকভাবে নানা বিষয়ে তাঁদের মতামত ও পরামর্শগুলো শোনা। সে অনুযায়ী কাজ হতো কি না, সেটা না জানলেও জেনেছিলাম তাঁর একমাত্র ভাইও নাকি এমন রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণে অংশ নিয়েছিলেন, যিনি পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। এ নিয়ে মায়ের বেশ গর্বও ছিল! এই গল্পের মাহাত্ম্য অবশ্য তাঁর গর্বের খবরে না। আসলে বিষয়টা আমি বিশ্বাসই করতে পারতাম না! কারণ, রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান শুনবেন শিক্ষার্থীদের পরামর্শ! তা-ও আবার অনানুষ্ঠানিকভাবে! এটাও কি সম্ভব! এখন এমন ঘটনা কালেভদ্রে ঘটলেও তার পুরোটাই হয় তো আনুষ্ঠানিক, আলংকারিক; মিডিয়ার সরাসরি সম্প্রচারের আধেয়।

এখন মনে হয়, চিত্রটা মায়ের বলা গল্পের মতোই হওয়ার কথা ছিল। কারণ, একজন তরুণ যেভাবে ভাবছেন, যা চিন্তা করছেন, তা না জেনে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করাটা রাষ্ট্রের জন্য কতটা যৌক্তিক! যেখানে তরুণেরাই আগামী, দেশের ভবিষ্যৎ! আচ্ছা, যৌক্তিকতার প্রসঙ্গটা নাহয় তোলাই থাক! দেখা যাক, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তরুণদের অংশগ্রহণের কোনো ‘জরুরত’ আদৌ আছে কি না! জাতিসংঘসহ বিশ্বনেতৃত্ব কিন্তু বলছেন, ‘আছে’। আছে বলেই বিশ্বে একটা আন্তর্জাতিক যুব দিবসও আছে। ১২ আগস্ট এই দিবস পালন করা হয়।

যুব দিবসের ইতিহাসটা অবশ্য একটু পেছনের। ১৯৯১ সালে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় জাতিসংঘের বিশ্ব যুব ফোরামে অংশগ্রহণকারী তরুণেরা প্রথম একটি দিবসের দাবি তোলেন। দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৮ সালে পর্তুগালের লিসবনে জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড কনফারেন্স অব মিনিস্টার্স রেসপনসিবল ফর ইয়ুথ’-এ ১২ আগস্ট দিনটিকে আন্তর্জাতিক যুব দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব ওঠে। ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ প্রস্তাবটিতে সমর্থন জানায়। ২০০০ সাল থেকে জাতিসংঘের উদ্যোগে ১২ আগস্ট ‘আন্তর্জাতিক যুব দিবস’ পালিত হচ্ছে।

এবার দেখা যাক, জাতিসংঘসহ বিশ্ব কীভাবে তরুণদের অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এ বছর ‘আন্তর্জাতিক যুব দিবস’-এর প্রতিপাদ্য হলো ‘বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনে তরুণদের অংশগ্রহণ’। এতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তরুণদের স্থানীয় ও সামাজিক পরিসরে অংশগ্রহণ; আইন ও নীতি প্রণয়ন এবং সেগুলোর বাস্তবায়নে জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণ; সর্বোপরি তাঁদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অংশগ্রহণের বিষয়টিকে। জাতিসংঘ বলছে, বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির এ ক্রান্তিকালে পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নিতে ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা এবং কর্মপ্রক্রিয়ায় তরুণদের সম্পৃক্ত করে ভাবার কোনো বিকল্প নেই। তরুণদের অংশগ্রহণেই সঠিক পরিকল্পনা ও কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করে তাঁদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্ব জনসংখ্যার ২ দশমিক ১১ শতাংশ মানুষের বাস বাংলাদেশে। তরুণ-যুবক বয়সীদের সংখ্যাই অধিক। বিশ্বে যেখানে যুব জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১২০ কোটি (বিশ্ব জনসংখ্যার ১৬ শতাংশ), সেখানে বাংলাদেশে এ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৫ কোটি ৬ লাখ ৭০ হাজারের বেশি, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। আবার বিশ্ব জনসংখ্যার গড় বয়স ৩০ দশমিক ৬ বছর হলেও বিপুল যুব জনগোষ্ঠীর কারণে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার গড় বয়স মাত্র ২৭ দশমিক ১ বছর। তাই আগামীর বাংলাদেশ কেমন হবে, তা বহুলাংশে এই তরুণ-যুবকদের ওপরই নির্ভর করছে।

জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী, ‘যুব’ বয়সের ব্যাপ্তি ১৫ থেকে ২৪ বছর। কিন্তু জাতীয় যুব নীতি ২০১৭ অনুযায়ী বাংলাদেশে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের যুব হিসেবে গণ্য করা হয়। সেদিক থেকে বাংলাদেশ বর্তমানে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ কাল অতিক্রম করছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার বিশাল অংশটিই কর্মক্ষম যুবসমাজ। মানবসম্পদে পরিণত করা গেলে যাদের শ্রম ও মেধায় গড়ে উঠতে পারে স্বপ্নের উন্নত বাংলাদেশ। আর যদি এই ডিভিডেন্ড কালে সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে কয়েক দশক পর এ জনগোষ্ঠীই দেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। জনশক্তি বা মানবসম্পদের মধ্যে সবচেয়ে উদ্যমী, সৃজনশীল, কর্মঠ, সক্রিয় ও মূল্যবান হিসেবে দেখা হয় যুব সম্পদকেই। কিন্তু তাঁদের মানবসম্পদে রূপান্তরে প্রয়োজন সঠিক ও মানসম্পন্ন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ, স্বাস্থ্য ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যোগ্যতা অনুযায়ী পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক ও সৃজনশীল কর্মোদ্যোগে উৎসাহিত করা।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)-এর ১৬৯টি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের মধ্যেও ২০টিতে সরাসরি তরুণদের প্রসঙ্গ আছে। বিশেষ করে লক্ষ্যমাত্রা ৪, ৫ ও ৮ এ স্পষ্টতই তরুণদের বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ৪-এ সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানসম্মত এবং জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা; লক্ষ্যমাত্রা ৫-এ নারীদের সম-অধিকার ও কন্যাশিশুদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা; এবং লক্ষ্যমাত্রা ৮-এ সবার জন্য স্থায়ী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনৈতিক কার্যক্রমে উৎসাহিত করা, পরিপূর্ণ ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান এবং উপযুক্ত কর্মের নিশ্চয়তা প্রদানের কথা বলা হয়েছে। আবার এসডিজি ১৬-তেও টেকসই উন্নয়নের জন্য শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজব্যবস্থা, সবার ন্যায়বিচার প্রাপ্তি এবং সব স্তরে কার্যকর জবাবদিহিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠানের অঙ্গীকার করা হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি অর্জনে তাই সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অংশীজনের পাশাপাশি সুশিক্ষিত, দক্ষ ও সচেতন যুবসমাজ ও তাদের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই রাষ্ট্রের উচিত হবে, এসডিজি অর্জনের সক্রিয় অংশীজন হিসেবে যুবসমাজ যাতে বাস্তবায়নকারীর ভূমিকা পালনে সক্ষম হতে পারে, তার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা।

কিন্তু উদ্বেগের বিষয়, বাংলাদেশে তরুণদের জন্য যুগোপযোগী ও গুণগত শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, বিনোদন এবং সামাজিক ও আইনি নিরাপত্তায় ব্যাপক ঘাটতি আছে। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পরিসরে নীতি কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়নেও তরুণদের অংশগ্রহণের ঘাটতি বিদ্যমান। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের প্রভাবে ‘আই হেট পলিটিকস’-এর ফ্যাশনে তরুণ-যুবকদের বড় অংশই রাজনীতিবিমুখ। গবেষণায় দেখা যায়, জাতীয় সংসদে মাত্র শূন্য দশমিক ২৯ শতাংশ (শূন্য ২৯%) সংসদ সদস্যের বয়স ৩০ বছরের নিচে। রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা কর্মকাণ্ডে তরুণ-যুবকদের অংশগ্রহণের পথ নানা আইনি ও পদ্ধতিগত বাধায় আটকে আছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যথেচ্ছ প্রয়োগে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বাধীন মতপ্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নীতি, কৌশল এবং রাষ্ট্রীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যুতে মতপ্রকাশের দায়ে নাগরিকদের অযাচিত মামলা ও আটকের ঘটনায় যুবসমাজের ওপরই বেশি প্রভাব পড়েছে। এতে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন ইস্যুতে যুবকদের অংশগ্রহণ ও মতপ্রকাশ আরও সীমিত ও সংকুচিত হচ্ছে।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে সার্বিক বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ২ শতাংশ হলেও যুবকদের বেকারত্বের হার আরও ভয়াবহ! যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ যুবক এখনো বেকার। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) হিসেবে যা ১১ দশমিক ৯ শতাংশ। বিআইডিএসের গবেষণায় দেখা যায়, দেশে মাধ্যমিক থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী তরুণদের ৩৩ দশমিক ৩২ শতাংশ বা এক-তৃতীয়াংশ পুরোপুরি বেকার। কোভিড-১৯ প্রেক্ষাপটে এ বেকারত্ব আরও বৃদ্ধির সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। আইএলওর হিসেবে, বিশ্বজুড়ে প্রতি ৬ জনের মধ্যে ১ জন তরুণ কাজ হারিয়েছেন এ মহামারিতে। সংস্থাটির মতে, এই মহামারিতে আরও প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ কর্মক্ষম মানুষ কাজ হারানোর ঝুঁকিতে আছে, যেটি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আরও প্রকট। তরুণদের চাকরির নিরাপত্তা তুলনামূলক কম হওয়ায় এবং তাঁদের চাকরির ক্ষেত্রগুলো করোনার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে কর্মক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ায় তরুণদের ঝুঁকি অধিক মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে।

তাই এসব সংকট মোকাবিলা করে কোভিড-পরবর্তী বিশ্বে নতুন স্বাভাবিকতার (নিউ নরমাল) সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে এবং তরুণদের মেধা ও শ্রমে ভর করে আগামীর বাংলাদেশ নির্মাণের স্বার্থেই তাদের প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ও ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে নিয়োগপ্রক্রিয়া দুর্নীতিমুক্ত করে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নিশ্চিত করতে হবে। তরুণ উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের পাশাপাশি তাদের পরামর্শ ও উৎসাহ প্রদান এবং আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। তরুণ উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ ও ব্যাংকঋণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে হবে এবং তাদের বাজারে অভিগম্যতার পথ মসৃণ করতে হবে। সর্বোপরি, টেকসই উন্নয়ন অর্জনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নীতি-কৌশল প্রণয়ন, কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ এবং সেগুলোর বাস্তবায়নে তরুণ প্রজন্মের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।


* লেখক: ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার, টিআইবি

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0