default-image

রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশন এলাকায় গতকাল সোমবার দুপুরে চলন্ত ট্রেনকে ধাক্কা দিয়েছে কাভার্ড ভ্যান। এতে এক নারীসহ ছয়জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আনসারের এক সদস্যসহ ১১ জন। হতাহত ব্যক্তিদের প্রায় সবাই ট্রেনের যাত্রী ছিলেন।
নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ঘটনাস্থলে দুজন ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চারজন মারা যান। তাঁদের মধ্যে চারজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাঁরা হলেন মুজিবুর রহমান (৫০), নাইম ইসলাম (১৬), আলমগীর হোসেন (৪৫) ও ইসমাইল হোসেন (৩৫)। আহত ব্যক্তিরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক মুশফিকুর রহমান।
আহত ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন আনসার সদস্য মিজানুর রহমান, বিল্লাল হোসেন, মোস্তফা, নাসির উদ্দিন, মোহাম্মদ হারুন, সাবের হোসেন, সুমন, জাবেদ, কামাল হোসেন ও মো. বাবুল। হতাহত ব্যক্তিদের মধ্যে কাভার্ড ভ্যানের চালক ও তাঁর সহকারীও থাকতে পারেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। তবে তাঁদের শনাক্ত করা যায়নি।
প্রত্যক্ষদর্শী ও বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, সাত বগির লোকাল ট্রেনটি নারায়ণগঞ্জ থেকে কমলাপুর স্টেশনে যাচ্ছিল। ট্রেনটি স্টেশন এলাকায় অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) পার হওয়ার সময় দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিটের দিকে এন এস কার্গো নামের একটি কাভার্ড ভ্যান ট্রেনের ইঞ্জিনের পেছনের অংশে ও লাগোয়া বগিতে সজোরে আঘাত করে। ইঞ্জিনের তুলনায় বগি কিছুটা হালকা। ফলে কাভার্ড ভ্যানের সামনের অংশ ইঞ্জিন থেকে পিছলে ওই বগিটিকে দুমড়ে-মুচড়ে ভেতরে ঢুকে যায়। চলন্ত ট্রেনটি কাভার্ড ভ্যানকে টেনে প্রায় ২০ ফুট দূরে নিয়ে থেমে যায়।
দুর্ঘটনাস্থলটি কমলাপুর স্টেশনের ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পথের ট্রেনের প্ল্যাটফর্মের ৫০ গজের মধ্যে।
রেলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রেনটিতে ৪৫০ থেকে ৫০০ জন যাত্রী ছিলেন। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পথে সারা দিনে ৩২টি ট্রেন চলাচল করে। ট্রেনগুলোতে থাকে যাত্রীদের অতিরিক্ত চাপ। বগিগুলো যাত্রীতে পরিপূর্ণ থাকার পাশাপাশি ছাদ, ইঞ্জিন এবং দুই বগির সংযোগস্থলেও যাত্রী থাকে। সকালে ও বিকেলে যাত্রীর চাপ থাকে সবচেয়ে বেশি।
রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক ও রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় রেলমন্ত্রী বলেন, কাভার্ড ভ্যানটিই অতর্কিতে ট্রেনে ধাক্কা দিয়েছে। এ ঘটনায় রেলের ঢাকা বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা নাজমুল ইসলামকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলপথ উত্তর-দক্ষিণে। আর দুর্ঘটনাস্থলের রেললাইনের পূর্ব-পশ্চিমে দুই দিকেই আইসিডি। পণ্যবাহী ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান ও ওয়াগন আইসিডির এপার-ওপার হয় রেললাইনের ওপর দিয়ে। সংরক্ষিত এলাকা বলে এর ভেতরে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে রেললাইনের ওপর মোটা লোহার গেট রয়েছে। ট্রেন চলাচলের সময় এই গেটগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং ট্রেন চলে যাওয়ার পর তা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
দুর্ঘটনার সময় সেখানে দায়িত্ব পালন করছিলেন আনসারের দুই সদস্য মিজান ও হান্নান। মিজান ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন। তিনি দাবি করেন, ট্রেন আসতে দেখে তিনি কাভার্ড ভ্যানটিকে থামার সংকেত দিয়েছিলেন। কিন্তু কাভার্ড ভ্যানের চালক তা অমান্য করে সরাসরি ট্রেনে আঘাত করে। কাভার্ড ভ্যানের ধাক্কায় তিনি নিজেও ছিটকে পড়েন।
রেলের কর্মকর্তারা জানান, দুর্ঘটনার সময় ট্রেনের গতি ৮ থেকে ১০ কিলোমিটারের মধ্যে ছিল। গতি বেশি থাকলে কাভার্ড ভ্যানটি ধাক্কা খেয়ে দূরে সরে যেত। ভ্যানটি বেপরোয়া গতিতে ধাক্কা দেওয়ায় ট্রেনের বগি দুমড়ে-মুচড়ে লাইনে কাত হয়ে পড়ে এবং হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যায়।
সরেজমিনে গিয়ে এবং রেলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গেটে আনসারের পাহারা রয়েছে। রেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ট্রেন চলাচলের বিষয়ে যোগাযোগ রক্ষার জন্য নিয়ন্ত্রণকক্ষও রয়েছে। ট্রেন আসার সময় যানবাহন যাতে পারাপার না হয়, সে জন্য সংকেতবাতির ব্যবস্থাও রয়েছে। এর পরও এ দুর্ঘটনা ঘটল।
দুর্ঘটনায় আহত জিন্দার মোল্লা অ্যাম্বুলেন্সে শুয়ে কাতরাচ্ছিলেন। তাঁর পা ও কোমরে আঘাত লেগেছে। তিনি জানান, দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া বগিতেই ছিলেন তিনি। হঠাৎ ঝাঁকি দিয়ে মড়মড় করে কিছু একটা ধেয়ে আসতে দেখে তিনি জানালা দিয়ে লাফ দেন। অন্য যাত্রীরাও যে যেভাবে পেরেছে জানালা ও দরজা দিয়ে লাফ দিয়েছে।
দুমড়ানো বগির লাগোয়া বগির যাত্রী সাবেদুল হক বলেন, নারায়ণগঞ্জ স্টেশনে তিনি প্রথমে দুমড়ানো বগিতেই উঠেছিলেন। কিন্তু ওই বগিতে বেশি যাত্রী থাকায় তিনি পরের বগিতে ওঠেন। ট্রেন থেকে নামার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় বিকট শব্দে ট্রেন ঝাঁকি দিতে থাকে। ট্রেনটির আরেক যাত্রী মুদি দোকানদার আমিনুল ইসলাম বলেন, তিনি পেছনের একটি বগির দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। কাভার্ড ভ্যানটি ট্রেনের ইঞ্জিনে থাকা কয়েকজন যাত্রীকে পিষে ফেলে।
আইসিডি টার্মিনালের পরিদর্শক ফজলুল হক চৌধুরী দাবি করেন, ফটকের দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যরা কাভার্ড ভ্যানটিকে থামার সংকেত দিয়েছিলেন। কিন্তু ভ্যানচালক তা অমান্য করে চলন্ত ট্রেনে তুলে দেন।
আইসিডি এলাকায় সাধারণের প্রবেশের সুযোগ নেই বলে ওই সময় আনসার সদস্যদের গাফিলতি ছিল কি না, তা জানা যায়নি।
স্বজনহারাদের আহাজারি: বিকেলে ঢাকা মেডিকেলে গিয়ে শোনা যায় নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের আহাজারি। তাঁদের একজন নিহত মুজিবুর রহমানের স্ত্রী সখিনা বেগম। মুজিবুর ব্যানারের লাঠি বিক্রি করতেন। স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে তিনি থাকতেন মিরপুরের শিয়ালবাড়িতে। সেখানে সখিনা স্টিক সাপ্লাই নামে তাঁর একটি দোকান আছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে সখিনা জানান, তাঁর স্বামী ভোরে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে নারায়ণগঞ্জে গিয়েছিলেন। ফিরছিলেন ট্রেনে। কথা ছিল কমলাপুরে ট্রেন থেকে নেমে কারওয়ান বাজারে ভাইয়ের হোটেলে যাবেন। সেখানে খেয়ে বিকেলে বাসায় ফিরবেন। দুপুরের দিকে তিনি খবর পান, স্বামী দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। হাসপাতালে আনার পর কয়েক ব্যাগ রক্ত দিয়েও তাঁকে বাঁচানো যায়নি।
নাইম ইসলাম বরিশালের বাকেরগঞ্জের একটি মাদ্রাসার দশম শ্রেণির ছাত্র। চার-পাঁচ দিন আগে রাজধানীর উত্তর মুগদায় খালার বাসায় বেড়াতে এসেছিল সে। নাইমের খালাতো ভাই নাজমুল বলেন, গতকাল সকালে নাইম তার খালাতো ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে নারায়ণগঞ্জে গিয়েছিল। সেখান থেকে ট্রেনে ফেরার পথে দুর্ঘটনায় পড়ে।
ইসমাইল নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় লেপ-তোশকের দোকানে কাজ করতেন। আলমগীর ঢাকার সূত্রাপুরে থাকতেন। লাশগুলো ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে রয়েছে।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন