চলমান সহিংসতার এক মাসে (৬ জানুয়ারি থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত) রাজধানী থেকে বিএনপি ও জামায়াতের ১ হাজার ২ জন নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) জনসংযোগ বিভাগ থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
ডিএমপি জানিয়েছে, ১৫৭ জনকে ঘটনাস্থল থেকে আর ৮৪৫ জনকে নাশকতা এড়ানোর পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে ‘নিবারণমূলক’ গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নাশকতার অভিযোগে এক মাসে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ২২৭টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামির সংখ্যা ১০ হাজারের ওপর। এঁদের প্রায় সবাই বিএনপি-জামায়াতের নেতা-কর্মী।
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, এক মাসে গ্রেপ্তার ১ হাজার ২ জনের মধ্যে ৭৪০ জন বিএনপির আর ২৬২ জন জামায়াতের কর্মী। নাশকতা ঘটাতে পারেন—এমন আশঙ্কায় যে ৮৪৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে ৬২৯ জন বিএনপির ও ১২৬ জন জামায়াতের।
পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে একজন পুলিশ কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাহায্য নিয়ে থানাগুলো সংশ্লিষ্ট এলাকার বিএনপি-জামায়াত ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীদের নামের তালিকা করেছে। সেই তালিকা অনুযায়ী যাঁকে যেখানে পাওয়া গেছে, গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি-জামায়াত নেতা-কর্মীদের বাড়ি বাড়ি অভিযান চালানো হয়েছে। এঁদের বেশির ভাগ পলাতক থাকায় গ্রেপ্তার করা যায়নি। গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের মধ্যে কেন্দ্রীয় থেকে ওয়ার্ড পর্যায়ের কর্মীরা রয়েছেন।
এ ছাড়া মিছিল, ভাঙচুর, ককটেল বিস্ফোরণ, গাড়িতে অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনার সময় ঘটনাস্থল থেকে ১২৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এঁদের মধ্যে ৮৩ জন বিএনপির ও ৪৪ জন জামায়াতের নেতা-কর্মী।
আর নাশকতার সময় ধরা পড়া ৩০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এঁদের মধ্যে ২৮ জন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের কর্মী। অন্য দুজন শিবিরের কর্মী। পুলিশ জানিয়েছে, এঁদের ১৫ দিন থেকে শুরু করে এক বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। তবে দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁদের স্বজনেরা।
মিজানুর রহমান নামের একজন তরুণ ওমান যাওয়ার জন্য ঢাকায় এসে ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগে এখন কারাগারে। তাঁকে পাঁচ মাসের কারাদণ্ড দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। গত ১৪ জানুয়ারি রাজধানীর গুলিস্তান এলাকা থেকে ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগে তাঁকে আটক করে পল্টন থানার পুলিশ। তাঁকে বিএনপির কর্মী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত মিজানকে পাঁচ মাসের দণ্ড দেন। অথচ মিজানের স্বজনেরা জানিয়েছেন, ১৭ জানুয়ারি মিজানের ফ্লাইট ছিল। কেনাকাটা করতে তিনি গুলিস্তানে যান। এ বিষয়ে ২১ জানুয়ারি প্রথম আলোতে প্রতিবেদন ছাপা হয়।
গত ৫ জানুয়ারি বিকেলে বনানীর কামাল আতাতুর্ক সড়ক থেকে ককটেল নিক্ষেপের অভিযোগে বিএনপির চার কর্মীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এঁরা হলেন তারিকুল ইসলাম, মো. ফাহিম, সাইফুল ইসলাম ও মুজাহিদুল ইসলাম। এঁদের প্রত্যেককেই এক বছর করে কারাদণ্ড দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। সাইফুল ও মুজাহিদুল বনানীর হোসাইনিয়া মাদ্রাসার ছাত্র। তাঁদের বিরুদ্ধে মারাত্মক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও সরকারি কাজে বাধাদানের অভিযোগ আনা হয়েছে।
পরদিন শাহবাগ এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এঁরা হলেন রনি মণ্ডল, কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ ও গিয়াসউদ্দীন। রওনকুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তাঁকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেন আদালত। অন্য দুজনকে তিন মাস করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এঁদের তিনজনের বিরুদ্ধেই দাঙ্গায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়।
৭ জানুয়ারি খিলগাঁও জোড়পুকুর পার এলাকায় পেট্রল ঢেলে গাড়িতে আগুন দেওয়ার সময় ধরা পড়েন গোলাম সারোয়ার (৪৪) নামের এক জামায়াত কর্মী। পরে তাঁকে দুই মাসের কারাদণ্ড দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
সর্বশেষ গত সোমবার রাত পৌনে ১১টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে ককটেল বিস্ফোরণের সময় মাইনউদ্দীন (২৪) নামের এক তরুণকে হাতেনাতে ধরে ফেলে পুলিশ। ককটেলটি বিস্ফোরিত হলে ডান হাতে আঘাত পান মাইনউদ্দীন। তিনি টিএসসি-সংলগ্ন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরে একটি চটপটির দোকানে কাজ করেন বলে পুলিশকে জানিয়েছেন। পরে তাঁকে ২০ দিনের কারাদণ্ড দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল ইসলাম জানান, মাইনউদ্দীনকে ভালোভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করার সময় মেলেনি। তাঁকে কে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটাতে বলেছিলেন, তা-ও জানা যায়নি।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন