বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সড়ক দুর্ঘটনায় করা মামলার কাগজপত্র এবং প্রথম আলোর অনুসন্ধানে জানা গেছে, যাত্রাবাড়ী থানাধীন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশাপাশি হানিফ উড়ালসড়ক, সায়েদাবাদ জনপথ মোড়, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের যাত্রাবাড়ী থেকে কোনাপাড়া পর্যন্ত এবং ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের যাত্রাবাড়ী থেকে দোলাইরপাড় অংশে দুর্ঘটনা বেশি হচ্ছে। যাঁরা মারা যাচ্ছেন, তাঁদের বেশির ভাগই পথচারী।

মামলার তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত যাত্রাবাড়ী থানা এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ২৮ জন। আর ২০২০ সালে মারা গেছেন ৪৯ জন। এর আগের বছর ২০১৯ সালে ২৬ জন।

এই থানা এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট থানা-পুলিশ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বেপরোয়া গাড়ি চালানো একটি কারণ। মহাসড়কের কাজলারপাড় থেকে সাইনবোর্ডের কাছে সাদ্দাম মার্কেট পর্যন্ত চারটি পদচারী-সেতু থাকলেও বেশির ভাগ পথচারী তা ব্যবহার করেন না। আট লেন মহাসড়কে থাকা বিভাজক টপকে ঝুঁকি নিয়ে পারাপারের সময় তাঁরা দুর্ঘটনায় পড়ছেন। আর সায়েদাবাদের জনপথ মোড় ও হানিফ উড়ালসড়কে চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে। একই অবস্থা ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের যাত্রাবাড়ী থানাধীন এলাকায়ও।

সড়ক দুর্ঘটনায় এত মৃত্যু প্রসঙ্গে যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মাজহারুল ইসলাম বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যাত্রাবাড়ী অংশে দুর্ঘটনায় অনেক মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, এটা সত্য। তবে সব সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুতে মামলা নেওয়া হচ্ছে। আগে সব ক্ষেত্রে মামলা হতো না।

প্রাণঘাতী চার কিলোমিটার

সড়ক দুর্ঘটনার মামলার নথিপত্রের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, গত আড়াই বছরে (২০১৯ সাল থেকে ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত) যাত্রাবাড়ী থানা এলাকায় সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ৮২ শতাংশ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে। এই মহাসড়কের সায়েদাবাদের জনপথ মোড় থেকে সাদ্দাম মার্কেট পর্যন্ত বিভিন্ন অংশে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে। সবচেয়ে বেশি নিহত হয়েছে মাতুয়াইল মেডিকেলের সামনে (১৩ জন)। এরপর রায়েরবাগ পদচারী-সেতুর নিচে ও সায়েদাবাদ জনপথ মোড়ে মারা গেছেন নয়জন করে। এ ছাড়া মহাসড়কের সাদ্দাম মার্কেটের সামনে মারা গেছেন আরও পাঁচজন। এ ছাড়া বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে যাত্রাবাড়ীর চৌরাস্তা, কাজলারপাড় ও শনির আখড়ায়।

মহাসড়কের এই অংশে প্রকৌশলগত ত্রুটির কারণেও দুর্ঘটনা হতে পারে, সেটি জানার জন্য গবেষণা প্রয়োজন।
কাজী সাইফুন নেওয়াজ সহকারী অধ্যাপক, সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট, বুয়েট

গত আড়াই বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুতে যাত্রাবাড়ী থানায় করা ১০৩টি মামলার মধ্যে ২৮টির নথিপত্র সংগ্রহ করেছেন এই প্রতিবেদক। এসব নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া ২৮ জনের মধ্যে ২৩ জনই ছিলেন পথচারী। রাস্তা পারাপারের সময়ই দুর্ঘটনায় তাঁরা নিহত হন। বাকি পাঁচজন ছিলেন মোটরসাইকেল আরোহী। প্রতিটি মামলায় বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে মৃত্যু ঘটানোর অপরাধের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর শফিকুল ইসলাম খান প্রথম আলোকে বলেন, মূলত পথচারীরাই রাস্তা পার হতে গিয়ে দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছেন। জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাঁরা মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করছেন।

দুর্ঘটনাপ্রবণ ৪ এলাকা

গত মাসের তিন দিন (১৫, ১৬ ও ১৭ জুলাই) ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দুর্ঘটনাপ্রবণ চারটি স্থানে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তা পার হওয়ার জন্য পদচারী-সেতু থাকলেও বেশির ভাগ মানুষ তা ব্যবহার করছেন না। বরং সড়ক বিভাজকের ফাঁকা অংশ টপকে দৌড় দিয়ে পারাপারে তাঁদের আগ্রহ বেশি। মহাসড়কের কাজলারপাড়ের বিভাজকের ফাঁকা অংশ দিয়ে প্রতিমুহূর্তে শত শত মানুষ পার হচ্ছেন।

একইভাবে সড়ক দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান রায়েরবাগ পদচারী-সেতুও মানুষজন ব্যবহার করেন না। বরং চরম ঝুঁকি নিয়ে বিভাজক টপকে রাস্তা পারাপার হন পথচারীরা।

একই চিত্র দেখা গেছে মাতুয়াইলের শিশু মাতৃসদন ইনস্টিটিউট হাসপাতালের সামনেও। এই হাসপাতালের সামনেও রয়েছে পদচারী-সেতু।

হানিফ উড়ালসড়কেও দুর্ঘটনা

যাত্রাবাড়ী থানাধীন হানিফ উড়ালসড়কেও প্রায়ই দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনা ঘটছে। গত আড়াই বছরে এই সেতুতে দুর্ঘটনায় ছয়জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কমুখী অংশে দুর্ঘটনা ঘটেছে তিনটি। বাকি তিনটি ঘটেছে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের দোলাইরপাড় অংশে।

রাজধানীর কদমতলীর বাসিন্দা শাহজাহান (৫০) মৌচাক মার্কেটে কাপড়ের ব্যবসা করেন। গত ৩ মে রাত ১২টার দিকে মৌচাক থেকে অটোরিকশায় করে হানিফ উড়ালসড়ক দিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। তবে দোলাইরপাড়ে যাওয়ার পথেই হানিফ উড়ালসড়কের ওপরে দুর্ঘটনায় মারা যান তিনি। নিহত শাহজাহানের ভাই আবুল বাশার প্রথম আলোকে বলেন, ‘হানিফ উড়ালসড়কে আমার ভাই দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। মামলাও করেছি। কিন্তু চালক ধরা পড়েনি।’

বেশির ভাগ চালক অধরা

ফরিদপুরের জিয়াউর রহমান খান রাজধানীর আমিন জুয়েলার্সের কর্মচারী ছিলেন। কাজ শেষে গত ৩০ এপ্রিল রাতে যাত্রাবাড়ী মোড় থেকে রিকশায় করে কদমতলীতে নিজের বাসায় ফিরছিলেন। তিনি যখন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাজলারপাড়ে আসেন, তখন পেছন থেকে একটি লেগুনা তাঁকে বহনকারী রিকশায় ধাক্কা দেয়। গুরুতর জখম জিয়াউর রহমান সেদিন হাসপাতালে মারা যান। এ ঘটনায় যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা হলেও চালক আজও ধরা পড়েননি।

যাত্রাবাড়ী থানায় চলতি বছরে সংঘটিত সড়ক দুর্ঘটনার অন্তত ১২টি মামলার নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেল, এসব মামলায় আসামির তালিকায় রয়েছে অজ্ঞাত চালক।

যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মাজহারুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর জন্য দায়ী বেশির ভাগ মামলার আসামি ধরা পড়েন। যাঁরা এখনো ধরা পড়েননি, তাঁদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

২০১৯ সাল ও ২০২০ সালে করা সড়ক দুর্ঘটনার অন্তত ১৯টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। আবার অনেকে মামলা করার পরও আসামিপক্ষের সঙ্গে আপস করে ফেলেন।

প্রয়োজন গবেষণা

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে কেন এত বেশি দুর্ঘটনা হচ্ছে, বিষয়টি তলিয়ে দেখার জন্য গবেষণা জরুরি বলে মনে করেন সড়ক পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, যাত্রাবাড়ী থানাধীন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মাত্র চার কিলোমিটারে আড়াই বছরে শতাধিক মানুষের মৃত্যুর ঘটনা একেবারই অস্বাভাবিক। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ প্রথম আলোকে বলেন, বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানো কিংবা পথচারীদের অসচেতনতার কারণে মানুষ মারা যাচ্ছেন, সেটি হয়তো একটা কারণ। তবে মহাসড়কের এই অংশে প্রকৌশলগত ত্রুটির কারণেও দুর্ঘটনা হতে পারে, সেটি জানার জন্য গবেষণা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন