বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

শিক্ষার্থীদের আবাসনব্যবস্থা, গ্রন্থাগার সুবিধা, শ্রেণিকক্ষ ও পরিবহন থেকে শুরু করে সর্বত্র অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপ আছে। গত দুই দশকে অপরিকল্পিতভাবে নতুন নতুন বিভাগ-ইনস্টিটিউট খোলার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অবকাঠামো না বাড়ানোর কারণে এ অবস্থা তৈরি হয়েছে। অবকাঠামোর উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ‘ভৌত মহাপরিকল্পনা’ প্রস্তুত করেছে। সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি একটি ‘একাডেমিক মহাপরিকল্পনা’ প্রস্তুতের আহ্বান জানান। এরপরই আসন কমানোর উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম আসন কমানোর উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন। তবে সুযোগ-সুবিধা না বাড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে এত দিন কেন আসন বাড়ানো হলো, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।

অধ্যাপক মনজুরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আসন কমানো না গেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জনস্ফীতি মোকাবিলা করতে পারবে না। কারণ, সেই পরিমাণ ভৌত অবকাঠামো (গ্রন্থাগার, গবেষণাগার ইত্যাদি) আমাদের নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি ‘সেন্টার অব এক্সেলেন্সে’ পরিণত করতে হলে শিক্ষার্থীসংখ্যা অনেক কমিয়ে ফেলতে হবে। সবকিছু যৌক্তিক করে শিক্ষার্থীসংখ্যা নির্ধারণ করা উচিত। দেখতে হবে, যাঁদের আমরা নিতে পারছি না, তাঁদের অন্য জায়গায় ব্যবস্থা আছে কি না। না থাকলে তাঁদের প্রতি একটা অন্যায় হবে। সবকিছু বিবেচনা করেই সিদ্ধান্তটি নেওয়া উচিত।’
কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম আরও বলেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী বাড়ানো হলে বুঝতে হবে সেখানে সংশ্লিষ্ট সুযোগ-সুবিধাগুলো আগেই বাড়ানো হয়েছে। হলের কোনো উন্নয়ন নেই, নতুন হল নেই, শ্রেণিকক্ষের আয়তন বাড়েনি—এসব অরাজকতার মধ্যেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বছর বছর আসন বাড়ানো হয়েছে।

যেভাবে দেখছে ছাত্রসংগঠনগুলো

বিদ্যমান বাস্তবতায় শিক্ষার্থীসংখ্যা কিছুটা কমিয়ে নিয়ে এলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের আবাসিক সক্ষমতার মান কিছুটা ইতিবাচক হবে বলে মনে করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগ। তবে শিক্ষাবিদদের নিয়ে একটি কমিশন গঠন করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত বলে মত দিয়েছে তারা।

ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চাহিদা, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত আবাসিক সক্ষমতা—সার্বিক দিক বিবেচনা করে শিক্ষার্থীসংখ্যা পুনর্নির্ধারণ করা প্রয়োজন। যেসব বিষয়ের বাজার চাহিদা রয়েছে এবং আন্তর্জাতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ, সেই বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে যে বিষয়ে যত শিক্ষার্থী প্রয়োজন, সেভাবেই শিক্ষার্থীসংখ্যা পুনর্নির্ধারণ প্রয়োজন। বিদ্যমান বাস্তবতায় শিক্ষার্থীসংখ্যা কিছুটা কমিয়ে নিয়ে এলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের আবাসিক সক্ষমতার মান কিছুটা ইতিবাচক হবে বলে আমরা মনে করি। কোন বিষয় থাকবে, কোন বিষয়ে কতজন শিক্ষার্থী থাকবেন—এসব বিষয়ে শিক্ষাবিদদের নিয়ে একটি কমিশন গঠন করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।’

আসন কমানোর বিষয়টিকে ‘জনবিরোধী নীতি’ বলছে বামপন্থী ছাত্রসংগঠন সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট (মার্ক্সবাদী)। তাদের অভিযোগ, প্রয়োগভিত্তিক বিভাগের আধিপত্য বাড়িয়ে খণ্ডিত মনন তৈরির চেষ্টা করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। শিক্ষার মানের দোহাই দিয়ে শিক্ষার অধিকার যতটুকু আছে, তাকেও সংকুচিত করার চেষ্টা চলছে।

ছাত্র ফ্রন্টের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সালমান সিদ্দিকী প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে করা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) কৌশলপত্রে শিক্ষা সংকোচনের কথা বলা আছে। শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষিত বেকার তৈরি হচ্ছে বলে বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে। মূল ব্যাপারটি হলো সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নিয়ে যেভাবে শিল্পায়ন বা কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা দরকার ছিল, তা হচ্ছে না। এর দায়টি চাপানো হচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থার ওপর ও শিক্ষার্থীদের কাঁধে।’
গণ অধিকার পরিষদের ছাত্রসংগঠন ছাত্র অধিকার পরিষদ অবশ্য আসন কমানোর উদ্যোগকে জোরালোভাবে সমর্থন করছে।

ছাত্র অধিকার পরিষদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক আকরাম হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, সবাইকে উচ্চশিক্ষা দেওয়া রাষ্ট্রের কাজ নয়। উচ্চশিক্ষার সঙ্গে মান খুব গুরুত্বপূর্ণ। মানসম্পন্ন শিক্ষা না পাওয়ায় উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পিছিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমিয়ে আনতে পারলে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
আকরাম হোসাইন আরও বলেন, ‘আমরা মনে করি, শুধু এক হাজার নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও আসন কমানো উচিত। শিক্ষার্থীদের মৌলিক প্রয়োজনগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান কাঠামোর মধ্যে পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। বর্তমান অবকাঠামোর মধ্যে সর্বোচ্চ যতজন শিক্ষার্থীকে আবাসনসুবিধা ও শ্রেণিকক্ষে জায়গা দেওয়া সম্ভব, তার বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করা উচিত হবে না।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতার্কিকদের সংগঠন ঢাকা ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটির সভাপতি শেখ মোহাম্মদ আরমান আসন কমানোর উদ্যোগকে ‘অলীক চিন্তাভাবনা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আসন কমানো কোনো চূড়ান্ত সমাধান কি না, সেই প্রশ্ন থাকছে। আসন কমালেই বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান হয়ে যাবে? সব শিক্ষার্থীরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন থাকে। আসন কমালে অনেক শিক্ষার্থীর সেই স্বপ্ন পূরণ হবে না। সিট না কমিয়ে যদি পর্যাপ্ত আবাসন ও একাডেমিক অবস্থার উন্নয়ন করা যায়, সেটিই হবে প্রকৃত মৌলিক পরিবর্তন। আসন কমালেই বিরাট পরিবর্তন হয়ে যাবে, এটি পুরোপুরি অলীক চিন্তাভাবনা। কাজের মূল জায়গাটি হওয়া উচিত, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পাঠ্যসূচি সময়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করা ও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ নিশ্চিত করা।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন