রোববার সকাল ১০টা। ফার্মগেটের পুলিশ বক্সের সামনের সিগন্যালের পশ্চিমে অনেক দূর পর্যন্ত যানবাহনের সারি। একপর্যায়ে তা পৌঁছে যায় সংসদ অ্যাভিনিউ সড়কের কাছাকাছি পর্যন্ত। 
সেখানে কথা হলো মতিঝিলগামী বাসযাত্রী মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে। হরতালে বের হওয়ার অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘আজকে কি হরতাল নাকি? কই হরতালের কিছু তো দেখছি না।’ একই বাসের আরেক যাত্রী তৌহিদুর রহমান মজা করেই বললেন, ‘একসময় হরতালকে ভয়তাল বলতেন অনেকে। এখনকারটা হচ্ছে বোমতাল। যা আতঙ্ক ছড়ায় আর কি।’
বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের ডাকা হরতালের চিত্র দেখতে গতকাল সকাল নয়টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত প্রথম আলোর চারজন প্রতিবেদক রাজধানীর গাবতলী থেকে সদরঘাট, মহাখালী থেকে যাত্রাবাড়ী এবং পুরান ঢাকার বিভি ন্ন ব্যস্ত এলাকা ঘুরে বেড়ান। এ সময় জনজীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং যান চলাচল প্রায় স্বাভাবিকভাবে চলতে দেখা গেছে। রাজপথে ২০-দলীয় জোটের রাজনৈতিক কোনো কর্মসূচি চোখে পড়েনি। তবে বিক্ষিপ্তভাবে কয়েকটি স্থানে ককটেল বা বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এই একটি আতঙ্কই চলতি পথে মানুষের গতিতে কিছুটা ছেদ ফেলছে বলে অনেকে জানিয়েছেন।
হরতাল যে ‘বোমতাল’-এর যৌক্তিকতা প্রমাণ করতেই যেন সকাল সাড়ে নয়টায় মিরপুর-২-এর গ্রামীণ ব্যাংকের সামনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বহনকারী ‘বৈশাখী’ বাস লক্ষ্য করে দুটি ককটেল ছোড়ে দুর্বৃত্তরা। এরপর ওই পথে স্বাভাবিক গতিতেই যানবাহন চলেছে।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কারওয়ান বাজারে পর পর কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। পরক্ষণেই সব স্বাভাবিক হয়ে যায়। ঘটনাস্থলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা তানিয়া হোসেন ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘ভয়টা আসলে এখানেই। এটাই মনে হয় আমাদের নিয়তি হয়ে গেছে। এ অবস্থা থেকে উদ্ধার করবে কে?’
পথচারী, পরিবহন কর্মী, যাত্রীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, হরতালে রাজধানী ঢাকায় তুলনামূলকভাবে ব্যক্তিগত গাড়ি কম। অনেক বাস মালিক নতুন বাসটা ভয়ে নামাচ্ছেন না। ফলে ২০ শতাংশ বাস-মিনিবাস বসে আছে। অতি জরুরি না হলে কেনাকাটায় বের হচ্ছে না মানুষ। আর বেড়ানোর পরিমাণও কমে গেছে। দূরপাল্লার পথে যান চলাচল স্বাভাবিকের চেয়ে কম বলে দিনে দিনে ঢাকা থেকে কাজ সেরে ফেরত যাওয়া মানুষের স্রোতও হ্রাস পেয়েছে। ফলে হরতালে ঢাকা সচল থাকলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে গেছে, তা বলা যাচ্ছে না।
ঢাকার পথ চলা: সকাল ১০টা, শুক্রাবাদ বাসস্ট্যান্ড। ১০-১৫ মিনিট দাঁড়াতেই বিকল্প, বিহঙ্গসহ কয়েকটি পরিবহন কোম্পানির ছয়-সাতটা বাস পার হয়ে যায়। এর মধ্যে সদরঘাট-গাবতলী পথের একটি লোকাল বাস থামতেই চড়ে বসেন এই প্রতিবেদক। সব আসন পূর্ণ করে দাঁড়িয়েও রয়েছেন বেশ কিছুসংখ্যক যাত্রী। ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের পূর্ব প্রান্তে গিয়ে সিগন্যালে এক মিনিটের মতো স্বাভাবিক যাত্রাবিরতি। আড়ংয়ের সামনে যেতেই আরও আট-দশজন যাত্রী বাসে ওঠেন। আসাদগেট গিয়ে বাসটির আসন ও দাঁড়িয়ে থাকার জায়গাও পূর্ণ হয়ে যায়।
এর মধ্যে কলেজগেট গিয়ে ওই পথের আরেকটি বাস পাওয়া গেল। শুরু হলো কার আগে কে যাত্রী তুলবে সেই পাল্লাপাল্লি। শ্যামলী ও কল্যাণপুরে ঠিক যানজট নয়, স্বাভাবিক যাত্রাবিরতি হলো। এরপর টেকনিক্যাল মোড় ও মাজার রোড হয়ে গাবতলী পৌঁছাতে আর তেমন ঝামেলা পোহাতে হয়নি। পথে পথে যাত্রী ওঠানো-নামানো, সিগন্যালে যাত্রাবিরতি এবং হালকা যানজট মিলিয়ে সাড়ে ছয় কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগে ৪০ মিনিট।
চালক মোতালেব গাজী বলেন, হরতাল-অবরোধ না থাকলে এই পথ যেতে এক ঘণ্টা লাগে। অফিস শুরুর আগে ও ছুটির পর কখনো কখনো দেড় ঘণ্টাও লেগে যায়।
গাবতলী নেমে সড়কের বিপরীত পাশে গিয়ে দেখা যায় একই পথের (গাবতলী-সদরঘাট) সাত-আটটি মিনিবাসের কর্মীরা যাত্রীর জন্য হাঁকডাক করছেন। পাঁচ-ছয়জন যাত্রী রয়েছে এমন একটি মিনিবাসে চড়ে বসার পর ছাড়তে সময় নিল ১৫ মিনিট। ১১টার দিকে মিনিবাসটি ছাড়ার সময় যাত্রী ছিল ১০ জন।
গাবতলীর মোটামুটি যানজট ঠেলে মাজার রোড এসে আরেক দফা যাত্রীর অপেক্ষা। টেকনিক্যাল মোড়ে এসে বাসটির আসন প্রায় পূর্ণ হয়ে যায়। টেকনিক্যাল মোড় থেকে কল্যাণপুর আসতেই হালকা যানজট। এর মধ্যে ভর্তি হয়ে যায় বাস। শ্যামলী থেকে শিশুমেলা পর্যন্ত যানজট ঠেলতে ঠেলতে বাসেও পা ফেলার জায়গা থাকেনি। এরপর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, আসাদগেট হয়ে আড়ংয়ের সামনে এসে যানজটে পড়ে বাসটি। শুক্রবাদে আসতে আসতে ১১টা ৫৫। অর্থাৎ ফিরতি যাত্রায় লেগে যায় ৫০ মিনিট।
মিনিবাসে কথা হয় রাজবাড়ীর মশিউর রহমানের সঙ্গে। যাবেন পুরান ঢাকার আদালতপাড়ায়। তিনি বলেন, দৌলতদিয়া ঘাট থেকে ফেরি পাড়ি দিয়ে সকালে পাটুরিয়া থেকে বাসে ওঠেন। বাস পেতে কোনো সমস্যা হয়নি। আসনও পাওয়া গেছে। বেশ আরামেই গাবতলী নেমে মিনিবাসে উঠেছেন। এক আইনজীবীর সঙ্গে মামলার পরামর্শ নিয়ে একইভাবে বাড়ি ফিরে যাবেন।
মশিউর রহমান বলেন, বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় দুশ্চিন্তা হয়েছিল। কিন্তু পথে ভয় পাওয়ার মতো কিছু চোখে পড়েনি। এখন ভালোই ভালোই বাড়ি ফিরতে পারলে হয়।
শুক্রাবাদ নেমে এই প্রতিবেদক মোটরসাইকেলে যাত্রা শুরু করেন। রাসেল স্কয়ার হয়ে কারওয়ান বাজারের সার্ক ফোয়ারা সিগন্যালের আগে খুব একটা বাধা পেতে হয়নি। দুপুরের দিকে বসুন্ধরা শপিং মলে মানুষের আনাগোনো দেখা যায়। কিন্তু হরতালবিহীন দিনে শপিং মলের আঙ্গিনা ও সামনের সড়কে যে পরিমাণ ব্যক্তিগত গাড়ি ও অটোরিকশা দাঁড়িয়ে থাকে, তা চোখে পড়ল না।
পাঁচ মিনিটের অপেক্ষার পর সোনারগাঁও হোটেলের সামনে দিয়ে হাতিরঝিল এলাকায় প্রবেশ করতে খুব কম সময়ই লাগল। হাতিরঝিল হয়ে গুলশান-১ নম্বর যেতেও বড় ধরনের যানজটে পড়তে হয়নি।
গুলশান ১ নম্বর থেকে লিংক রোড হয়ে মোটরসাইকেলে নাবিস্কো আসতে সময় লাগল মাত্র ২০ মিনিট। সেখান থেকে বিজয় সরণি উড়ালসড়ক ও ফার্মগেট হয়ে কারওয়ান বাজার আসতে আরও ২০ মিনিট। বিজয় সরণি উড়ালসড়ক ধরে বাস-মিনিবাস নয়, ব্যক্তিগত গাড়ি ও অটোরিকশাই বেশি চলে। হরতালবিহীন দিনে পশ্চিম প্রান্তে উড়ালসড়কের অনেক দূর পর্যন্ত যানজটের সৃষ্টি হয়। কিন্তু গতকাল যানজটে আটকা পড়তে হয়নি। ফার্মগেট ও কারওয়ান বাজারেও লম্বা সারি থাকে। কিন্তু গতকাল বেলা দুইটার দিকে তা ছিল না। অবশ্য সন্ধ্যার পর এই পথে দীর্ঘ যানজট দেখা যায়।
দোকানপাট-বিপণিবিতানও খোলা: গতকাল রাজধানীর সব স্থানেই দোকানপাট খোলা থাকতে দেখা যায়। ক্রেতাও কিছুটা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন দোকানিরা। একাধিক ব্যবসায়ী জানান, ব৵বসা মন্দা বলে কর্মচারীদের বেতন দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
পুরান ঢাকার ইসলামপুরের সামিয়া শাড়ি বিতানের মালিক ইসমাইল হোসেন বলেন, এত দিন ক্রেতা ছিল না। কিন্তু এখন বেচাকেনা কিছুটা বেড়েছে। ঢাকার আশপাশের ক্রেতারা ক্রমান্বয়ে আসতে শুরু করেছেন। তবে তা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অর্ধেক।
বাংলাবাজারের ফুটপাতে বই বিক্রেতা ওবায়দুর রহমান বলেন, বছরের শুরুতে (জানুয়ারি-মার্চ) দিনে প্রায় চার থেকে পাঁচ হাজার টাকার বিভিন্ন ধরনের বই বিক্রি করতেন। কিন্তু হরতালে মাথায় হাত পড়েছে। দেড় হাজার টাকার বেশি বিক্রি হচ্ছে না দিনে।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন