বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সেদিন লঞ্চ থেকে কীভাবে বেঁচে ফিরলেন, সে কথা জানালেন মেহেরিনা। গতকাল মঙ্গলবার মুঠোফোনে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। লঞ্চ থেকে নামতে গিয়ে পা মচকে যাওয়ায় এক পা প্লাস্টার করে রাখা হয়েছে তাঁর। চিকিৎসকের পরামর্শে ১৪ দিন পর খুলতে হবে প্লাস্টার। মচকে যাওয়া পায়ের ফোলা কমছে না। কিন্তু শারীরিক যন্ত্রণার চেয়ে মেহেরিনা ও তাঁর স্বামীর মানসিক ধকলটা বেশি যাচ্ছে। তিনি বলেন, বাড়ি ফেরার পর থেকে প্রতিদিন আত্মীয়স্বজনসহ অনেক মানুষ আসছেন সেদিনের ঘটনা জানার জন্য। বারবার সেই কথা বলতে হচ্ছে। চেষ্টা করলেও বা মনেপ্রাণে চাইলেও ভুলতে পারছেন না ঘটনাটি।

এ বিষয়ে মেহেরিনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে কিছু কথা লিখে পোস্ট দিয়েছেন। মেহেরিনার নিজের বাড়ি বরগুনা আর স্বামীর বাড়ি শরীয়তপুরে। বললেন, তাঁরা সাধারণত লঞ্চেই যাতায়াত করেন। ২৩ ডিসেম্বর রাত আনুমানিক আড়াইটার মতো। হুট করে ঘুম ভেঙে যায়। ওয়াশরুম থেকে ফেরার পর মেয়েকে দুধ বানিয়ে খাওয়ান। তারপর ঘুমের প্রস্তুতি নেন। এরপর হঠাৎ চিৎকার চেঁচামেচি শুনে প্রথমে ভেবেছিলেন লঞ্চে ডাকাত এসেছে। অথবা পানিতে পড়ে কেউ মারা গেছে। কৌতূহল নিয়ে তিনতলার কেবিনের সামনের রেলিং থেকে উঁকি দিয়ে দেখেন, নিচে আগুন।

default-image

মেহেরিনা বলেন, ‘শুধু মাথায় ছিল, বাঁচতে হবে। আর বেঁচে গেলে মুঠোফোনটা লাগবে। তাই রুমে ঢুকে মেয়েকে কোলে নিলাম আর ফোন হাতে নিলাম। ততক্ষণে সবাই বাঁচার জন্য মরিয়া হয়ে গেছে। আগুন থেকে বাঁচতে লঞ্চের তিনতলা থেকে মেয়েকে নিয়ে নদীতে ঝাঁপ দিলে বাঁচার কোনো সম্ভাবনাই থাকবে না এটি মাথায় ছিল। চোখের সামনেই এক নারী পরনের শাড়ি খুলে তা রেলিংয়ে বেঁধে নিচে নামেন। মেয়েকে নিজের ওড়নায় পেঁচিয়ে স্বামীর শরীরের সঙ্গে বেঁধে দিই। মুঠোফোনটিও ওড়নায় বেঁধে দিই। তওবা পড়ে মারা যাচ্ছি তার অপেক্ষা করতে থাকি।’

মুঠোফোনে মেহেরিনা বললেন, ‘মেয়ের বাবা বলছিলেন, পানিতে নামতে হলেও লঞ্চের নিচতলা থেকে লাফ দিতে হবে। এই বলে স্বামী পরনের জিনসের প্যান্ট খুলে ফেলেন। ভয়াবহ কালো ধোঁয়ার মধ্যে আগুনের হল্কা। মেয়ে শ্বাস নিতে পারছে না। রেলিংয়ে ঝোলানো শাড়ি দোতলা পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়ে গেছে। অন্ধকারে কিছুই দেখতে পারছিলাম না। এ সময় কেউ একজন এক টানে আমাকে নিচের ফ্লোরে নামিয়ে আনেন। লঞ্চের উল্টো পাশ থেকে মানুষ চিৎকার করে সেদিকে যেতে বলেন। ওপাশে গিয়েই নিচে লাফ দিলাম। কাদার মধ্যে পা আটকে মচকে গেল। আমরা নামার পরেই সিলিন্ডারের বিস্ফোরণ হয়। শুধু চিন্তা করছিলাম, কয়েক সেকেন্ড আগে–পরে হলেই সবাই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যেতাম। এটুকুই সান্ত্বনা যে মেয়েটা এসবের কিছুই বুঝতে পারেনি বা বড় হয়ে এ ঘটনা তাঁর মনেও থাকবে না।’

মেহেরিনা জানান, রাত আনুমানিক সাড়ে তিনটার দিকে ভাইকে ফোন করে শুধু ঘটনার কথা বলতে পেরেছিলেন। সেই রাতে নদীর পাড়ের একটি গ্রামের মানুষ কাপড় দিয়ে ও অন্যান্যভাবে সহায়তা করেন তাঁদের।

কথার ফাঁকে মেহেরিনা বলেন, শারীরিক ক্ষত হয়তো শুকিয়ে যাবে, কিন্তু মানসিক যে ক্ষত, যে ভয়, তা সারা জীবনেও হয়তো ভুলতে পারবেন না। দুর্ঘটনার পর থেকে রাতে ঘুম হচ্ছে না। এক ধরনের ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা।

বেসরকারি একটি সংস্থায় কর্মরত স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় থাকেন মেহেরিনা। তিনি নিজে অনলাইন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তাই জীবিকার তাগিদে ঢাকায় ফিরতেই হবে। আবার লঞ্চেই ফিরবেন কি না, জানতে চাইলে মেহেরিনা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেন, বাচ্চাকে নিয়ে বাসে যাতায়াত করা খুব কঠিন। সেই তুলনায় লঞ্চে যাতায়াত সহজ। হয়তো আবার লঞ্চেই ঢাকায় ফিরব। তবে সমস্যা হলো, এদিকে যাতায়াতের ভালো লঞ্চ নেই। আল্লাহর নামে যাত্রীদের পানিতে ছেড়ে দেয়। সেদিনও লঞ্চে চড়ার পর থেকেই ইঞ্জিনের শব্দটা কেমন যেন লেগেছিল। স্বামীর সঙ্গে এ নিয়ে কথাও বলেছিলেন। তারপর তো যা ঘটল—আমাদের পরিবারের আর কারও এমন ভয়ংকর অভিজ্ঞতা নেই। মেহেরিনা বলেন, ‘আল্লাহ আমাদের তিনজনকে বাঁচিয়েছেন এখন এটাই বড় খবর।’

default-image

মেহেরিনা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ঘটনার পর লঞ্চ কর্তৃপক্ষের কেউ যাত্রীদের সাহস বা ভরসা দিতে আসেননি। কেবিন থেকে যাত্রীদের ডেকে বের করারও কেউ ছিলেন না। পরে জানা গেছে, লঞ্চের কর্মীরা নাকি আগেই নেমে গিয়েছিলেন।

এ ঘটনায় দায়ীদের শাস্তি চান কি না, জানতে চাইলে মেহেরিনা বলেন, বৃহস্পতিবার ঈদের ছুটির মতো যাত্রী নেয় লঞ্চগুলো। সেদিনও মেঝেতে মানুষ ঘুমিয়ে ছিল। কোনো নিয়মকানুনের বালাই নেই। আর বিচার বা সাজা চেয়ে লাভ কী, সাজা আদৌ হবে?
লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনায় নৌ আদালতে যে মামলা হয়, তাতে বলা হয়েছে, লঞ্চটিতে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র, বয়া ও বালুর বাক্স ছিল না। এ ছাড়া ইঞ্জিনকক্ষের বাইরে অননুমোদিতভাবে ডিজেলবোঝাই বেশ কয়েকটি ড্রাম রাখা ছিল। ইঞ্জিনকক্ষের পাশে রান্নার জন্য গ্যাসের সিলিন্ডার (বিপজ্জনক দাহ্য পদার্থ) রাখা হয়েছিল। একই সঙ্গে লঞ্চটি অননুমোদিত লোকবল দিয়ে পরিচালনা করা হচ্ছিল বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগ প্রমাণিত হলে আসামিদের সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম বা বিনা শ্রম কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। ইতিমধ্যে এমভি অভিযান-১০ লঞ্চের মালিক মো. হামজালাল শেখকে ঢাকার কেরানীগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব।

এ ছাড়া এই নৌ–দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে গতকাল মঙ্গলবার করা পৃথক দুটি রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রুলসহ একটি আদেশ দিয়েছেন। এতে সব লঞ্চ-জাহাজের ইঞ্জিনের অবস্থাসহ নৌযানের ফিটনেসের বিষয় জানিয়ে ৯০ দিনের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। হতাহত ব্যক্তিদের তালিকাও আদালতে দাখিল করতে বলা হয়েছে। আদালত বলেছেন, ভুক্তভোগী কারও আর্থিক সাহায্যের প্রয়োজন হলে বরগুনা, ঝালকাঠি, বরিশালসহ সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের কাছে আবেদন করবেন। সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক ওই আবেদন বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা দিতে ত্বরিত ব্যবস্থা নেবেন।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন