default-image

হত্যাচেষ্টার মামলায় সিকদার গ্রুপের এমডি রন হক সিকদার ও তাঁর ভাই দিপু হক সিকদারের আগাম জামিন আবেদন খারিজ করে দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। সেই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করার অনুমতি চেয়ে তাঁদের করা আবেদনের (অ্যাফিডেভিট দায়েরে অনুমতি চেয়ে আবেদন) শুনানি আজ রোববার মুলতবি করেছেন আপিল বিভাগ। তাঁদের আইনজীবীর সময়ের আরজির পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন ছয় সদস্যের ভার্চ্যুয়াল আপিল বিভাগ দুই সপ্তাহের জন্য শুনানি মুলতবি করেন।

এক্সিম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ (এমডি) দুজনকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে করা মামলায় দুই ভাই দেশের বাইরে থেকে হাইকোর্টে আগাম জামিন চেয়ে আবেদন করেছিলেন। ২০ জুলাই হাইকোর্টের ভার্চ্যুয়াল বেঞ্চ তা খারিজ করে দেন। সেদিন হাইকোর্ট আবেদনকারী দুই ভাইকে জরিমানা হিসেবে করোনা রোগীদের সেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক ও নার্সদের জন্য ১০ হাজার ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী (পিপিই) দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে জমা দিতে নির্দেশ দেন। আইন ও সংবিধানপরিপন্থী দরখাস্ত (জামিন আবেদন) এনে আদালতের মূল্যবান সময় অপচয় করায় ওই জরিমানা করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য, হাইকোর্টের আদেশ ও পর্যবেক্ষণের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন (সিএমপি) করার অনুমতি চেয়ে দুই ভাইয়ের পক্ষে ২৭ জুলাই একটি আবেদন (অ্যাফিডেভিট দায়েরে অনুমতি চেয়ে আবেদন) সংশ্লিষ্ট শাখায় করা হয়। অনুমতির ওই আবেদনটি পরদিন আপিল বিভাগের চেম্বার কোর্টে শুনানির জন্য ওঠে। সেদিন ভার্চ্যুয়াল চেম্বার কোর্ট আবেদনটি শুনানির জন্য ৯ আগস্ট আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে পাঠান। এর ধারাবাহিকতায় আজ রোববার বিষয়টি কার্যতালিকায় ওঠে। আদালতে সময়ের আরজি জানান আইনজীবী আজমালুল হোসেন কিউসি, সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ মামুন।

পরে সাইফুল্লাহ মামুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আপিল বিভাগে আবেদন করার জন্য অনুমতি চেয়ে যখন আবেদন করা হয়, তখন হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ আদেশ পাইনি। শনিবার রাতে হাইকোর্টের আদেশ সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ হয়। এই আদেশ পর্যালোচনার জন্য দুই সপ্তাহ সময় চাওয়া হয়। আদালত দুই সপ্তাহের জন্য শুনানি মুলতবি করেছেন।’

‘নজিরবিহীন আগাম জামিন আবেদন’

সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে দেখা যায়, দুই ভাইয়ের জামিন আবেদন খারিজ করে বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের ভার্চ্যুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ আদেশটি ১১২ পৃষ্ঠার। বিভিন্ন নজির ও তথ্য পর্যালোচনা করে আদেশে বলা হয়, এমন নজিরবিহীন আগাম জামিনের দরখাস্ত পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম।

দরখাস্ত পর্যালোচনা করে আদালত বলেছেন, ‘এটি কাচের মতো স্পষ্ট যে দরখাস্তকারীদের (দুই ভাই) সঙ্গে বর্তমান সরকারের কোনো বিরোধ নেই। তাঁদের বিরুদ্ধে সরকার কোনো প্রকার বিরূপ আচরণ করেছেন মর্মে কোনো কিছু দরখাস্তকারীরা দেখাতে পারেননি। তাহলে কেন দরখাস্তকারীরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে বর্তমান সরকার ও তার প্রশাসনযন্ত্র দরখাস্তকারীদের সঙ্গে বিমানবন্দরে বেআইনি আচরণ করবেন?’

জামিন আবেদন পর্যালোচনা করে আদেশে বলা হয়, দরখাস্তকারীরা দরখাস্তে বলেছেন যে তাঁদের প্রতিপক্ষ ব্যবসায়ী গ্রুপ সরকারের সব প্রশাসনযন্ত্রকে ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ করে দরখাস্তকারীদের হয়রানি করবে। এমন বক্তব্য প্রকারান্তরে সরকার এবং সরকারের প্রশাসনযন্ত্রের বিরুদ্ধে সরাসরি অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ। দরখাস্তকারীর বক্তব্যমতে, সরকার এবং সরকারের সব প্রশাসনযন্ত্রের কোনো প্রকার ক্ষমতা নেই, বরং সরকার এবং সরকারের সব প্রশাসনযন্ত্র দরখাস্তকারীর ব্যবসায়ী প্রতিপক্ষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। দরখাস্তকারীদের এমনতর বক্তব্য সরকার এবং তার সব প্রশাসনযন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি মারাত্মক অভিযোগ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।

আদেশে বলা হয়, আইন ও বিধিমোতাবেক বিদেশ থেকে আগাম জামিনের দরখাস্ত করার কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের বেআইনি এবং নীতিনৈতিকতা–বহির্ভূত দরখাস্ত পরিত্যাজ্য। এ ছাড়া আইন, বিধি ও প্র্যাকটিস ডিরেকশন মোতাবেক বাংলাদেশের সীমানার বাইরে থেকে আদালতে অ্যাডভোকেট (আইনজীবী) হিসেবে বক্তব্য এবং যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশের সীমানার বাইরে থেকে অ্যাডভোকেট হিসেবে মামলা পরিচালনাও বেআইনি এবং নীতিনৈতিকতা–বহির্ভূত।

উল্লেখ্য, গত ১৯ মে গুলশান থানায় ওই মামলা করে এক্সিম ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়, গত ৭ মে ঘটনাটি ঘটে। পুরো ঘটনাটি ৫০০ কোটি টাকা ঋণ প্রস্তাব নিয়ে। এই ঋণের বিপরীতে বন্ধকি সম্পত্তি পরিদর্শনের নামে এক্সিম ব্যাংকের দুই কর্মকর্তাকে ডেকে আনা হয়েছিল। এ সময় জামানত হিসেবে ওই সম্পত্তির বন্ধকি মূল্য কম উল্লেখ করেন ব্যাংকটির এমডি ও অতিরিক্ত এমডি। এরপরই গুলি ও মারধরের ঘটনা ঘটে। রন হক সিকদার ও দিপু হক সিকদার ব্যাংকটির এমডির কাছে একটি সাদা কাগজে জোর করে স্বাক্ষর নেন। মামলার পর ২৫ মে দুই ভাই নিজেদের মালিকানাধীন আরঅ্যান্ডআর অ্যাভিয়েশনের একটি উড়োজাহাজকে ‘রোগীবাহী’ হিসেবে দেখিয়ে ব্যাংককের উদ্দেশে দেশ ছাড়েন।

আইনজীবী সূত্রের তথ্য, ওই মামলায় দুই ভাইয়ের আগাম জামিন চেয়ে গত ২ জুলাই ই-মেইলের মাধ্যমে হাইকোর্টের একটি ভার্চ্যুয়াল বেঞ্চে আবেদন জমা দেওয়া হয়, যার ওপর ২০ জুলাই হাইকোর্টে শুনানি হয়। সেদিন আবেদনকারীর আইনজীবী আজমালুল হোসেন কিউসি আদালতে বলেন, সব ধরনের অনুমতি নিয়ে তাঁরা ২৫ মে থাইল্যান্ডে যান, সেখানে আছেন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0