default-image

‘বাঘের মুখোশ’ আছে? হঠাৎ প্রশ্নটা শুনে খটকা লাগল। ভুল শুনলাম না তো! বইয়ের মেলায় এই কিশোরী বাঘের মুখোশ খুঁজছে কেন? ভুল ভাঙল একটু পরেই। যখন বিক্রয় প্রতিনিধি কিশোরীর হাতে ঝকঝকে প্রচ্ছদে রকিব হাসানের লেখা তিন গোয়েন্দার বই বাঘের মুখোশ তুলে দেন। বইটি প্রকাশ করেছে প্রথমা প্রকাশন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মেলা প্রাঙ্গণের ঠিক উত্তর পাশের ৪২১ থেকে ৪২৩ নম্বর এই স্টলটির সামনে তরুণ-তরুণীর ভিড় প্রমাণ দেয়, প্রকাশনাশিল্পের সুবর্ণ দিন এসে গেছে।
তখন বেলা ৩টা ১৫ মিনিট। একটু আগেই মেলার ঝাঁপি খুলেছে। তার আগেই মেলায় প্রবেশের জন্য তরুণ-তরুণী এমনকি স্কুল-পোশাকের কিশোর-কিশোরীদের দীর্ঘ সারি জানান দিচ্ছে, বসন্ত শুধু প্রকৃতিতে নয়, মেলায়ও এসেছে।
তখনো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের খোলা চত্বরে চৈত্রের রোদের বেশ দাপট। যাঁরা রোদচশমা নিয়ে এসেছিলেন, তাঁদের জন্য কিছু স্বস্তির হলেও অন্যদের জন্য পরিবেশটা মোটেও সুখকর ছিল না। তবু এসব উপেক্ষা করে তালিকা হাতে বই কিনেছে মানুষ। বাংলা একাডেমির সমন্বয় ও জনসংযোগ উপবিভাগের তথ্যমতে মেলার ২৪তম দিনে ৮৩টি নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে।
বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা
বইয়ের ব্যবসা লাভজনক নয় জেনেও যাঁরা ব্যবসা করেন, তাঁরা সত্যিই মহৎ—প্রাবন্ধিক সরদার জয়েনউদদীনের এ মন্তব্য মেলার মাঠের মাঝখানে ব্যানারে তুলে ধরা হয়েছে। মেলায় ঢুকে এ মন্তব্যটি চোখে পড়ে। এই মহৎ কাজে প্রেরণা দেওয়ার জন্য পাঠক কিংবা অনুরাগীরা ভূমিকা রাখছেন। সন্ধ্যায় বাংলা একাডেমির স্টলে বসে ভক্তদের সংগ্রহ করা নতুন বইয়ে অটোগ্রাফ দিচ্ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। কিছুটা কৌতুকের সুরেই বলছিলেন, ‘যারা অটোগ্রাফ নিতে আসছে, তাদের বলে দিয়েছি নতুন বই কিনে আনো, খালি খাতা কিংবা ডায়েরিতে অটোগ্রাফ দেব না!’ কৌতুকের ছলে বললেও জনপ্রিয় এই মানুষটির কথায় কাজ হলো। দেখা গেল, ভক্তরা বাংলা একাডেমিসহ বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে বই কিনে এনে প্রিয় মানুষটির অটোগ্রাফ নিচ্ছেন। আক্ষেপ করে মন্ত্রী বললেন, ব্যস্ততার কারণে ঘুরেফিরে বই কিনতে পারছি না। পরে তিনি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মনজুরুর রহমান এবং বাংলা একাডেমির সচিব আলতাফ হোসেনকে নিয়ে মেলা ঘুরে দেখেন।
সত্যিকার অর্থে ‘মহৎ কাজটিই করছেন প্রকাশকেরা’—বলছিলেন চট্টগ্রামের রাউজান থেকে আসা দীপানন্দ ভিক্ষু। গেরুয়া বসনের এই ধর্মানুরাগী কিনেছেন প্রথমা প্রকাশন থেকে আসা সৈয়দ আবুল মকসুদের রবীন্দ্রনাথের ধর্মতত্ত্ব ও দর্শনসহ বেশ কিছু গবেষণাধর্মী বই। তার পাশের মানুষটি সংঘানন্দ ভিক্ষু। এসেছেন সিলেট থেকে। কিনেছেন একই প্রতিষ্ঠান থেকে আসা কীর্তিমান বাঙালি সিরিজ আবুল মোমেনের ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মালেকা বেগমের সুফিয়া কামাল, বিপ্লব বালার মাইকেল মধুসূদন দত্ত এবং সংহতি প্রকাশন থেকে আসা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর লেখা জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি। দীপানন্দ ভিক্ষু বললেন, বই কেনার জন্যই তাঁরা দুজন মেলায় এসেছেন। সারা বছর বইয়ের চাহিদাটা অমর একুশে গ্রন্থমেলা থেকেই পূরণ করেন তাঁরা।
একুশে গ্রন্থমেলায় বই বিক্রি আর নতুন বই প্রকাশের জোয়ার উঠলেও সারা বছরই এই ধারা অব্যাহত থাকুক—এমনটি মন্তব্য করলেন অনুষ্ঠাননির্মাতা, উপস্থাপক ও চিকিৎসক আব্দুন নূর তুষার। বিকেলে মেয়েকে নিয়ে এসেছিলেন মেলায়। বললেন, আসলে শুধু একটি মাসের ব্যবসার ওপর নির্ভর করে কোনো শিল্প চলতে পারে না। এখন ধারণা বদলে গেছে। একুশের মেলার পর সারা বছর ছোট-বড় মেলার আয়োজন করা হয়। তিনি জানান, ইচ্ছে করে মেলায় নতুন বই না এনে বছরের অন্য মাসে বই প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
মন ভালো করে দেওয়া একটি দৃশ্য
বয়স ছয়-সাত থেকে পনেরো কিংবা ষোলো। সংখ্যায় ওরা ৪০ জন। ছেলেদের লাল শার্ট, লাল প্যান্ট। দুই বেণি করা মেয়েরা লাল সালোয়ার-কামিজ পরেছে। সবার হাতে পাঁচটি করে বই। ওরা সবাই ধানমন্ডির একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সুরভীর সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থী। তাদের একজন জানাল, আহমদ পাবলিশিং হাউস থেকে তাদের মেলায় আমন্ত্রণ জানানো হয়। আহমদ পাবলিশিং হাউসের পরিচালক মেজবাউদ্দিন আহমদ বললেন, ‘এত বড় একটি মেলা হচ্ছে অথচ ওরা মেলায় আসবে না কিংবা নতুন বইয়ের গন্ধে বিভোর হবে না, তা হয় না। এ উপলব্ধি থেকে আমরা উদ্যোগ নিয়েছি, আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত অন্তত পাঁচটি বই ওদের উপহার দেব। আমার বিশ্বাস, অন্যরা এতে উৎসাহ পাবে।’
সময় বাড়ানোর দাবি
বরাবরের মতো এবারও বইমেলার সময় বাড়ানোর দাবি উঠেছে। গতকাল মঙ্গলবার অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশকদের এ দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হতে দেখা গেছে। বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির পক্ষ থেকে গতকাল একাডেমি বরাবর আবেদনে বলা হয়, সামগ্রিকভাবে দেশের এই প্রাণের গ্রন্থমেলাতে জনসাধারণকে অবারিতভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ প্রদানের এবং মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশকদের আর্থিক ক্ষতি কিছুটা পূরণের জন্য অমর একুশে গ্রন্থমেলার সময়সীমা ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে বৃদ্ধি করে ৭ মার্চ পর্যন্ত করা হোক।
মেলায় নতুন বই
মেলায় প্রথমা প্রকাশন এনেছে অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের বিপুলা পৃথিবী ও ডা. প্রণব কুমার চৌধুরীর লেখা তুমি কীভাবে ভালো থাকবে: শৈশব ও বয়ঃসন্ধিকালের স্বাস্থ্যবিধি। অ্যাডর্ন এনেছে নাশিদ কামালের প্রবন্ধ সংকলন দ্য গার্ডেন অব এররস ও মোহাম্মদ শফিকুল ইসলামের কবিতার বই উইংস অব উইন্ড। কাকলী এনেছে দন্ত্যস রওশনের সাধুর পাখিরা, ঐতিহ্য এনেছে আমিন আল রশীদের সরকারী বিরোধী দল: দশম সংসদের প্রথম বছর।
মেলায় আসা চেনাজনেরা
ইতিহাসবিদ লেখক মুনতাসীর মামুনকে দেখা গেল নতুন বইয়ের সন্ধানে মেলায় ঘুরে বেড়াতে। অন্যপ্রকাশের স্টলে হুমায়ূন আহমেদের লেখা বইয়ে অটোগ্রাফ দিয়েছেন মেহের আফরোজ শাওন। সঙ্গে দুই ছেলে নিষাদ, নিনিত। কাকলী প্রকাশনীতে বসে নিজের বইতে অটোগ্রাফ দিয়েছেন ইমদাদুল হক মিলন।
বিকেলে মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ৬৪ জেলাভিত্তিক ‘বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা’ শীর্ষক আলোচনা। আয়োজনে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক মাহবুবুল হক। আলোচনায় অংশ নেন অধ্যাপক গোলাম কিবরিয়া ভূঁইয়া, মুহম্মদ শহীদ উজ জামান, অধ্যাপক মির্জা তাসলিমা সুলতানা এবং অধ্যাপক মাহবুবা নাসরীন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতিসচিব রণজিৎ কুমার বিশ্বাস।
সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আবৃত্তি শোনান হাসান আরিফ ও শাহাদাৎ হোসেন।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন