বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মাইকেল কুগলম্যান বলেন, তালেবানের প্রত্যাবর্তনের ফলে দক্ষিণ এশিয়ার জন্য দুটি ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর একটি হচ্ছে সন্ত্রাসবাদ। দ্বিতীয়টি হলো এ অঞ্চলের দেশগুলোর সংযুক্তিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে। এমনিতেই দক্ষিণ এশিয়ায় সংযুক্তির দুর্বলতার কারণে ব্যবসা–বাণিজ্য প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম। এ ক্ষেত্রে সেটা আরও পিছিয়ে গেল।

মার্কিন এই বিশ্লেষক বলেন, তালেবানের ক্ষমতায় ফেরার ফলে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীদের দেশটিতে জড়ো হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এটা শুধু প্রতিবেশী পাকিস্তান বা ভারতেই নয়, বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোতে জিহাদি নেটওয়ার্কের বিস্তৃতি লাভের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। জিহাদি নেটওয়ার্কের ওই দেশগুলোর সদস্যরা আফগানিস্তানে যাবে এবং প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজের দেশে ফিরে যাবে। ১৯৮০–এর দশকে বাংলাদেশ থেকে লোকজন আফগানিস্তানে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরে সংগঠিত হয়েছিল।

মাইকেল কুগলম্যান মনে করেন, আফগানিস্তানে ক্ষমতার পালাবদলের ফলে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ের পর গণহারে আফগান লোকজনের পাকিস্তানে শরণার্থী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই লোকজনের মধ্য থেকে কেউ কেউ পাকিস্তানের তালেবানের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। পাশাপাশি আফগানিস্তানে মাদকের বিস্তৃতি ঘটতে পারে। সব মিলিয়ে একধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে। এই অস্থিতিশীলতা দূর করতে হলে আঞ্চলিক দেশগুলোর সক্রিয় সহযোগিতা দরকার।

ওয়াশিংটনভিত্তিক আরেক নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান হাডসন ইনস্টিটিউটের মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো ও পরিচালক হোসেন হাক্কানি বলেন, এখন পর্যন্ত তালেবানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। ভবিষ্যতেও হবে না। তবে টিকে থাকতে হলে আফগানিস্তানের সরকারের অর্থাৎ এই মুহূর্তে তালেবানের বাইরের সহায়তা লাগবেই। পাকিস্তান একমাত্র দেশ, যাদের সঙ্গে অতীতে তালেবানের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল। এখন চীন ও রাশিয়া পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। যদিও স্বীকৃতির বিষয়ে পাকিস্তান এখন পর্যন্ত একধরনের অস্পষ্টতা রেখে চলেছে। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, পাকিস্তান এবারও তালেবানের পাশে থাকবে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, রাশিয়া, চীন এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলোকে পাকিস্তান বোঝানোর চেষ্টা করবে, আফগানিস্তান যেন তার ওপর বোঝা তৈরি না করে, তাতে অস্থিতিশীলতা বাড়বে।

ওয়াশিংটনে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত হোসেন হাক্কানি বলেন, আফগানিস্তানে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সময় অর্থাৎ শান্তি আলোচনায় তালেবানের পক্ষ থেকে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা পিছিয়ে পড়েছেন। ক্ষমতার কেন্দ্রে এসেছেন রক্ষণশীল বা কট্টরপন্থীরা।

দিল্লির গবেষণা প্রতিষ্ঠান অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের কৌশলগত অধ্যয়ন কর্মসূচির প্রধান হর্ষ পন্থ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হুটহাট আফগানিস্তান থেকে চলে যাওয়াটা স্থায়ীভাবে না হলেও সাময়িকভাবে প্রভাব ফেলেছে। এটি সরাসরি ফেলেছে। সন্ত্রাসবাদের বিষয়ে একধরনের ঐকমত্য রয়েছে। তালেবান ফেরায় চীনের শেনজেন, ভারতের কাশ্মীর ও পাকিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চাঙা হওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। আবার তালেবানের প্রত্যাবর্তনে চীন-পাকিস্তান জোট সুদৃঢ় হবে।
তাঁর মতে, কোয়াড থাকার পরও যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন জোট (অকাস) এবং আফগানিস্তান থেকে বিদায় ভারতের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিমের প্রতি সংবেদনশীল না থাকে, তাহলে পূর্বাঞ্চলে তার মিত্ররা কেনই–বা দেশটির প্রতি সংবেদনশীল থাকবে? শুধু ভারত নয়, যুক্তরাষ্ট্রের আরও কিছু মিত্র অকাস চুক্তি নিয়ে বিস্মিত হয়েছে।

নিরাপত্তাবিষয়ক আন্তরাষ্ট্রীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওএসসিইর ফেলো নিভা ইয়াও ইয়ান বলেন, চীন শুরু থেকেই, বিশেষ করে গত ১৫ আগস্টের আগে থেকেই তালেবানকে অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়ে আসছিল। ফলে তালেবান সে পথে না যাওয়ায় চীনের সঙ্গে তালেবানের সত্যিকার অর্থেই উষ্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। এমনকি ১৫ আগস্টের আগে চীন বলে এসেছে, তালেবান যেন একটি ভালো ইসলামি ব্যবস্থা চালু করে। কাবুল পতনের পর কাতার, তুরস্কসহ কয়েকটি দেশ তালেবানকে ভালো ইসলামি ব্যবস্থা গঠনের কথা বলেছে। কিন্তু এসব আহ্বান কাজ করেনি।

কিরগিজস্তানের এই গবেষক মনে করেন, তালেবানের প্রত্যাবর্তনকে চীনের আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ—এই দুই প্রেক্ষাপটে মোকাবিলা করতে হয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের চলে যাওয়াকে পরাজয় হিসেবে তুলে ধরেছে। আবার তালেবান যে যুদ্ধবাজ বা সন্ত্রাসী নয়, এটাও চীন তুলে ধরতে চেয়েছে। এর ফলে চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, তালেবান কী? তারা কি সন্ত্রাসী? তাদের সঙ্গে চীন কেন আলোচনায় বসেছে? এর পরপরই চীন তাদের সুর বদলে বলতে শুরু করেছে। তারা বলছে, আফগানিস্তানের নতুন সরকার। তালেবান কথাটা এখন আর তারা বলছে না।

ইস্তাম্বুলের কোচ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক মুরাত সোমের বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের তাড়াহুড়া করে আফগানিস্তান থেকে চলে যাওয়াটা মুসলিম বিশ্ব ভালোভাবে নেয়নি। বাইডেন সরকারের সামর্থ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ওয়াশিংটনের সামর্থ্যের যেই বার্তা পাওয়া যাচ্ছে, সেটা ইতিবাচক নয়। আফগানিস্তানের এই পালাবদল ইসলামের ভবিষ্যৎ, আফগানিস্তান ও ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সিঙ্গাপুরের ইংরেজি দৈনিক দ্য স্ট্রেইট টাইমসের ওয়াশিংটন ব্যুরো প্রধান নির্মল ঘোষ ওই ওয়েবিনার সঞ্চালনা করেন।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন