সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার-মেহেরুন রুনি হত্যার তিন বছর পূর্ণ হলো আজ ১১ ফেব্রুয়ারি। এই তিন বছরে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে ৩২ বার আদালত থেকে সময় নিয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে ১১৬ জনকে। কিন্তু তদন্ত শেষ হয়নি।
মামলার আলামত যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণাগারে পাঠিয়ে সন্দেহভাজন খুনির ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। সেই ডিএনএ নমুনার সঙ্গে মেলানোর জন্য ২১ জনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে তা যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু খুনি হিসেবে কাউকে শনাক্ত করার মতো কোনো তথ্য-প্রমাণ মেলেনি।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ভোরে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসা থেকে ওই দম্পতির লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহত সাগর সরওয়ার মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক এবং মেহেরুন রুনি এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ছিলেন। লাশ উদ্ধারের দিন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা হবে বলে ঘোষণা দেন। পরবর্তী সময়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরাও খুনিদের গ্রেপ্তারের আশা দিয়েছেন। কিন্তু হয়নি। ওই বছরের ১৮ এপ্রিল মামলার তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ আদালতে গিয়ে তদন্তে ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে। পরে উচ্চ আদালত র্যাবকে এ মামলা তদন্ত করার নির্দেশ দেন। এখন তদন্তভার র্যাবের কাছে। কিন্তু তদন্ত কার্যক্রম কার্যত থেমে রয়েছে।
মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা র্যাবের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) ওয়ারেস আলী বলেন, সাগর-রুনির পরিধেয় বস্ত্র, ছুরি ও ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া অন্যান্য আলামত থেকে নিহত দুজন ছাড়া আরও দুই পুরুষের ডিএনএ নমুনা পাওয়া গেছে। এই দুজন খুনের সঙ্গে জড়িত বলে তাঁদের সন্দেহ। ওই দুজনের পরিচয় উদ্ঘাটনের জন্য সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার আটজনসহ ২১ জনের ডিএনএ নমুনা যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়েছিল। তবে ওই দুই পুরুষের ডিএনএ নমুনার সঙ্গে কারও নমুনাই মেলেনি। জানা যায়নি তাঁদের পরিচয়। গত বছরের ২৫ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র থেকে সর্বশেষ ডিএনএ প্রতিবেদন আসে।
র্যাব কর্মকর্তারা জানান, এরপর আদালতে প্রতিবেদন জমা দিতে সময় চাওয়ার আবেদন ছাড়া আসলে তদন্তে কোনো তৎপরতা নেই। তাঁরা জানান, এ মামলায় সন্দেহের বশে আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যাঁদের সাতজন কারাগারে রয়েছেন। এঁরা হলেন রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, মো. সাইদ, মিন্টু, কামরুল হাসান ওরফে অরুণ, সাগর-রুনির ভাড়া বাসার নিরাপত্তাকর্মী এনামুল ও পলাশ রুদ্র পাল এবং নিহত দম্পতির বন্ধু তানভীর রহমান। এঁদের প্রথম পাঁচজন ২০১২ সালের আগস্টে মহাখালীর বক্ষব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসক নারায়ণ চন্দ্র হত্যার ঘটনায় র্যাব ও ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। পরে তাঁদের এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পলাশ রুদ্র হাইকোর্ট থেকে জামিন পেলেও ৮ ফেব্রুয়ারি চেম্বার জজ আদালত তা স্থগিত করেন। গত বছরের ডিসেম্বরে জামিনে কারাগার থেকে মুক্তি পান তানভীর।
নিকটজন থেকে দুর্বৃত্ত-তত্ত্ব: হত্যাকাণ্ডের সময় ওই বাসায় নিহত দম্পতির পাঁচ বছরের ছেলে মাহির সরওয়ার মেঘ ছিল। ঘটনার পরে রুনির মা নুরুন্নাহার মির্জা সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ওই দিন সকাল সাড়ে সাতটার দিকে মেঘ তাঁকে ফোন করে বলে, ‘আমার মিম্মি (মা) ও বাবা মারা গেছে।’ এরপর স্বজনেরা এলে মেঘ দরজার ছিটকিনি খুলে।
নিহত দম্পতির লাশ ছিল শয়নকক্ষে। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, মেঝেতে থকথকে রক্ত ছিল। সাগরের হাত ও পা কাপড় দিয়ে বাঁধা ছিল। রুনির হাত-পা বাঁধা ছিল না। পাঁচতলার ওই বাসার রান্নাঘরের জানালার গ্রিলের পাত খুলে বা কেটে সাত-আট ইঞ্চি চওড়া ফোকর ছিল।
ঘটনার পর পুলিশ ও র্যাব প্রথমেই সাগর-রুনির পরিচিত ও নিকটাত্মীয়দের সন্দেহ করেছিল। তাঁদের আটক করে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদও করে ডিবি ও র্যাব। পরে তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ধারণা করেন, চুরি বা ডাকাতির উদ্দেশে ঢুকে কোনো দুর্বৃত্ত দল এ ঘটনা ঘটিয়েছে। দুর্বৃত্তরা রান্নাঘরের গ্রিলে ফোকর করে সেদিক দিয়ে যাতায়াত করেছে। কিন্তু কোনো ধারণাই প্রমাণ হয়নি তিন বছরেও।
মামলার বাদী ও রুনির ভাই নওশের আলম গতকাল মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা আশা ছেড়ে দিয়েছেন। মেঘ এখন বাবা-মা হারানোর কষ্ট বুঝতে পারছে। আগে কান্নাকাটি না করলেও এখন মাঝেমধ্যে বাবা-মায়ের জন্য মন খারাপ করে, কাঁদে।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন