default-image

তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে আশাবাদের কথা শুনিয়ে ঢাকা ছেড়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। চুক্তিটি সইয়ের জন্য বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ দুই পক্ষের মানুষের স্বার্থ সুরক্ষার স্বার্থে কারিগরি সমস্যা মেটানোর কথা বলেছেন। কারিগরি সমস্যার সমাধান করা এবং দুই পক্ষের স্বার্থ রক্ষার উল্লেখ করায় চুক্তিটি সইয়ের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। 
তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি সইয়ের জন্য কাজের প্রক্রিয়ায় যুক্ত ঢাকা ও দিল্লির কূটনীতিক সূত্রগুলোর সঙ্গে কথা বলে গতকাল রোববার এ আভাস পাওয়া গেছে।
এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত দুই দেশের কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তিস্তা চুক্তি সইয়ে ‘ইতিবাচক ভূমিকা’ রাখার আশ্বাস দিলেও কোনো সময়সীমার উল্লেখ করেননি। পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থ সুরক্ষা করে যে তিনি চুক্তিটি সই করতে চান, সেটি স্পষ্ট করেই বলেছেন। এতে স্পষ্ট যে, পানির এখানকার প্রবাহ হিসাব-নিকাশ করেই তিনি চুক্তিটি করবেন। আর ‘কারিগরি সমস্যা’ মেটানোর কথা বলেও স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে, সাড়ে তিন বছর আগে তিস্তা নিয়ে আলোচনা যে থমকে গিয়েছিল, সেটি আবার শুরু হবে।
বাংলাদেশ সরকারের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলছেন, ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরের পর তিস্তা নিয়ে আলোচনা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মমতার ঢাকা সফরে আলোচনার জট খুলেছে। এটাকে যদি ইতিবাচক ভেবে দেখা যায়, তবে ক্ষতি কি?
মমতার সফরসঙ্গী একাধিক গণমাধ্যমকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১১ সালে ভারতের তখনকার প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সফরের সময় তিস্তা চুক্তির খসড়া তৈরি হয়েছিল, তাতে পরিবর্তন আসতে পারে। কারণ, এ চুক্তি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের নতুন করে আলোচনার সম্ভাবনা বেশি। ফলে চুক্তিটি সইয়ে সময়ক্ষেপণের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, ওই সময় তাঁকে না জানিয়ে, পানিবণ্টনের হিসাব চূড়ান্ত করা হয়েছিল অভিযোগ এনে শেষ মুহূর্তে চুক্তিটি সইয়ের ক্ষেত্রে বাদ সাধেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এখন ভারতের বিজেপি সরকার যেহেতু চুক্তি সইয়ে মমতাকে যুক্ত করছে, কাজেই তাঁর মতামতকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হবে। যে বিষয়গুলোতে আগে তাঁর আপত্তি ছিল, সেটা সুরাহা করা হবে।
তবে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, ‘কারিগরি সমস্যার সমাধান’ বলতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ঠিক কী বোঝাতে চাইছেন, সেটি স্পষ্ট নয়। এ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য কয়েকটি বিষয় হয়তো তুলতে পারেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। এর মধ্যে হতে পারে দুই দেশের মধ্যে যে অনুপাতে পানি ভাগাভাগি করা হবে, সেটি পুনরায় খতিয়ে দেখা। হতে পারে, নদীর প্রবাহের জন্য পানি কম রেখে, সেচ কাজের জন্য পানির বরাদ্দ বাড়ানোর বিষয়টি খতিয়ে দেখা। তবে সবচেয়ে বাজে সম্ভাবনা হতে পারে, পানির প্রবাহ মাপার প্রসঙ্গটি আনা। এটি হলে অনেক বেশি সময় লাগতে পারে।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গের নদী বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্রকে দিয়ে ফের একটি সমীক্ষার কথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিবেচনা করছেন বলে ধারণা করা যায়। কারণ, এবার বাংলাদেশে এসে তিনি যে আশ্বাস দিয়েছেন সেটি বাস্তবায়নের জন্য তাঁকে কিছু কাজ করতেই হবে। আর এ কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন রাজ্যের এই বিশেষজ্ঞ।
২০১১ সালের শেষ দিকে কল্যাণ রুদ্রকে দিয়ে একটি কমিশন গঠন করে সমীক্ষার দায়িত্ব দেন মমতা। পরের বছর দুই দফায় যে প্রতিবেদন কল্যাণ রুদ্র জমা দেন, তা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পছন্দ হয়নি। মোট কথায়, কল্যাণ রুদ্র তাঁর প্রতিবেদনে কৃষির চেয়ে প্রতিবেশের ওপর বেশি গুরুত্ব দেন। তিনি নদীকে বাঁচিয়ে রাখতে নদীর প্রবাহের জন্য পানি ধরে রাখার সুপারিশ করেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী এখন তাঁকে আবার দায়িত্ব দিতে পারেন।
তবে তিস্তা নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো সময়সীমা না দেওয়ায় বাংলাদেশে এ নিয়ে একধরনের হতাশা থাকলেও মমতার ঢাকা সফরকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে দিল্লি। তাদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর এ সফরের মাধ্যমে বরফ গলার সব ইঙ্গিতই পাওয়া যায়। কারণ, একসময় যিনি চুক্তিটির সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ান, তিনিই এখন চুক্তি সইয়ের জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
মমতা নিজেও গত শনিবার রাতে ঢাকা থেকে কলকাতায় ফিরে এ সফরকে ফলপ্রসূ হিসেবে অভিহিত করেন।
তবে তাঁর এ দাবির বিরোধিতা করেছেন বিজেপির পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সভাপতি রাহুল সিনহা। গতকাল রোববার দুপুরে তিনি প্রথম আলোর কলকাতা প্রতিনিধিকে বলেন, মমতার বাংলাদেশ সফরের প্রাপ্তি ‘শূন্য’। এটা ‘আইওয়াশ’ মাত্র। রাহুল সিনহা আরও বলেন, তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির ব্যাপারে আশার বাণী শোনাতে পারেননি মমতা। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে ছিটমহল বিনিময় চুক্তি হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
রাহুল সিনহার ভাষ্য, তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি সম্পাদনের আশু সম্ভাবনা নেই। তাঁর মতে, বাংলাদেশের মানুষ এখনো মমতার ওপর ‘রুষ্ট’।
রাহুল সিনহা বলেন, বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠনকে অর্থ সরবরাহ করে তৃণমূল যে অন্যায় করেছে, তা ঢাকতেই মমতার এই বাংলাদেশ সফর।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন