default-image

পেট্রলবোমা হামলায় আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন ব্যক্তিদের ৫৮ শতাংশ মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। এ তথ্য দিয়েছে চিকিৎসা সহায়তাদানকারী আন্তর্জাতিক দাতব্য সংগঠন মেদসো সঁ ফ্রঁতিয়েখ (এমএসএফ-সীমান্ত–বিহীন চিকিৎসক দল)। সংগঠনটি অগ্নিদগ্ধ ব্যক্তিদের জখম-পরবর্তী মানসিক সমস্যার (পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার-পিটিএসডি) শুশ্রূষা দিচ্ছে। 
এমএসএফের মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, হঠাৎ আক্রমণের শিকার হওয়ায় আহত ব্যক্তিদের মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি। এ সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা দরকার। নইলে এই ভীতিজনিত মানসিক সমস্যা বড় ধরনের রোগে পরিণত হতে পারে।
তবে বার্ন ইউনিটের চিকিৎসকেরা বলছেন, অগ্নিদগ্ধ ব্যক্তিদের মানসিক সমস্যা নিয়ে তাঁরা চিন্তিত হলেও এঁদের পরিচর্যায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই।
এমএসএফের বাংলাদেশ শাখার হেড অব মিশন পার্থসারথি রাজেন্দ্রন প্রথম আলোকে জানান, গত ৩১ জানুয়ারি থেকে বার্ন ইউনিটে কাজ শুরু করেছেন তাঁরা। তাঁদের হিসাবে, বার্ন ইউনিটে ভর্তি হওয়া ৬৮ জন রোগীর মধ্যে ৪০ জন মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। এটি দুর্ঘটনায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ৫৮ শতাংশের বেশি। তিনি বলেন, হঠাৎ আক্রমণের শিকার হলে মানুষের মনে ভীতি তৈরি হয়, এটি স্বাভাবিক। এটি কারও কারও মধ্যে গভীর প্রভাব ফেলে। তাঁরাই মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হন।
এমএসএফের দুজন মনোবিজ্ঞানী এবং তিনজন কাউন্সেলর বার্ন ইউনিটের মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের এখন নিয়মিত শুশ্রূষা দিচ্ছেন। মনোবিজ্ঞানী ক্যাথরিন ম্যাকগারভা প্রথম আলোকে বলেন, ‘মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা দুর্ঘটনার স্মৃতি ভুলতে পারেন না। দুর্ঘটনার স্মৃতি মনে হলে তাঁরা দুঃস্বপ্ন দেখেন। বিচলিত হয়ে পড়েন। তাঁদের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসে ব্যাঘাত হয়। দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হওয়ার পরপরই যে এসব উপসর্গ দেখা দেবে, তা না-ও হতে পারে। এটি ধীরে ধীরে দেখা যেতে পারে।’
এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে ক্যাথরিন বলেন, মানসিক সমস্যা যদি সারানোর চেষ্টা না হয়, তবে এসব উপসর্গ স্থায়ী হয়ে যায়। যেসব কাজ করে এসব ব্যক্তি আনন্দ পেতেন বা উপভোগ করতেন, তা থেকে তাঁরা আগ্রহ হারান, অপ্রয়োজনীয় নিরাপত্তা অবলম্বন করেন, অনুভূতি কমে যায়। মাথাব্যথা হতে পারে। মেজাজ খিটখিটে হতে পারে।
অবরোধ চলাকালে ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে বাসে পেট্রলবোমা হামলার শিকার হয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের নাজমুল হোসেন। মামাতো বোনের বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন কলেজছাত্র নাজুমল। পেট্রলবোমা হামলায় নাজমুলের দুই হাত, মাথা ও পিঠ পুড়ে গেছে। বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন নাজমুল প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাতে ঘুমানোর মধ্যে থাইক্যা জাইগ্যা উঠি। মনে হয় আগুনের মধ্যে ঝাঁপ দিছি। সব সময় ভয় লাগে।’
নাজমুলের মা হানিফা বেগম বলছিলেন, ‘ছেলের মধ্যে ভয় ঢুকছে। ভয় আমিও পাইছি। তবে এখানকার লোকজন বলছে, ছেলে যেন ভয় না পায় সেদিকে খেয়াল রাখার জন্য।’
এমএসএফ আক্রান্ত ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাঁদের আত্মীয়স্বজনকেও পরামর্শ (কাউন্সেলিং) দিচ্ছে। মনোবিজ্ঞানী ক্যাথরিন ম্যাকগারভা বলছিলেন, মানসিক সমস্যায় থাকা ব্যক্তিদের দুর্ঘটনার কথা স্মরণ না করানো উত্তম। এ সময় নিকটজনের সহায়তা খুব দরকার। তাঁদের উচিত আক্রান্ত ব্যক্তিকে সব সময় ইতিবাচক কথা বলা।
এমএসএফ এসব রোগীকে নিয়মিত সহায়তা দেওয়ার জন্য তাদের ঠিকানা ও যোগাযোগের নম্বর রেখে দিচ্ছে। তারা মানসিক শুশ্রূষা অব্যাহত রাখতে চায়।
পেট্রলবোমায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে গত বুধবার পর্যন্ত ১২৬ জন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন আটজন। রাজশাহী, চট্টগ্রাম, বগুড়া ও রংপুরে অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন ৮৪ জন।
এমএসএফ ঢাকা মেডিকেলের বাইরে মানসিক পরিষেবা আর কোথাও দিচ্ছে না। তবে পার্থসারথি জানান, ‘ঢাকার বাইরে রোগীদের তথ্য সংগ্রহ করছি আমরা। তাদেরও এই সেবা দিত চাই।’
ঢাকাসহ কোনো জায়গায় মানসিক সমস্যায় থাকা ব্যক্তিদের পরিচর্যার কোনো উদ্যোগ সরকারি স্তরে নেই। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্লাস্টিক অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. আবুল কালাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা এখানে ধারণক্ষমতার চেয়েও বেশি রোগী নিয়েছি। আর ঢাকার বাইরে বার্ন ইউনিটের পরিষেবা অনেক কম। এমএসএফ তাই সহযোগিতার প্রস্তাব দেওয়ায় আমরা রাজি হয়েছি।’
এমএসএফ ৩১ জানুয়ারির পর ভর্তি রোগীদের সেবা দিচ্ছে। আগে যেসব রোগী চলে গেছেন, তাঁদের মানসিক সেবা দিতে কোনো পরিকল্পনা নেই বার্ন ইউনিটের। তবে ইনস্টিটিউটের শিক্ষক হেলালউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমাদের এখানে এসব পরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। সেটি চাইলে আমরা দিতে প্রস্তুত। তবে বার্ন ইউনিট কর্তৃপক্ষ এখন কঠিন সময় পার করছে, সে জন্য হয়তো এ বিষয়টি তাদের প্রাধান্যের মধ্যে নেই।’
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় আগুনে পুড়ে আহত হয়ে ওই সময় বার্ন ইউনিটে ভর্তি হয়েছিলেন ১০১ জন। এঁদের মধ্যে মারা গেছেন ৩৭ জন। ৬ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোর পক্ষ থেকে আহত এসব ব্যক্তির মধ্যে সাতজনের সঙ্গে কথা বলা হয়। এঁদের মধ্যে চারজন এখনো দুর্ঘটনাজনিত ভীতির কথা জানান। সে সময়ের আহত ব্যক্তিদের একজন রাজধানীর বনশ্রীর বাসিন্দা এহসানুল হাসান। তিনি মালিবাগের একটি বিপণিকেন্দ্রে কাজ করেন। তিনি জানান, এবার নতুন করে পেট্রলবোমা হামলা শুরু হওয়ার পর বাসে যাতে না চড়তে হয়, তাই বাসা ছেড়ে তিনি তাঁর কর্মস্থলের একেবারে কাছে মালিবাগে একটি মেসে উঠেছেন।
২০১৩ সালের ২৮ নভেম্বর কর্মস্থল বংশাল থেকে ফেরার সময় রাজধানীর শাহবাগে বাসে পেট্রলবোমা হামলায় আহত হন একটি বেসরকারি ব্যাংকের চাকুরে মো. শফিকুল ইসলাম (৩৬)। তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনার আগে আমার কোনো অসুখ ছিল না। দুর্ঘটনার পরপরই ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ বাসা বেঁধেছে।’
শফিকুলের এ অসুস্থতা নিয়ে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের শিক্ষক হেলালউদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, এটি নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই যে দুর্ঘটনার কারণেই দুটি রোগ হয়েছে। তবে এটি ঠিক, যেসব মানুষের মানসিক চাপ বেশি, তাঁদের ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপের আশঙ্কা অনেক বেশি থাকে। সে ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার পর মানসিক চাপ থেকে তিনি আক্রান্ত হতে পারেন। হেলালউদ্দিন বলেন, যেসব ব্যক্তি মানসিক সমস্যায় ভুগছেন, পরিবারের উচিত তাঁদের পরিচর্যা নেওয়া। তাঁদের সঙ্গ দেওয়া।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন